অধ্যাদেশ ইস্যুতে গুরুতর প্রশ্নের মুখে বিএনপি
৪ এপ্রিল ২০২৬
সংস্কার ইস্যুতে ব্যাপক সমালোচনা মুখে পড়েছে বিএনপি। বিশেষ করে স্বাধীন বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অনুমোদন না করার সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে এই অচলাবস্থার ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা প্রতিষ্ঠানিক সংস্কারের নানা উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে," ওই সংস্কারগুলো আরো শক্তিশালী করা হবে। নতুন বিল আনা হবে। সরকার স্বাধীন বিচার বিভাগের পক্ষে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৮ মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিলো। অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ১১৩টি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। বাকি ২০টির মধ্যে চারটি বাতিল করা এবং ১৬টি এখনই সংসদে বিল আকারে না তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। এই ১৬টি পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে।
এর মধ্যে আছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত একটি, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়সংক্রান্ত দুইটি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত তিনটি, গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত দুইটি, দুদকসংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন বসার পর ৩০ দিনের (ত্রিশ দিন) মধ্যে উত্থাপিত অধ্যাদেশটি অনুমোদন বা পাস করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে পাস না হলে বা সংসদ অনুমোদন না দিলে অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা বাতিল বা তামাদি (ল্যাপস) হয়ে যায়। অর্থাৎ, সংসদে উত্থাপন করা না হলে ১০ এপ্রিলের পর ওই অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা হারাবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কতদূর
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ করে। তাতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল'। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে।
কিন্তু বর্তমান সরকার এই অধ্যাদেশ অনুমোদন করছে না। ফলে নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত বিচারক নিয়োগ আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। বিদ্যমান সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে বিচারক নিয়োগ দেবেন। কিন্তু ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি অন্যান্য কাজ করবেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী।
জুলাই জাতীয় সনদে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে সংবিধানে স্বাধীন ‘জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল' গঠনের বিধান যুক্ত করার সুপারিশ আছে। এটিতে অবশ্য বিএনপির ভিন্নমত ছিল। দলটি বলেছিল, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা হবে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে। বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটিবিষয়ক সব সিদ্ধাস্ত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় এই সচিবালয়ের হাতে থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সচিবালয়ের সচিব প্রশাসনিক প্রধান হবেন। আর্থিক ক্ষমতাও দেয়া হয়।
এই অধ্যাদেশ বিচার বিভাগ তথা অধস্তন আদালতের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব খর্ব করার পথ তৈরি করেছিল। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি জরুরি পদক্ষেপ।
গুম প্রতিরোধ. মানবাধিকার কমিশন, দুদক এবং অন্যান্য
গুম প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। গুম থেকে সব ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বিধান বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এ অধ্যাদেশ করা হয়। এতে গুমকে ‘চলমান অপরাধ' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এটিও আপাতত অনুমোদন করা হচ্ছে না।
মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর করতে কিছু মৌলিক পরিবর্তন এনে অধ্যাদেশ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। অধ্যাদেশে কমিশনকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে ক্ষমতা দেওয়া হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডে একটি কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স' প্রতিষ্ঠিত করা এবং স্বেচ্ছাচারিতা হ্রাস করা এর উদ্দেশ্য।
দুদকের তদন্ত ও গোপন অনুসন্ধান ক্ষমতা বাড়িয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয় ২০২৫ সালে। এতে সরাসরি এজাহার দায়েরের বিধান, বিদেশে সংঘটিত অপরাধসহ গুরুতর আর্থিক অপরাধকে আইনের আওতায় আনা, কমিশনের সদস্য বাড়ানোর বিধান করা হয়। কিন্তু এই অধ্যাদেশগুলোও অনুমোদন করা হচ্ছেনা।
অধ্যাদেশের অনুমোদন যে কারণে প্রয়োজন
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, "বিচারবিভাগসহ আরো যে অধ্যাদেশগুলো এখন গ্রহণ করা হচ্ছে না তাতে জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। প্রথমত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথে যেটুকু এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়েছিলো তা এখন পিছিয়ে পড়বে। বিচার বিভাগ আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। কিন্তু আলাদা সচিবালয় তো এরইমধ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাহলে তার কী হবে? আর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তো বিচার বিভাগ স্বাধীন করা কথা বলা হয়েছে।”
"একইভাবে মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, দুদক সংক্রান্ত যেসব অধ্যাদেশ পাশ হচ্ছেনা তাতেও জটিলতার সৃষ্টি হবে। মানবাধিকার কমিশন তো আবার পুনর্গঠন করতে হবে। মানবাধিকার রক্ষা এবং গুম প্রতিরোধে তাদের যে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিলো তা তো আর থাকছে না। গুশম থেকে ব্যক্তি ও পরিবারগুলোর সুরক্ষাও তো থাকবে না,” বলেন তিনি।
তিনি বলেন, "সরকার যদি এগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে চায় নতুন আইনের মাধ্যমে তাহলে তো অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করেও করা যেত। কিন্তু এখন যেটা হচ্ছে তাতে তো আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। আগে যেরকম ছিলো সেরকমই হচ্ছে। তাতে লাভ কী হলো। আরো একটি শূন্যতা তৈরি হবে।”
ড. শরীফ ভূঁইয়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইন উপদেষ্টা হিসাবেও কাজ করেছেন। তার মতে, "এগুলো তো সংবিধান সংস্কার নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। আর এই সংস্কার আমাদের প্রয়োজন। কিন্তু এখানে কেন বাধা তৈরি হবে?”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের(টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অন্তর্বর্তী সরকারের দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, "যেসব অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হচ্ছে না, সেগুলো বিচার বিভাগ, দুদক, মানবাধিকার কমিশন ও গুম সংক্রান্ত। বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারেও তারা সংস্কারের কথা বলেছে। কিন্তু এখন তারা পিছু হটছে- যা দুঃখজনক।”
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "তবে বিএনপির এই অবস্থানে আমি অবাক হচ্ছি না। কারণ অতীতেও দেখেছি আমলাতন্ত্র রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ করে। বিএনপির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। আমি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবেও তখন দেখেছি তারা বার বার বলেছে সরকারের হাত-পা বেঁধে দেয়া যাবে না। তারা এখন এই সংস্কারকে মনে করছে সরকারের হাত-পা বেধে দেয়া। কিন্তু এটা একটা কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন। তাদের বাধার কারণে এখন আমরা ঠেকে গেছি।”
"আসলে যেসব সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে তা একটা কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য দরকার। বিএনপি ও তার নেতা-কর্মীরাও কিন্তু গুমের শিকার হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। বিচার বিভাগের দলীয়করণের শিকার তারাও হয়েছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারিছিনা যে কোন উদ্দেশ্যে কোন কারণে তারা এখন এগুলো সংস্কারের বিরোধিতা করছে,” প্রশ্ন তার।
তার কথা, "আমরা তো একটা জবাবদিহিমূলক সরকার চাই। সেটা না করতে পারলে কেন এত আত্মত্যাগ।”
সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে যাওয়ার হুমকি বিরোধীদের
জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির বৈঠকে এই অধ্যাদেশগুলো সংসদে অনুমোদনের পক্ষে অবস্থান ছিল প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সংসদ থেকে ওয়াক আউটও করেছে দলটি। শনিবার বিকালে ঢাকায় জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কারের দাবীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। তাদের কথা, তারা সংসদে কথা বলবেন, একই সঙ্গে রাজপধে আন্দোলন করবেন। কোনোভাবে "ফ্যাসিবাদ” ফিরে আসতে দেবেন না।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ ডয়চে ভেলেকে বলেন," যদি ওই অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন না পায় তাহলে তো গুম আগের মতই চলবে। দুদক তো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেনা। বিচার বিভাগও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। গুমের শিকার যারা হবেন তারা তো সুরক্ষা পাবেনা। পুলিশের দৌরাত্ম্য কমবে না। তারা নির্বাহী বিভাগের প্রভাবে থাকলে তো আর কাজের কাজ কিছু হবে না। ”
তার কথা," বিচার বিভাগ যদি সরকারের আজ্ঞাবহ হয় তাহলে তো সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে না। বিচারপতি খায়রুল হক সাহেক কী করে গেছেন? তার কারণেই তো সব সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা তো আজ্ঞাবহ বিচার বিভাগ চাইনা।”
"বিএনপির ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহারে কিন্তু এইসব সংস্কারের কথা আছে। কিন্তু এখন তারা কার কথায়, কোন উদ্দেশে বা কী কারণে তারা এখন সরে আসছে তা বলতে পারছি না,” বলেন তিনি।
আর বিরোধী দল এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ ডয়চে ভেলেকে বলেন," আমি একটিই কমেন্ট করব। বিএনপি ইজ হাইজ্যাকড। আমি বাইরে এনিয়ে আর কোনো কমেন্ট করবো না। যা বলার সংসদে বলবো।”
সরকার আসলে কী করতে চায়?
এই সবের জবাবে সংসদে চিফ হুইপ এবং বিশেষ কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম মনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, "আসলে নতুন সুযোগ তৈরির জন্য কিছু অধ্যাদেশ ল্যাপস হয়ে যাচ্ছে। এখানে আশঙ্কার কোনো কারণ নাই। বিচার বিভাগকে আমরা আরো স্বাধীন করার জন্য সংসদে আরো শক্তিশালী বিল আনব। এখন যা আছে তা খন্ডিত স্বাধীনতা। আমরা পরিপূর্ণ স্বাধীনতার জন্য বিল আনব।”
"আমরা তো সাফারার। তাই আমরা গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন, দুদক-এই সবগুলো নিয়েই কাজ করব। আমরা গুম প্রতিরোধে আরো ভালো আইন করবো। কারণ আমরা এর ভুক্তভোগী। দুর্নীতি দমন কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে বাজ করতে পারে। রাজনৈতিকভাবে যাতে কাউকে হয়রানি না করা হয় তার জন্য সঠিক আইন করবো। মানবাধিকার কমিশনও আমরা একইভাবে স্বাধীন করবো,” বলেন তিনি।
তিনি মনে করেন, "এসব অধ্যাদেশ নিয়ে কোনো হইচই বা রাস্তায় কোনো আন্দোলনের প্রয়োজন নাই। আমরা কয়েকদিনের মধ্যেই নতুন আইন করবো। এজন্য রাস্তা বন্ধ করার কী আছে?”
এদিকে সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার জন্য নতুন আইনের উদ্যোগ নিয়েছে।