অন্তর্বর্তী সরকারের কাজের পরিধি আসলে কতটা? চাইলেই কি এ সরকার সব বৈদেশিক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ইত্যাদি স্বাক্ষর করতে পারে?
অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক আলোচনায় সুবিধা পেতে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি সংক্রান্ত চুক্তি করেছে। মোট ২.২০ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি।ছবি: Kazuhiro Nogi/AFP
বিজ্ঞাপন
ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের অফিস স্থাপনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টসহ (এনডিএ) আরো আরো কিছু চুক্তিরও সমালোচনা হচ্ছে।
সমালোচনা আছে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে গমও উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি নিয়েও। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা জনগণের স্বার্থবিরোধী কিছু করছে না। এই ধরনের চুক্তি করার ম্যান্ডেট আছে বলেও দাবি সরকারসংশ্লিষ্টদের৷
রাখাইনে জরুরি ত্রাণ সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘকে করিডোর দিচ্ছে - এই আলোচনায় এখন ভাটা পড়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে এখন কোনো কথা হচ্ছে না। শুরুতে সরকারের দিক থেকেই বিষয়টি সামনে আনা হয়েছিল। কিন্তু সমালোচনার মুখে সরকার বলেছে, জাতিসংঘের সাথে সরকারের এ ধরনের কোনো করিডোর বা প্যাসেজ নিয়ে আলোচনাই হয়নি। আরো জানানো হয়েছে, বিষয়টি সরকারের বিবেচনাতেও নেই।
কিন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অফিস এখন বাংলাদেশে অনস্বীকার্য বাস্তবতা। ১৮ জুলাই থেকে তারা বাংলাদেশে কাজ শুরু করেছে। মানবাধিকার কমিশনের অফিস নিয়ে আলোচনার শুরুতেই এর বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলামসহ কয়েকটি ইসলামী দল৷ এ উদ্যোগের সমালোচনা করে প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করে তারা। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-সহ কিছু বামপন্থি দলও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। এখন বিএনপি এবং এনসিপিও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ মঙ্গলবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, "বাংলাদেশের চেয়ে ফিলিস্তিনের গাজার মানবাধিকার পরিস্থিতি অনেক বেশি খারাপ। কিন্তু সেখানে জাতিসংঘের তেমন কার্যক্রম দেখা যায় না। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের ঢাকায় মানবাধিকার কমিশনের অফিস স্থাপনের সিদ্ধান্ত ন্যায়সঙ্গত হয়নি। এতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।”
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস৷ ‘গরিবের ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিত ড. ইউনূসের জীবনের নানা কথা থাকছে ছবিঘরে৷
ছবি: MUNIR UZ ZAMAN/AFP
জন্ম
১৯৪০ সালে চট্টগ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ড. মুহাম্মদ ইউনূস জন্মগ্রহণ করেন৷
ছবি: Abdul Saboor/REUTERS
সবচেয়ে বড় প্রভাব মায়ের
সহায়তার জন্য বাড়ির দরজায় কড়া নাড়া সবাইকে তার মায়ের সাহায্য করার বিষয়টি তার জীবনে সবচেয়ে বড় প্রভাব রেখেছে বলে জানান ড. ইউনূস৷
ছবি: Mohammad Ponir Hossain/REUTERS
পড়ালেখা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ালেখা শেষে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে গিয়েছিলেন৷ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে ফেরত গিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন ড. ইউনূস৷
ছবি: Raphael Lafargue/abaca/picture alliance
মানুষকে সাহায্য করার অনুপ্রেরণা
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হলে ড. ইউনূস কিছু করতে উদ্যোগী হন৷ তিনি বলেন, ‘‘আমার চারদিকে দারিদ্র্য ছিল৷ আমি এ থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখতে পারিনি৷ এই অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে অর্থনীতির তত্ত্ব পড়ানো আমার কাছে কঠিন মনে হয়েছিল... আমার চারপাশের মানুষদের আমি সহায়তা করতে চেয়েছিলাম৷’’
ছবি: AP
গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা
গরিব মানুষকে ঋণ দেওয়ার কয়েক বছরের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠান করেন ড. ইউনূস৷ ২০২০ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকের গ্রাহকের সংখ্যা ৯০ লাখের বেশি৷ এর মধ্যে ৯৭ শতাংশের বেশি নারী৷
ছবি: AP
নোবেল জয়
ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ২০০৬ সালে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান৷
ছবি: AP
রাজনীতির চেষ্টা ও সরে আসা
২০০৭ সালে ‘নাগরিক শক্তি’ নামে একটি দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন ড. ইউনূস৷ তবে এর কয়েকদিন পর দল গঠনের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসেন৷ সেইসময় জাতির উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘যাদেরকে সঙ্গে পেলে দল গঠন করে জনগণের সামনে সবল ও উজ্জ্বল বিকল্প রাখা সম্ভব হতো তাদের আমি পাচ্ছি না৷ আর যারা রাজনৈতিক দলে আছেন তারা দল ছেড়ে আসবেন না৷’’
ছবি: AP
গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়া
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেখ হাসিনার আক্রোশের শিকার হতে হয় নোবেল জয়ী এই অর্থনীতিবিদকে৷ গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল৷ এছাড়া তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলাও করা হয়৷
ছবি: Munir uz Zaman/AFP/Getty Images
সামাজিক ব্যবসা ও উদ্যোক্তা তৈরির আন্দোলন
মাইক্রোসফটের বিল গেটস এবং মুহাম্মদ ইউনূস সামাজিক ব্যবসার উপায়গুলোকে বিশ্বব্যাপী কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন৷
ছবি: AP
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম
২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ড. ইউনূসকে দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম’ প্রদান করেন৷
ছবি: AP
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস৷
ছবি: MUNIR UZ ZAMAN/AFP
11 ছবি1 | 11
তিনি আরো বলেন, "অন্তর্বর্তী সরকারের মৌলিক ও বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। পাশাপাশি দেশে যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতি, তাতে কী কী অনুমোদন করে, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক আলোচনায় সুবিধা পেতে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি সংক্রান্ত চুক্তি করেছে। মোট ২.২০ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি টন গমের দাম ৬০ ডলারেরও বেশি। ইইক্রেনসহ অন্য কিছু দেশের গমের দাম তার চেয়ে কম। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি নতুন বোয়িং বিমান কেনার চুক্তিও করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন এই ২৫টি বোয়িং-এর দাম (প্রতিটি সর্বনিম্ন চার হাজার কোটি টাকা করে) এক লাখ কোটি টাকা, যা কিনা বাংলাদেশের সবশেষ বাজেটের আট ভাগের এক ভাগ। এত দামের বোয়িং বিমান যাদের জন্য, সেই বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নাকি এই ক্রয়ের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানেই না।
‘অন্তর্বর্তী সরকার এমন কিছুই করছে না যা বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়’: ফয়েজ আহমেদ
This browser does not support the audio element.
এর আগে প্রতি বছর পাঁচ লাখ টন এলএনজি আমদানির চুক্তি করা হয়েছে। এছাড়া সয়াবিন, তুলা, ডাল আমদানিরও নতুন চুক্তি হচ্ছে। আর স্টারলিংক বাংলাদেশে ইতিমধ্যে তাদের ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে শুল্ক আলোচনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট' করার বিষয়টি। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে গত ১৭ জুলাই বিষয়টি জানান। এর আগে এটি নিয়ে কোনো পর্যায়ে কিছু প্রকাশ করা হয়নি। ওই দিন সাংবাদিকরা শুল্ক আলোচনার বিস্তারিত জানতে চাইলে এক পর্যায়ে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের কথা উল্লেখ করলেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য গত ২০ জুলাই ঢাকায় আয়োজিত এক সেমিনারে বলেছেন,"বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো পার্টনার (অন্য দেশ) কোনোদিন এনডিএ ডকুমেন্ট দেয়নি। এর বদলে নন-পেপার ইস্যু করা যেতো, যার অর্থ হলো এটা আমার অবস্থান, কিন্তু আমি নিজে সই করবো না। নন-পেপার হলে রেসপন্সিবিলিটি তৈরি হতো, কিন্তু এখন বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়ে গেছে। এখন যদি বাংলাদেশ কোনো লবিস্ট নিয়োগ করে, তার কাছেও এ তথ্য প্রকাশ করা যাবে না।”
সোমবার মার্কিন ইউএসটিআরের সাথে বৈঠকের যোগ দেয়ার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান আর বাণিজ্য উপদেষ্টা বশিরউদ্দিনসহ ৫ সদস্যের দল।২৯ ও ৩০ জুলাইয়ের এ আলোচনায় তারা যদি কোনো সুবিধা করতে না পারেন, তাহলে ১ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা পণ্যে অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে।
চীনের পরই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে ভারতের কাছ থেকে৷ ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি সেই তুলনায় অনেক কম হলেও চলতি অর্থবছরে তা বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে৷ কিন্তু সাম্প্রতিক টানাপোড়েনে সেই ধারাবাহিকতা কি ধরে রাখা যাবে?
ছবি: Amlan Biswas/Pacific Press/picture alliance
ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ (জুলাই-জুন) অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে ১৫৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে৷ এটি আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় নয় শতাংশ কম৷ ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৭১ কোটি ডলার৷ গত বছরের জুলাই থেকে এই বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে ১৫১.৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে৷ আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩১.৭ কোটি ডলার৷ ১০ মাসে প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ৷
ছবি: BM Ahmed
বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানি
বাংলাদেশ ভারত থেকে যে পরিমাণ রপ্তানি করে, তার চেয়ে পাঁচগুণ বেশি আমদানি করে৷ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে ৯০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৯৪৯ কোটি ডলার৷ বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করেছে, এটি তার ১৪ দশমিক তিন শতাংশ৷ ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ অর্থবছরে (এপ্রিল-মার্চ) বাংলাদেশে তাদের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১১০৬ কোটি ডলার৷
ছবি: BM Ahmed
বাংলাদেশের ১০১২টি, ভারতের ৫৬২০টি
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির মতো বিশাল ব্যবধান রয়েছে পণ্যের পসরাতেও৷ বাণিজ্যে বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের পণ্যের সম্ভার পাঁচগুণ বেশি৷ ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ইন্ডিয়া ব্র্যান্ড ইকুইটি ফাউন্ডেশন’ জানাচ্ছে ভারত বাংলাদেশ থেকে ২০২৪ অর্থবছরে ১০১২ ধরনের পণ্য আমদানি করেছে৷ অন্যদিকে বাংলাদেশে ভারত রপ্তানি করেছে ৫ হাজার ৬২০ রকমের পণ্য৷
ছবি: Satyajit Shaw/DW
বাংলাদেশের পোশাক, ভারতের তুলা
বাংলাদেশের প্রধাণ রপ্তানিপণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, মাছ, হোম টেক্সটাইল, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য৷ তবে সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৪ কোটি ডলার৷ ভারত থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আমদানি করে তুলা৷ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তুলা আমদানির পরিমাণ ছিল ২৩৬.৮ কোটি ডলার, যা মোট আমদানির এক চতুর্থাংশ৷ এছাড়াও আছে খনিজ, পশুখাদ্য, পরমাণু রিয়্যাক্টর, বয়লার ও মেশিনারি, সবজি ইত্যাদিও৷
ছবি: Faisal Ahmed/DW
অভ্যুত্থানের পরের চিত্র
ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পরে দুই দেশের বাণিজ্য তেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি৷ গত বছরের আগস্ট থেকে এ বছরে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসাবে ভারত বাংলাদেশে ৬৮২ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের একই সময়ে ছিল ৬৬৯ কোটি ডলার৷ অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে গত আগস্ট-ফেব্রুয়ারি সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ১২২ কোটি ডলার, যা আগের একই সময়ে ছিল ১০৫ কোটি ডলার৷
ছবি: Satyajit Shaw/DW
দুই দেশের ট্রানজিট সুবিধা
দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী, এক দেশ আরেক দেশের মধ্য দিয়ে তৃতীয় দেশে পণ্য ট্রানজিটের সুবিধা পাবে৷৷ ২০১৬ সালে আশুগঞ্জ নৌ বন্দর দিয়ে ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয় বাংলাদেশ৷ ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতকে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনে অনুমতি দেয়া হয়৷ ২০২০ সালে ভারতের সমুদ্র এবং বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশকে বাণিজ্যের সুবিধা দেয় দিল্লি৷
ছবি: Md Manik/ZUMA Wire/imago images
তৃতীয় দেশের সুবিধা বাতিল ভারতের
২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল ভারত৷ বলা হয়েছিল, ভারতের সমুদ্র এবং বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারবে বাংলাদেশ৷ গত ৮ এপ্রিল সেই সুযোগ বাতিল করে ভারত৷ তবে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই নিয়ম চালু হবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে৷
ছবি: Satyajit Shaw/DW
দুই দেশের পাল্টাপাল্টি
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশ চারটি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানায়৷ এরপর ভারত বাংলাদেশি গার্মেন্টস পণ্যের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা স্থগিত করে৷ ১৭ মে ভারত স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পোশাক, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, আসবাবপত্র এবং অন্যান্য পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে৷ তবে বাংলাদেশ এই বিষয়ে পাল্টা কোনো পদক্ষেপ নেবে না বলে জানিয়েছে৷
ছবি: Amlan Biswas/Pacific Press/picture alliance
8 ছবি1 | 8
‘কাউকে কিছু না জানিয়ে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট করা হলো'
অর্থনীতিবিদ এবং জাতীয় অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, "শুল্ক কমাতে, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে দাম বেশি পড়লেও গম, সয়াবিন, তুলা এগুলো আমদানি বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু ২৫টি বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত সরকার কোন বিবেবচনায় নিলো তা আমি বুঝতে পারছি না।এটা আমাদের আদৌ দরকার আছে কিনা তা-ও বিবেচনা করা হয়েছে বলে মনে হয় না।”
তিনি মনে করেন, "বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, ফলে, এই বোয়িং আমাদের রিজার্ভের ওপর চাপ আরো বাড়াবে। এটা একটা অনির্বাচিত সরকার। এইসব মৌলিক সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তাদের রাজনৈতিক দল ও স্টেক হোল্ডারদের সাথে কথা বলা উচিত ছিল। সরকার নির্বাচনের কথা বলছে। কিন্তু এই চাপ তো নির্বাচিত নতুন সরকারের ওপর পড়বে।”
‘সংসদ না থাকলেও এই সরকারকে যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাহলে দলগুলোর সঙ্গে কথা বলেই করা উচিত’: ওমর ফারুক
This browser does not support the audio element.
"আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, কাউকে কিছু না জানিয়ে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট করা হলো। এখন কেউ কিছু জানতেও পারছে না যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের কী আলোচনা হচ্ছে। সবাইকে অন্ধকারে রেখে তো তারা এটা করতে পারে না,” বলেন তিনি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক বলেন, "এখন সংসদ নাই। এই ধরনের চুক্তির আগে সংসদে আলোচনা হয়। সরকার তাই রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে চাইলে কোনো চুক্তি করতে পারে। কিন্তু সেটা তো করেনি। আর দেশের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু কোনো সরকারাই করতে পারে না।”
‘‘নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট ভেরি ডেঞ্জারজ। দেশের মানুষ জানতে পারবেনা, এটা কীভাবে হয়! এটা মেনে নেয়া যায় না। সরকার আরো অনেক চুক্তি করছে, যা পরবর্তী সরকারেও ওপর বর্তাবে। তাই সংসদ না থাকলেও এই সরকারকে যদি গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলেই করা উচিত।”
বিরোধিতা থাকলেও সরকার চট্টগ্রাম বন্দর পরিচলানায় বিদেশিদের কাজ দেয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি টার্মিনাল পরিচালনার জন্য তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি হবে শিগগিরই। নৌ পরিবহণ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন যা সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন কয়েকদিন আগে। তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে ডেনমার্কের এপি-মুলার মায়েরস্ক, সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড। টার্মিনালগুলো হলো: পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি), বে টার্মিনালের দুটি টার্মিনাল এবং নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আন্দোলনকারীদের যে প্রত্যাশা ছিলো সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে? নতুন যে বাংর্লাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা, সেই স্বপ্ন কী পূরণ হয়েছে? জানতে দেখুন এই ছবিঘরটি৷
ছবি: Mohammad Ponir Hossain/REUTERS
উমামা ফাতেমা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র
‘‘জুলাই আন্দোলনের সময় একটা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, এ দেশটা স্বাধীন হবে, দেশটা এক ধরনের পরিবর্তন এর মধ্য দিয়ে যাবে৷ আমরা ওই সময় নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন রাজনৈতিক রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সে রূপান্তরের স্বপ্নটা আমরা এখনো বাস্তবায়িত হতে দেখিনি, আমি আশাবাদী আমাদের যে জনগণ অভ্যুত্থান করেছে সে জনগণ অবশ্যই সংগঠিতভাবে সামনের দিনে পরিবর্তনগুলো আনবে৷’’
ছবি: DW
অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী
আন্দোলনে প্রত্যাশা ছিল স্বৈরাচারের অবসান, বাকস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, কিন্তু বাস্তবে পাওয়া গেল স্বজনপ্রীতি, স্বচ্ছতার অভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা৷ আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডও প্রত্যাশাকে ক্ষুণ্ণ করেছে৷ আরেকটা কথা যেটা না বললেই নয় সেটা হলো এখনো পরিস্থিতি উন্নয়নের সুযোগ আছে যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সচেষ্ট হয৷ সেটা করতে হলে সবার আগে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে৷
ছবি: DW
হাসান রোবায়েত,কবি
একটা ইনসাফভিত্তিক, ভয়ডরহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা ছিল৷ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং আচরণের মধ্যে দিয়েই এসব পূরণ হবে৷ তার কিছু নমুনাও শুরু হয়েছে৷
ছবি: DW
আদিবা সায়মা খান, শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অভ্যুত্থানে নারীরা রাজপথে নেমেছিলাম নাগরিক হিসাবে৷ একটি বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলনে নেমেছিল, যেখানে প্রশাসনিক সংস্কার হবে, মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং নিরাপদ রাষ্ট্র হবে৷ কিন্তু আমরা প্রত্যাশার কোন কিছুই তেমন দেখতে পাচ্ছি না৷ জাতীয় নিরাপত্তা নেই৷ নারীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে৷ খুনিদের শাস্তি হয়নি৷ এমনকি ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলাকারীদেরও দৃষ্টান্তমূলক কোন শাস্তি হয়নি৷
ছবি: DW
ইসরাত জাহান ইমু, শিক্ষার্থী ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জুলাইয়ের ১৭ তারিখ পর্যন্ত কোটার সংস্কার ছাড়া আন্দোলনে অন্য কোনো প্রত্যাশা ছিলো না৷ পরে যখন আমরা আন্দোলন করি তখন আমাদের প্রত্যাশা ছিল আওয়ামী লীগ যে দমন-পীড়নমূলক কাঠামো তৈরি করে গিয়েছে সেটা ভেঙে নতুন ব্যবস্থা তৈরি হবে৷ কিন্তু পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের জায়গা দখল করেছে অন্য শক্তি৷ আমরা ভেবেছিলাম যে নতুন যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি হবে সেখানে নারীদের নিরাপত্তা বা নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হবে৷
ছবি: DW
সাবরিনা আফরোজ সেবন্তি, শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতের বোন
‘‘জুলাই আন্দোলনে প্রত্যাশা ছিল একটা নতুন বৈষম্যহীন বাংলাদেশ পাব৷ নতুন যে সরকার আসবে সে কোন অন্যায় মেনে নেবে না, একটা বিপ্লবী ভূমিকা পালন করবে কিন্তু দুঃখজনকভাবে সে প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না৷’’
ছবি: DW
সরদার নাদিম মাহমুদ শুভ, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সমন্বয়ক
আমাদের আকাঙ্খা ছিলো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতন, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত৷ চাওয়া ছিল রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা৷ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের দলীয়করণ বন্ধসহ সব প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষকরণ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মমুখী করা৷ কিন্তু সত্য যে গণঅভ্যুত্থানের পর এই সরকার জনগণের চাওয়া পূরণ করতে পারেনি৷ তারা আমাদের যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল তা প্রায় দিবাস্বপ্ন রয়ে গেছে৷
ছবি: DW
বেলাল হোসেন, আন্দোলনে আহত
‘‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম দেশকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করতে৷ কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ফ্যাসিবাদ রয়ে গেছে৷ আমরা যারা জুলাই আন্দোলনে আহত তাদের জুলাই সনদপত্র এখনো পর্যন্ত দেওয়া হয়নি৷ আগে গাড়ি চালাতাম৷ এখন আমার একটা চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেই কাজ করতে পারি না৷ আগস্টের পরে অনেকেই অনেক আশ্বাস দিয়েছিল তার একটাও বাস্তবায়ন হয় নাই৷’’
ছবি: DW
ফারহানা শারমিন শুচি, উদ্যোক্তা
‘‘জুলাই আন্দোলনে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিলো অন্যায় ও দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন, এবং বিদেশি আধিপত্যবিহীন একটা সমাজ এবং রাষ্ট্র, যেখানে দেশের আপামর জনসাধারণ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে তাদের প্রাপ্য সব মৌলিক অধিকার সমানভাবে ভোগ করবে৷ রাষ্ট্র বিভিন্ন রকম সংস্কার এবং তার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের সেই অধিকার নিশ্চিত করবে৷ সত্যিকার অর্থে সে প্রত্যাশার কিছুই পূরণ হয়নি৷’’
ছবি: DW
9 ছবি1 | 9
‘সরকারের এইসব সিদ্ধান্তের কারণে আগামীতে ঋণের চাপ আরো বাড়বে'
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন," আসলে সামনে একটি নির্বাচিত সরকার আসবে। ফলে অর্থনৈতিক চুক্তিসহ যো-কোনো ধরনের চুক্তি করার আগে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকারের আলোচনা দরকার। কারণ, এই চুক্তিগুলো শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত সরকারের ওপরই বর্তাবে। সেটা (আলোচনা) করা না হলে সংকট তৈরি হবে।”
"যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে সাথে ট্রেড গ্যাপ কমাতে ২৫টি বোয়িং আনা হবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মধ্যে বোয়িং নাই। তাহলে কেন আনা হচ্ছে? এতে তো আমাতের আরো ঋণ করতে হবে। কিন্তু লাভ কী হবে? আরেকটি কথা হলো, যে নন- ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট করা হলো এটা না জানিয়ে কেন করা হলো? এটা নিয়ে তো প্রশ্ন থেকেই যাবে। সরকারের এইসব সিদ্ধান্তের কারণে আগামীতে ঋণের চাপ আরো বাড়বে। আসলে এই সব সিদ্ধান্ত নির্বাচিত রাজনৈতি সরকার নিলে ভালো হতো।”
‘আমরা কথা বলছি, প্রতিবাদ করছি'
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, "অন্তর্বর্তী সরকারের মূল কাজ মিনিমাম সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত নির্বাচন দেয়া। কিন্তু সেটা না করে তারা এমনসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে , চুক্তি করছে, যা তারা করতে পারে না। বাংলাদেশে মানবাধিকার কমিশনের অফিস, নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট, বিদেশিদের বন্দর দেয়া, বোয়িং কেনা-এগুলো তাদের কাজ নয়। এগুলো করতে হলে জাতীয় সংসদে আলোচনা হতে হয়। সেটার তো এখন সুযোগ নাই। তারপরও তারা রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করতে পারতো। তা-ও না করে এসব কাজ করছে। এর দায়-দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে।”
তার কথা, "দেশের বিরুদ্ধে যায়, দেশের জনগণের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো চুক্তি বিএনপি মেনে নেবে না। আমরা কথা বলছি, প্রতিবাদ করছি।”
নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদানের জন্য সময়ে সময়ে নানা আইন করা হলেও বাংলাদেশে এমন কিছু আইন এখনো বিদ্যমান, যেগুলো মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা৷
ছবি: DW/Harun Ur Rashid Swapan
বাংলাদেশে যত আইন
বাংলাদেশ কোড, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ এবং আইন কমিশনের (২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১ হাজার ২০৭টি আইন রয়েছে৷ এরমধ্যে কিছু আইন ও এর প্রয়োগ নিয়ে নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বার বার৷
ছবি: DW/Harun Ur Rashid Swapan
নিবর্তনমূলক আটক আইন
বাংলা পিডিয়া বলছে, নিবর্তনমূলক আটক আইন হলো, নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক কোনো ব্যক্তিকে কোনো অভিযোগ গঠন ব্যতীত ও বিনাবিচারে আটক রাখার বিশেষ আইন৷ বাংলাদেশের নিবর্তনমুলক আইন ছাড়াও আরো কিছু আইন রয়েছে, যেগুলো নিয়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে৷
বাংলাদেশে যে কয়েকটি বিতর্কিত আইন রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিশেষ ক্ষমতা আইন৷ সম্প্রতি মিস আর্থ বাংলাদেশ-২০২০ বিজয়ী মডেল মেঘনা আলমকে এই আইনের আওতায় গ্রেপ্তারের পর ১৯৭৪ সালে পাশ হওয়া এ আইন ও এর প্রয়োগ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়৷ মানবাধিকার লঙ্ঘনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় - এমন অভিযোগ এনে বিশ্লেষকেরা এই আইন দ্রুত বাতিলের দাবি জানান৷
ছবি: DW
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন
২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন৷ পাস করে৷ ভিন্নমত দমনে এই আইন প্রয়োগের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও এই আইন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে৷ সমালোচনার মুখে এটি রহিত করে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার ‘সাইবার নিরাপত্তা ২০২৩’ নামে একটি আইন পাস করে৷ এরপর অন্তর্বতী সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৪ প্রণয়ন করে৷ সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে৷
ছবি: Reuters/M. Ponir Hossain
জননিরাপত্তা আইন
২০০০ সালের এপ্রিলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ‘জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন আইন ২০০০’ পাস করে৷ এই আইনে অভিযুক্তকে জামিন দেয়া যাবে না-সহ আরো কয়েকটি কঠোর বিধান ছিল৷ ফলে এটি নিয়ে ব্যপক সমালোচনা শুরু হয়৷ ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরে৷ ২০০২ সালে জননিরাপত্তা আইন বাতিল করে বিএনপি সরকার৷ এর পরিবর্তে ‘আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ’ নামে নতুন একটি আইন পাস করা হয় তখন৷
ছবি: Komol Das/DW
সন্ত্রাসবিরোধী আইন
২০০৯ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইন গৃহীত হয়৷ তবে এটি আইন হিসেবে সংসদে পাস হওয়ার আগে ২০০৮ সালের জুন মাসে সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকার সন্ত্রাস বিরোধী অধ্যাদেশ জারি করে৷ ২০১২ এবং ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়৷ মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, এর মাধ্যমে পুলিশের হাতে বিস্তর ক্ষমতা দেয়া হয়েছে৷
ছবি: bdnews24.com
বঙ্গবন্ধু হত্যা ও ইনডেমনিটি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়৷ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি এড়ানোর সুযোগ করে দিতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়৷ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ এই দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করেন৷ পরে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংসদে এই অধ্যাদেশটি অনুমোদিত হয়৷ ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার সংসদে বিলের মাধ্যমে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়৷
ছবি: Mohammad Ponir Hossain/REUTERS
অপারেশন ক্লিন হার্ট এবং দায়মুক্তি
২০০২ সালে অপরাশেন ক্লিন হার্ট শুরু করে বিএনপি সরকার৷ সেবছর সারাদেশে অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী৷ নির্বিচারে তল্লাসি ও গ্রেপ্তার চালানো হয়৷ অভিযোগ আছে, সেনাবাহিনী যাদের আটক করেছিল তাদের মধ্যে ৪০ জনের বেশি মানুষ হেফাজতে মারা যান৷ এরপর যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন ২০০৩ জারি করা হয়৷ দায়মুক্তি আইনকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১২ সালে আইনজীবী জেড আই খান পান্না রিট করলে হাইকোর্ট ঐ দায়মুক্তি আইনকে অবৈধ ঘোষণা করে৷
ছবি: Mustafiz Mamun
কুইক রেন্টাল আইন ২০১০
২০১০ সালে আওয়ামীলীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন প্রণয়ন করে ৷ আইনের দুইটি বিধানে কাজ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না এবং চুক্তি করার বিষয়ে মন্ত্রীর একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়৷ এটি ‘কুইক রেন্টাল’ আইন নামে পরিচিত৷ অন্তর্বতী সরকার দায়িত্বে আসার পর এই আইন রহিতকরণ অধ্যাদেশ জারির প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়৷
ছবি: Salim/Xinhua News Agency/picture alliance
অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩
ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত এই আইনটি ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে আত্তীকরণ করা হয়৷ এরপর ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এটিকে সংযুক্ত করা হয়৷ ব্রিটিশ আমলের এই আইনটি নিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি এবং বাংলাদেশের সংবিধানের কিছু ধারার সাথে সাংঘর্ষিক বলে মত দেন আইনবিদেরা৷ সর্বশেষ ২০২১ সালে সচিবালয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় প্রথম আলোর এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছিল৷
ছবি: Munir Uz Zaman/AFP/Getty Images
10 ছবি1 | 10
‘নানা চুক্তির মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে দেশ তুলে দেয়া হচ্ছে'
রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মাঝেমধ্যে বৈঠক করে। সেইসব বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় কিনা, অথবা দলের প্রতিনিধিরা কথা তোলেন কিনা জানতে চাইলে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, " আমাদের খুব বেশি কথা বলতে দেয়া হয় না। সর্বশেষ বৈঠকে আমাকে দুই মিনিট কথা বলার সময় দেয়া হয়। আমি সাড়ে তিন মিনিট কথা বলি। সেখানে আমি বলেছি, বড় একটি সংকট তৈরি হচ্ছে নানা চুক্তির মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে দেশ তুলে দেয়া হচ্ছে।”
তার কথা, "এই মানবাধিকারের অফিস, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে দেয়া এগুলো নিয়ে আমরা প্রতিবাদ করছি। কর্মসূচি দিচ্ছি। সরকার যদি তারপরও না থামে, তাহলে এই সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমরা সেই চেষ্টাই করছি,” বলেন তিনি।”
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, "সরকার রাজনৈতিক দল এবং স্টেক হোল্ডারদের সাথে আলোচনা না করে, কথা না বলে এইসব চুক্তি ও সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। একটা নির্বাচিত সরকার ছাড়া ফরেন পলিসির এই জায়গাগুলোতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এটা আমরা বিভিন্ন ফোরামে বলছি।”
তার কথা, "সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আমাদের যখন কথা হয়, তখন আমরা বিষয়গুলো বলি। সরকারের যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিতেও হয়, তাহলে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
‘বড় একটি সংকট তৈরি হচ্ছে নানা চুক্তির মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে দেশ তুলে দেয়া হচ্ছে’: রুহিন হোসেন প্রিন্স
This browser does not support the audio element.
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউর রহমান মনে করেন, "সরকার তার ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা দেশের ক্ষতি ডেকে আনবে। সরকার এটা করতে পারে না। আমরা প্রতিবাদ করছি। বার বার বলছি তারপরও সরকার থামছে না।''
"আর সরকারের সঙ্গে আমাদের বৈঠকেও বিষয়গুলো জানানো হয় না, এজন্ডায় রাখা হয় না। আর আমাদের এত কম সময় দেয়া হয় যে সেখানে আমরাও বলতে পারি না। আমরা মাঠে প্রতিবাদ করছি।”
আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে এবং এর প্রতিক্রিয়া পরবর্তী সরকারের ওপর কী হতে পারে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, "এখন যে চুক্তিগুলো হচ্ছে, তা পরবর্তী সরকারের ওপর বর্তাবে। আন্তর্জাতিক যে-কোনো চুক্তি আসলে বিবেচনা করা হয়, রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র বনাম প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। ফলে পরবর্তী সরকারের সেগুলো বাতিল করার তেমন সুযোগ থাকে না। ”
" যেসব চুক্তি হচ্ছে তার দায়-দায়িত্ব পরবর্তী সরকারের ওপর বর্তাবে। তারা চাইলে সেটা বাতিল বা রিভিউ করতে পারে। তবে এটা সাধারণত হয় না। কারণ, এখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয় থাকে। তারা নির্বাচিত বা অনির্বাচিত সরকারে চুক্তি বিবেচনা করে না, তারা বিবেচনা করে রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি,” বলেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, "আগের সরকারের আমলের কোনো বৈদেশিক চুক্তি এই সরকারের আমলে বাতিল হতে দেখেছেন? ভারতের সঙ্গে গোলামী চুক্তি বলে রাজনীতি করা হয়, কিন্তু কোনো চুক্তি কি বাতিল করেছে?”
‘সরকার গঠনের সময় তারা শর্ত দেয়নি যে এই কাজ করা যাবে, এই কাজ করা যাবে না'
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ অহাম্মদ বলেন," অন্তর্বর্তী সরকার এমন কিছুই করছে না যা বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। এই জায়গায় সরকারের কমিটমেন্ট অত্যন্ত পরিষ্কার।”
ম্যান্ডেটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এই সরকার গঠিত হওয়ার সময় এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে, কোনো মন্ত্রণালয় বন্ধ করা হয়েছে। ফলে সরকারের সব মন্ত্রণালয় সচল আছে। তাই প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ের যা কাজ, তা করা হচ্ছে। আর সব রাজনৈতিক দল নিয়েই এই সরকার গঠন করা হয়েছে। সরকার গঠনের সময় তারা কোনো শর্ত দেয়নি যে এই কাজ করা যাবে, এই কাজ করা যাবে না। সরকার নিয়মতান্ত্রিকভাবেই সব কাজ করছে দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে।”
"আর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ট্যারিফ আলোচনা এখনো চলছে । ফলে আলোচনায় যদি কোনো শর্ত থাকে যে, এই বিষয় প্রকাশ করা যাবে না, তাহলে তো প্রকাশ করা যাবে না। তাহলে তো আলোচনা হয় না,” নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট সম্পর্কে এই কথা বলেন তিনি।