আফগান নারী ফুটবলারদের লড়াই এখনও শেষ হয়নি
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
তিন বছর আগে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ দূর থেকে দেখা ছাড়া বিশেষ কিছু করার ছিল না আফগান খেলোয়াড়দের৷ যে শহরে তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই শহরেই চলছিল বিশ্বের সেরা নারী ফুটবলারদের লড়াই৷
২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফেরার পর আফগান নারী ফুটবল দলটাই কার্যত মুছে গিয়েছিল৷ খেলোয়াড়রা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, ছড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন দেশে৷ বেশিরভাগই আশ্রয় নেন অস্ট্রেলিয়ায়, কেউ কেউ ইউরোপে৷ ফুটবল ছিল, কিন্তু দেশ ছিল না — অন্তত কাগজে-কলমে৷
সেই দিনগুলোর কথা মনে করলে এখনও গলা ভেঙে আসে ডিফেন্ডার মুরসাল সাদাতের৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পুরোটা সময় চোখের জল থামাতে পারিনি৷ অন্যদের খেলা দেখছি, আর মনে পড়ছে কীভাবে দেশের হয়ে মাঠে নেমেছিলাম৷ সেই গর্বটার কথা ভুলতে পারি না৷'' তাঁর স্বপ্ন একটাই — পরের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আফগানিস্তান যেন মাঠে থাকে৷
মরক্কো থেকে শুরু, পথ এখনও দীর্ঘ
চার বছরের অপেক্ষার পর গত অক্টোবরে আশার আলো দেখা গেল৷ মরক্কোতে একটি প্রীতি টুর্নামেন্টে ‘আফগান উইমেন ইউনাইটেড' নামে মাঠে নামে দলটি — এবং ফিফার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলে৷ চার বছরের আইনি লড়াই, কূটনৈতিক চাপের পর সেটা ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত৷
কিন্তু মরক্কোর ম্যাচের পর আর কোনো ম্যাচ নেই, কোনো নির্ধারিত সূচি নেই৷ চার মাস কেটে গেছে নীরবতায়৷
যুক্তরাজ্যে থাকা গোলকিপার এলাহা সাফদারি অবশ্য হতাশ নন৷ তিনি বলেন, ‘‘মরক্কো শুরু মাত্র, শেষ নয়৷ আমরা প্রতিদিন ট্রেনিং করছি, প্রস্তুত থাকছি৷ পর্দার আড়ালে কাজ চলছে৷ আমরা থামিনি৷'' ইংল্যান্ডের ডনকাস্টারে সম্প্রতি ইউরোপ-প্রবাসী খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি ট্রেনিং ক্যাম্পও হয়েছে৷ অস্ট্রেলিয়ায় থাকা সদস্যদের জন্যও এ রকম ব্যবস্থা হবে বলে জানানো হয়েছে৷
এই সপ্তাহে ফিফা ঘোষণা করেছে, জুন মাসে দলটি দুটি ম্যাচ খেলবে৷ কোথায় খেলা হবে সেটা ‘আগামী কয়েক মাসে' জানানো হবে৷ অস্পষ্ট ঘোষণা, কিন্তু অপেক্ষার চেয়ে ভালো৷
ভিসা প্রত্যাখ্যান, আর ফিফার নীরবতা
মরক্কোতে টুর্নামেন্ট হওয়ার কথা ছিল না আসলে৷ প্রথমে ঠিক হয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতে৷ আমিরাতই আয়োজক, আমিরাতই প্রতিপক্ষ৷ কিন্তু টুর্নামেন্টের আগের সপ্তাহে হঠাৎ ভিসা দিতে অস্বীকার করে তারা৷ শেষ মুহূর্তে সব বদলে মরক্কোতে সরাতে হয় আয়োজন৷
কেন এমন হলো? ফিফা এ প্রশ্নের উত্তর এখনও দেয়নি৷
মানবাধিকার আইনজীবী অ্যালিসন ব্যাটিসন — যিনি খেলোয়াড়দের অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় পেতে সাহায্য করেছিলেন — বলছেন, উত্তরটা আসলে খুব একটা অস্পষ্ট নয়৷ ‘‘আমিরাত চাইলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভিসা দিতে পারে৷ যদি সত্যিই তারা আগে রাজি ছিল এবং পরে সরে গেছে, তাহলে বুঝতে হবে ওপর থেকে নির্দেশ এসেছে৷ কারণ একটাই হতে পারে — আফগানিস্তানে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক৷''
খেলোয়াড়দের অনেকেরও একই সন্দেহ, যদিও তারা সরাসরি বলতে পারছেন না৷
এদিকে ভিসা প্রত্যাখ্যানের মাত্র দুই মাস পর, ডিসেম্বরে, ফিফা ঘোষণা দেয় — এবার থেকে বার্ষিক পুরস্কার অনুষ্ঠান হবে দুবাইয়ে৷ সেই দুবাই, সেই আমিরাত — যারা আফগান নারী ফুটবলারদের দেশে ঢুকতে দেয়নি৷ বিশ্ব ফুটবলের সেরাদের সম্মান জানানো হবে সেই মাটিতে৷ এই বৈপরীত্য নিয়ে ফিফা কিছু বলেনি৷
খেলা নয়, প্রতিবাদ
এই দলটির অস্তিত্ব শুধু ফুটবলের জন্য নয়৷ মুরসাল সাদাত সেটা পরিষ্কার করেই বলেন৷ ‘‘তালেবান যাদের চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছিল, ফুটবল বিশ্ব তাদের বলছে — তোমরা এখনও আছো, আমরা তোমাদের পাশে আছি৷ এটা তালেবানি শাসনের মুখে একটা চপেটাঘাত৷''
মার্চের এশিয়ান কাপ থেকে ব্রাজিল বিশ্বকাপ ২০২৭-এর জায়গা ঠিক হবে — সেই দৌড়ে এই দল নেই এবার৷ লক্ষ্য ২০২৯ এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব৷ এই দীর্ঘ পথ, এত বাধা অতিক্রম করেও এই দলের স্বপ্ন একটাই- নিজের দেশের জার্সির পরে মাঠে নামা৷
ম্যাট পিয়ারসন/এসএসজি