মোজতবা খামেনেইকে সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে ঘোষণা করে ইরান বুঝিয়ে দিলো তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সংঘাতের পথই নেবে।
৫৬ বছর বয়সি মোজতবা খামেনেই (ডানদিকে) লো প্রোফাইলে থাকতে ভালোবাসেন, এতদিন তিনি কোনো সরকারি পদেও ছিলেন না। ছবি: Tasnimnews
বিজ্ঞাপন
মোজতবা খামেনেইয়ের জন্ম ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। তিনি ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেইয়ের দ্বিতীয় সন্তান। ৮৮ সদস্যের অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস তাকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে ঘোষণা করেছে।
মোজতবাকে হামেশাই ইরানের প্রহেলিকাময় নেতা বলা হয়। আবার তিনিই ইরানের ক্ষমতার অলিন্দে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি বলেও পরিচিত। তার সঙ্গে ক্ষমতাশালী ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড(আইআরজিসি)-এর ঘনিষ্ঠ যোগ আছে। অনেকেই মনে করেন, আইআরজিসি আসলে দেশকে চালায়।
তবে মোজতবার সম্পর্কে সাধারণ ধারণা হলো, তিনি তার বাবার পথ অনুসরণ করবেন এবং কট্টরপন্থি শাসন বজায় থাকবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান সময় নষ্ট করছে। খামেনেইয়ের ছেলে লাইটওয়েট। আর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গত সপ্তাহে বলেছেন, আলী খামেনেই-এর উত্তরাধিকারী হিসাবে যাকেই বাছা হোক না কেন, তাকে টার্গেট করা হবে।
কট্টরপন্থি, বিতর্কিত নেতা
৫৬ বছর বয়সি মোজতবা এতদিন খুবই লো প্রোফাইলে থাকতেন। কখনো কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। কিন্তু তার পরিচিতি হলো, ক্ষমতার জটিল পরিকাঠামোয় বিশেষ করে আইআরজিসি-তে তার প্রভাব প্রচুর।
১৯৯০-এর পরবর্তী সময়ে সরকারি কর্মকর্তারা তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব সম্পর্কে অবহিত হন। তাকে তখন ঘিরে থাকতেন আইআরজিসি ফাইটার ও কম্যান্ডোরা
কিন্তু মোজতবা খামেনেই প্রচারের আলোয় আসেন ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনিই প্রেসিডেন্টকে জেতানোর পিছনে মূল কারিগর ছিলেন। সর্বোচ্চ নেতা সেসময় মাহমুদ আহমেদিনেজাদকে প্রেসিডেন্ট করতে চেয়েছিলেন। তিনি সেই ভোটে জেতেন।
যেভাবে ‘বন্ধু’ থেকে পরস্পরের ‘শত্রু’ হলো ইসরায়েল ও ইরান
মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ ইসরায়েল ও ইরানের সাম্প্রতিক যুদ্ধ বৈরি সম্পর্কেরই পরিষ্কার বহিঃপ্রকাশ৷ কিন্তু দেশ দুটোর সম্পর্ক কি সবসময় এমন ছিল? জেনে নিন ছবিঘরে...
ছবি: MENAHEM KAHANA/AFP/Getty Images
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৮ সালের ১৪ মে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ইসরায়েল৷ নতুন রাষ্ট্রটির প্রতিবেশী হয়ে ওঠে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড, মিশর, জর্ডান, সিরিয়া এবং লেবানন৷ বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নতুন রাষ্ট্র ইসরায়েলের বিষয়ে আরব বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ছিল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব৷ ৭ দশক পরেও অনেক আরব রাষ্ট্রের মধ্যে ইসরায়েলের বিষয়ে সেই ‘সংকট’ রয়ে গেছে৷
ছবি: Ahmad Gharabli/AFP
তখনকার ইরান
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময়ে ইরানের মসনদে ছিলেন দেশটির শাহ বংশের সবশেষ শাসক মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি৷ বাবা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়, ১৯৪১ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে ক্ষমতায় আসেন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত রেজা শাহ৷ সেই থেকে ইরানের ইসলামি বিপ্লব পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি৷
ছবি: PA Wire/picture alliance
ইসরায়েলকে স্বীকৃতি
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন গঠিত সার্বভৌম রাষ্ট্র ইসলায়েলের তখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রয়োজন৷ সেই সময়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় ইরান৷ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় ইরানের শাহ সরকার৷
ছবি: Juergen Schwenkenbecher/picture-alliance
বন্ধুত্বের শুরু
স্বীকৃতি প্রদানের মধ্য দিয়ে পার্সিয়ান সভ্যতার দেশ ইরান আর নতুন জন্ম নেওয়া ইসরায়েলের হাতে হাত রেখে পথচলা শুরু হয়৷ এমন সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে দুই রাষ্ট্রই নিজ নিজ সুবিধা আদায় করে নিতে চেয়েছে৷ ইসরায়েল চেয়েছে, এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে আর ইরান চেয়েছে এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করতে৷
ছবি: Bildagentur-online/Schöning/picture alliance
পারস্পরিক সহযোগিতা
নতুন জন্ম নেওয়া ইসরায়েলের তখন জ্বালানি নিরাপত্তাও প্রয়োজন৷ তেলসমৃদ্ধ ইরান নতুন দেশটিকে জ্বালানি সরবরাহে এগিয়ে আসে৷ বিনিময়ে ইরানের নিরাপত্তাবাহিনী গঠন এবং এর আধুনিকায়নে সহযোগিতা করে ইসরায়েল৷ বলা হয়ে থাকে, রেজা শাহ পাহলভির আমলে ইরানের আর্মড ফোর্সেস তৈরিতে সহযোগিতা করে ইসরায়েল৷ তাছাড়া দুদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যও বাড়তে থাকে৷
ছবি: Fars/Dehdari
ইরানে ইহুদি সম্প্রদায়
পরিসংখ্যান বলছে, এক সময় ইরানে ইসরায়েলের পর সবচেয়ে বেশি ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করতেন৷ ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর এই সংখ্যা কমতে থাকে৷ তবে এখনো দেশটিতে প্রায় ২০ হাজার ইহুদি বাস করেন৷
ছবি: dapd
ইরানের ইসলামি বিপ্লব এবং সম্পর্কে ভিন্ন মোড়
১৯৭৯ সালে ইরানের বিল্পবের মাধ্যমে মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হলে ইরানের দায়িত্বে আসেন আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনি৷ এরপর থেকেই ইসরায়েলের সাথে ইরানের সম্পর্ক ভিন্ন দিকে মোড় নিতে থাকে৷ ইসরায়েল রাষ্ট্রকে এই অঞ্চলের জন্য হুমকি মনে করে ইরানের নতুন নেতৃত্ব৷ এমনকি ইসরায়েলকে মুছে ফেলার হুমকিও দেয় তারা৷ সেইসাথে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে ইরান৷
ছবি: FY/AP Photo/picture alliance
ইরানের প্রক্সি গ্রুপ
এরমধ্যে নিজেদের ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান শক্তিশালী করতে থাকে ইরানের নতুন নেতৃ্ত্ব৷ অভিযোগ আছে, ইসরায়েলের প্রভাব ঠেকাতে আশির দশকের পর প্রতিবেশী দেশগুলোতে বেশকিছু জঙ্গিগোষ্ঠি তৈরি করে ইরান৷ এরমধ্যে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইয়েমেনে হুতি গোষ্ঠী৷ এই গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করে ইরান৷ এমন অভিযোগের পর ইসরাযেল-ইরান সম্পর্ক চরম অবনতির দিকে যায়৷
ছবি: AP Photo/picture alliance
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
১৯৬৮ সালে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে সাক্ষর করলেও ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে গোপনে পরমাণু সমৃদ্ধকরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে৷ এই পরমাণু কর্মসূচি ইসরায়েলের অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলতে পারে- এই আশঙ্কা থেকে এর বিরোধিতা করে আসছে ইসরায়েল৷ ১৩ জুন ইরানে হামলা চালানো তারই চূড়ান্ত পরিণতি৷ ইসরায়েলের দাবি, পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে মাত্র কয়েক সপ্তাহ দূরে অবস্থান করছে ইরান৷
ছবি: UGC/AFP
ইরানের আঞ্চলিক সহযোগীদের ওপর হামলা
দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু সমৃদ্ধকরণের কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে করে আসছে ইসরায়েল৷ প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দেওয়ার অভিযোগেও ইরানের সঙ্গে বৈরি সম্পর্ক ইসরায়েলর৷ এর প্রতিক্রিয়ায় ২০১৯ সালে সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাকে হামলা করে ইসরায়েল৷ ইসরায়েলের দাবি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর কাছে ইরানের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে এই হামলা চালানো হয়েছে৷
ছবি: Ayal Margolinc/ JINIPIX/AP/picture alliance
সেনাপ্রধান, বিজ্ঞানী হত্যা
২০১৯ সালে ইরাক সফরকালে গুপ্ত হামলায় নিহত হন ইরানের সেইসময়ের সেনাপ্রধান কাসেম সোলাইমানি৷ এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ইসরায়েলেকে দায়ী করে ইরান৷ ২০২২ সালে পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ ছাড়াও ইরানের এক প্রকৌশলী এবং এক ভূতত্ত্ববিদ হত্যার পেছনেও ইসরায়েল দায়ী বলে ইরানের অভিযোগ৷ এসকল হত্যাকাণ্ডের কোনো কোনোটিতে নিজেদের ভূমিকার কথা পরবর্তীতে স্বীকার করে ইসরায়েল৷
ছবি: Vahid Salemi/AP Photo/picture alliance
সাগরে ছায়াযুদ্ধ
সাগরেও পরোক্ষভাবে সংঘর্ষে জড়িয়েছে ইরান এবং ইসরায়েল৷ ২০২১ সালে ভূমধ্যসাগরে ইসরায়েল উপকূল থেকে ৫০ মাইল দূরে থাকা এক ইরানি জাহাজে বিস্ফোরণ ঘটে৷ এ ঘটনার পেছনে ইসরায়েলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনে ইরান৷ পরবর্তীতে ওমান উপকূল থেকে রওয়ানা দিয়ে আরব সাগরে আসা এক জাহাজে বিস্ফোরণের জন্য ইরানকে দায়ী করে ইসরায়েল৷ ২০১৯ সাল থেকেই লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগরে ইরানের তেল ও অস্ত্রবাহী জাহাজে হামলা করে আসছিল ইসরায়েল৷
ছবি: Katsumi Yamamoto/AP Photo/picture alliance
৭ অক্টোবর, ২০২৪ হামাসের হামলা
২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের ভয়াবহ হামলার পেছনেও ইরানের উসকানি রয়েছে বলে অভিযোগ করে ইসরায়েল৷ এই অভিযোগ অবশ্য বরাবরাই অস্বীকার করে আসছে ইরান৷ হামাসের হামলায় ইসরায়েলে ১২শ মানুষ নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েল৷ ইসরায়েলে এই অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৫ হাজারের ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন৷
ছবি: MENAHEM KAHANA/AFP
13 ছবি1 | 13
২০০৫-এর নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানির রাজনৈতিক দিক থেকে ধাক্কা লাগে। তিনি অবশ্য চুপচাপ ছিলেন। কিন্তু আরেক প্রার্থী সেহদি কারউবি প্রকাশ্যে চিঠি লিখে অভিযোগ করেন, মোজতবা নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছেন।
চার বছর পর মোজতবার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ ওঠে। সেই সময়, আহমেদিনেজাদকে পুনরায় নির্বাচিত করা নিয়ে ইরানজুড়ে প্রবল প্রতিবাদ শুরু হয়। সেই সময় মোজতবার বিরুদ্ধে স্লোগান ওঠে, 'ডেথ টু মোজতবা'।
সরকারি মিডিয়ায় বলা হয়েছে, মোজতবা খুব সরল জীবন যাপন করেন। আইআরজিসি-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, ১৯৮০-র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধে মোজতবা অংশ নেন। মোজতবা যে ব্যাটেলিয়নে ছিলেন, সেখানকার অনেক সদস্যই পরে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন। তারা মোজতবার সমর্থনে ছিলেন।
ইরানে অনেকেই, এমনকী তার বাবা আলী খামেনেই ভাবেননি যে একদিন মোজতবা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হবেন।