জামিন হয়েছে তার, কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচে দুই দিনেও মুক্তি পাননি রোহিঙ্গা ফটোগ্রাফার আবুল কালাম৷ কক্সবাজার কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তারা মঙ্গলবার পর্যন্ত আদালত থেকে জামিনের আদেশ পাননি৷
প্রতীকী ছবিছবি: Getty Images/C. Court
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ী এই রোহিঙ্গা ফটোগ্রাফারকে গত ২৮ ডিসেম্বর সকালে গ্রেপ্তার করা হয়৷ তাকে সোমবার কক্সবাজারের জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত শর্তসাপেক্ষে জামিন দেন৷
আবুল কালাম কুতুপালং ক্যাম্প থেকে ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য বাসের ছবি তুলতে গিয়ে আটক হন৷ এরপর তাকে কুতুপালং ক্যাম্পের ইনচার্জের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়৷ সেখানে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠন, বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার ও নাগরিকদের এক বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে৷
‘‘জিম্মাদার না পাওয়ায় মঙ্গলবার পর্যন্ত তাকে মুক্ত করা যায়নি’’: মোহাম্মদ জামিল
This browser does not support the audio element.
আবুল কালামকে আটক করা হলেও তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা হয়নি৷ তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে পুরনো একটি মামলায়৷ গত জুন মাসে ক্যাম্প ইন চার্জ (সিআইসি) খলিলুর রহমান তার ওপর হামলার অভিযোগে ওই মামলাটি করেন৷ মামলার এজাহারে আবুল কালামের নাম না থাকলেও তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়৷ আর আটকের পর এই খলিলুর রহমানের অফিসেই তাকে রেখে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ৷ ইউএন-এর কনসালটেন্ট এবং হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট রেজা লেনিন বলেন, ‘‘তাকে ২৮ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করা হলেও আইন অনুযায়ী ২৪ ঘন্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা হয়নি৷ তাকে কমপক্ষে ৬০ ঘন্টা পর ৩১ ডিসেম্বর বিকালে আদালতে হাজির করা হয়৷ আর এই হেফাজতে তাকে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে৷’’
ভাসানচরে স্থানান্তর: কী বলছেন রোহিঙ্গারা
শুক্রবার রোহিঙ্গাদের প্রথম ব্যাচ ভাসানচরে পৌঁছেছে৷ তাদের অনেকে সেখানকার সুযোগ-সুবিধা দেখে ভালো লাগার কথা জানিয়েছেন৷ তবে জোর বা নির্যাতন করে রোহিঙ্গাদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও আছে৷
ছবি: Mohammad Ponir Hossain/REUTERS
ভাসানচর প্রকল্প
প্রায় তিন হাজার একশ কোটি টাকা খরচ করে ভাসানচরে আশ্রয়ন প্রকল্প তৈরি করেছে বাংলাদেশ সরকার৷ সেখানে এক লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে৷ স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ভাসানচরে যাওয়া প্রত্যেক রোহিঙ্গা পরিবার আলাদা ঘর পাচ্ছে, আছে রান্নার ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, পানি আর পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা৷ সেই সঙ্গে আছে খেলার মাঠ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও জীবিকা নির্বাহের সুযোগ৷
ছবি: DW/A. Islam
প্রথম ব্যাচ পৌঁছেছে
বাসে ও জাহাজে করে প্রথম ধাপে এক হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গা শুক্রবার ভাসানচরে পৌঁছেছেন৷ পরে তাদের অনেককে মোবাইল ফোনে কক্সবাজারে থাকা সঙ্গীদের ভাসানচরের খবর দিতে দেখা গেছে৷ কেউ কেউ ভিডিও কলও করেছেন৷
ছবি: bdnews24.com
বাবা-মাকে আনতে চান হোসেন
কক্সবাজারের বালুখালী ক্যাম্প থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ভাসনচরে গেছেন মোহাম্মদ হোসেন৷ তিনি বলেন, ‘‘এখানে অনেক ভালো লাগছে৷ আমি এখানে ঘুরেফিরে আবার কক্সবাজার যাবো৷ ওখানে গিয়ে তাদের (বাবা-মা ও ভাইয়ের পরিবার) নিয়ে আসবো৷ তারা যদি না আসে, তাহলে আমি আবার এখানে ফিরে আসবো৷’’
ছবি: Mohammad Ponir Hossain/REUTERS
‘আল্লাহ মিলায়ে দিছে’
কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্প থেকে ভাসানচরে গেছেন মোহাম্মদ জোবায়ের৷ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘এত ভালো পরিবেশের কথা আমরা ভাবতেই পারছি না৷ জীবনে আমরা এত ভালো বাসায় থাকতে পারিনি, থাকতে পারব এটাও আশা করিনি৷ আল্লাহ আমাদের মিলায়ে দিছে৷’’
ছবি: bdnews24.com
নিরাপত্তাবোধ
বালুখালীর ক্যাম্প থেকে ভাসানচরে যাওয়া আবদুর রহমান এখন নিজেকে কিছুটা নিরাপদ ভাবছেন৷ ‘‘ওখানে (বালুখালী ক্যাম্পে) ঘরের বেড়া কেটে চুরি করে নিয়ে যেতো৷ ঘুমিয়ে থাকলে ছুরিও মারতো৷ এখানে তা পারবে না৷ যে ঘরটা পেলাম, সেটা খুবই নিরাপদ৷ কেউ চাইলেই চুরি করতে বা ঘরে ঢুকতে পারবে না৷’’
ছবি: DW/A. Islam
‘লেখাপড়ার জন্য স্কুল, মাদ্রাসা আছে’
বালুখালীর ক্যাম্প থেকে স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে ভাসানচরে যাওয়া আব্দুস সামাদ বলেন, ‘‘এখানে এসে খুব ভালো লাগছে৷ ঘরবাড়ি অনেক৷ অনেক বড় বড় রুম৷ এখানে লেখাপড়ার জন্য স্কুল, মাদ্রাসা আছে৷ বড় খেলার মাঠ আছে৷’’ তিনি বলেন, ‘‘কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে জায়গা কম৷ মানুষ অনেক৷ একজন বের হলে আরেকজন বের হওয়ার জায়গা থাকে না৷’’
ছবি: DW/N. Conrad
পার্থক্য
ভাসানচর আর কক্সবাজারের পরিবেশের পার্থক্য সম্পর্কে জমিনা আক্তার বলেন, ‘‘এখানে বেশি ভালো লাগছে৷ ভালো ঘর, থাকার জায়গা ভালো৷’’
ছবি: bdnews24.com
নির্যাতনের অভিযোগ
রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিতে বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের উখিয়ায় একটি ট্রানজিট ক্যাম্পে নেয়া হয়েছিল৷ সেখানে উপস্থিত ৬০ বছর বয়সি শরণার্থী সুফিয়া খাতুন এএফপিকে জানান, ‘‘আমার ছেলে যেন ঐ দ্বীপে যেতে রাজি হয় সেজন্য তারা আমার ছেলেকে নির্দয়ভাবে পিটিয়েছে, তার দাঁত ভেঙে ফেলেছে৷ আমি এখানে তাকে ও তার পরিবারকে হয়ত শেষবারের মতো দেখতে এসেছি৷’’
ছবি: Munir Uz Zaman/AFP/Getty Images
‘নিজের ইচ্ছায় যাচ্ছে না’
ট্রানজিট ক্যাম্পে উপস্থিত আরেক শরণার্থী হাফেজ আহমেদ এএফপিকে বলেন, ‘‘গত দুইদিন ধরে আমার ভাই নিখোঁজ ছিল৷ আমরা জানতে পেরেছি, সে এখানে আছে৷ এখান থেকে তাকে দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হবে৷ সে সেখানে নিজের ইচ্ছায় যাচ্ছে না৷’’
ছবি: Munir Uz Zaman/AFP/Getty Images
জাতিসংঘের আশঙ্কা, অভিযোগ
জাতিসংঘের আশঙ্কা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে ভাসানচরে পানি উঠে গিয়ে রোহিঙ্গাদের জীবন বিপদাপন্ন হয়ে উঠতে পারে৷ এছাড়া রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘকে যুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ তাদের৷ ভাসানচরে স্থানান্তর প্রসঙ্গে রোহিঙ্গারা যেন ‘স্বাধীন ও তথ্যসমৃদ্ধ’ সিদ্ধান্ত নিতে পারে তা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ৷
ছবি: DW/A. Islam
‘ভুল ব্যাখ্যা’ না দেয়ার অনুরোধ
রোহিঙ্গারা ‘স্বেচ্ছায়’ ভাসানচরে গেছে জানিয়ে এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ বলেছে, ‘‘জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একমাত্র বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হওয়া উচিত প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে ও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত হওয়া, সেটাই একমাত্র স্থায়ী সমাধান৷ একইসঙ্গে বাংলাদেশের আন্তরিক চেষ্টাকে খাটো করা ও ভুল ব্যাখ্যা না করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক হতে সবার প্রতি আমরা আহ্বান জানাচ্ছি৷’’
ছবি: Mohammad Ponir Hossain/REUTERS
বিএনপির বক্তব্য
রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেয়ায় তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে করছে বিএনপি৷ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে উপেক্ষা করে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে ‘আত্মহনন’ বলেও আখ্যায়িত করেছে দলটি৷
ছবি: Mohammad Ponir Hossain/REUTERS
12 ছবি1 | 12
খলিলুর রহমান নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘‘জুন মাসে আমার ওপর হামলার ঘটনার মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করি৷ আবুল কালামের নাম না থাকলেও অজ্ঞাত আসামি হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছে৷'' আবুল কালাম তার ওপর হামলা করেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘তদন্তে নাম আসতে পারে৷''
ইউএনএইচসিআরের আইনজীবী মোহাম্মদ জামিল জানান, ‘‘আদালত আবুল কালামকে শর্ত সাপেক্ষে জামিন দিয়েছেন৷ বলা হয়েছে, কুতুপালং ক্যাম্পের ইনচার্জ অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে জিম্মাদার হতে হবে৷ তাই জিম্মাদার না পাওয়ায় মঙ্গলবার পর্যন্ত তাকে মুক্ত করা যায়নি৷ আশা করছি বুধবারে মুক্ত করতে পারবো৷''
‘‘তদন্তে আবুল কালামের নাম আসতে পারে’’: খলিলুর রহমান
This browser does not support the audio element.
স্থানীয়দের কারো কারো অভিযোগ, ক্যাম্প ইনচার্জ খলিলুর রহমানই এখনো কলকাঠি নাড়ছেন৷ তিনি নিজে তো জিম্মাদার হচ্ছেনই না, উপরন্তু অন্যদেরও জিম্মাদার হতে বাধা দিচ্ছেন৷ এ অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আমি জিম্মাদার হবো কেন? অন্য কেউ হলে হতে পারেন৷''
খাতিমান আলোকচিত্রী শহীদুল আলম বলেন, তিনি পুরস্কারজয়ী ফটোগ্রাফার বা রোহিঙ্গাশরণার্থী এটা কোনো বিষয় না৷ মূল বিষয় হলো তিনি ছবি তুলেছেন৷ ছবি তোলা কোনো অপরাধ নয়৷ এটা কোনো অবৈধ কাজ নয়৷ তাকে বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ এটা বেআইনি৷ সরকারের কোনো কাজ পছন্দ না হলেই সেটাকে অন্যায় বিবেচনা করবে সরকার, এটা তো হতে পারে না৷ সরকারের পছন্দ-অপছন্দের ওপর ন্যায়-অন্যায় নির্ভর করে না৷ আইনে সেটা গ্রহণযোগ্য নয়৷''
আটক আবুল কালামের বয়স ৩৫৷ ২৮ বছর ধরে তিনি শরণার্থীর জীবনযাপন করছেন৷ তিনি মিয়ানমারের মংডুর বরগজবিল থেকে কক্সবাজারে এসেছেন৷ তার তোলা ছবি অনেক প্রকাশনায় সংযুক্ত হয়েছে এবং তিনি সম্প্রতি রোহিঙ্গা আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় দুটি পুরষ্কার জিতে নিয়েছেন৷ আবুল কালাম বিবাহিত এবং চার সন্তানের জনক৷