বাংলাদেশে ধর্মবিশ্বাসী ও ধর্মবিরোধী, দুই পক্ষের উগ্রবাদই নিন্দনীয়, তবে এবারের ঘটনায় বেশি উসকানি দিয়েছে ধর্মবিশ্বাসী মৌলবাদীরা- ডয়চে ভেলে বাংলার সাপ্তাহিক টকশোতে এ কথা বলেছেন ড. আসিফ নজরুল৷
ছবি: DW
বিজ্ঞাপন
‘খালেদ মুহিউদ্দীন জানতে চায়' সাপ্তাহিক ইউটিউব টকশোতে এবার আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মীজানুর রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল৷ এবারের আলোচনার বিষয় ছিল ‘সবার জন্য সমান আইন'৷ কথায়-কথায় উঠে আসে বাংলাদেশে উগ্রবাদ ও উসকানির প্রসঙ্গও৷
ড. মিজানুর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার লালমনিরহাটে যে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, এমন ঘটনা দেশে এই প্রথম নয়৷ এমনটা আগেও ঘটেছে৷ তাঁর মতে, এবারের বিশেষত্ব হচ্ছে মানুষের মধ্যে করোনাকালীন হতাশা ও ক্ষোভ৷ সাথে ধর্মীয় উন্মাদনাও যোগ হয়েছে ফ্রান্সের ঘটনার পর৷ তাঁর মতে, এক ধরনের ‘‘রিএনফোর্সমেন্ট হয়ে এই ক্ষোভ এসেছে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে৷'' ড. রহমান মনে করেন, এমন ঘটনা বাংলাদেশের জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু নয় আর অন্যান্য দেশেও রয়েছে মানুষের গণবিচারের প্রবণতা৷
এ প্রসঙ্গে সঞ্চালক খালেদ মুহিউদ্দীন আইনের সামনে জনগণের সাম্যের প্রশ্ন উত্থাপন করলে ড, আসিফ নজরুল বলেন, ‘‘বিচারবহির্ভূত হত্যা, সে যে-ই করুক, এই ধরনের হত্যার বান্ধব পরিস্থিতি দেশে সৃষ্টি হয়েছে৷ দেশে যারা দায়িত্বপূর্ণ পদে আছেন, তারা অকপটে ক্রসফায়ারকে সমর্থন করে, গণপিটুনির কথা বলেন৷ অন্যায়ের বিচার যে আদালতের বাইরে করা যায়, সেটা মানুষের মনে ঢুকে গেছে৷''
সাম্প্রদায়িকতা কীভাবে দূর করা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের আট নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলেছে ডয়চে ভেলে৷ ছবিঘরে থাকছে তাঁদের কথা৷
ছবি: AFP/Getty Images
সাদেকা হালিম, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরকে ঢেলে সাজাতে হবে৷ শিক্ষা ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে হবে৷ এছাড়া দেশের প্রতিটি মানুষকে যার যার অবস্থান থেকে একসঙ্গে কাজ করলে অসাম্প্রদায়িক কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব৷ এ ব্যাপারে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা আছে৷ আরেকটি বিষয় হলো, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সকল ধর্মের সবাই মিলে যার যার অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করতে হবে৷
ছবি: DW/M.M.Rahman
গোলাম কুদ্দুস, সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট
কোনো ধর্মই মানুষের অকল্যাণের কথা বলে না৷ পৃথিবীর সব ধর্মই মানুষের কল্যাণের কথা বলে৷ তাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে কেউ যাতে ধর্মের অপব্যাখ্যা করে তাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে সেদিকে নজর দিতে হবে৷ দেশের প্রতিটি মানুষকে যদি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করা যায় তাহলেও দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূর হবে৷
ছবি: DW/M.M.Rahman
আইনুন নাহার সিদ্দিকা, আইনজীবী
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সব রকমের রাজনৈতিক উস্কানি বন্ধ করতে হবে৷ আমরা যেন এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের পেছনে কখনো না লাগি৷ সবাই সবার ধর্মকে সম্মান করি৷
ছবি: DW/M.M.Rahman
শেখ শাফায়াতুর রহমান, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কখনো শক্তি আর অস্ত্র দিয়ে লড়াই করা যাবে না৷ আমাদেরকে আমাদের বুদ্ধি আর মেধা দিয়ে লড়াই করতে হবে৷ গ্রামে-গঞ্জে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দিতে হবে৷
ছবি: DW/M.M.Rahman
রেখা শাহা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে দেশের সর্বত্র সকল ধর্মের উৎসব নির্বিঘ্নে পালন করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে৷ সবাই যেন সবার ধর্মীয় উৎসবগুলোতে অংশ নিতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে৷ এছাড়া সবাই মিলে একটি দুর্নীতি, অন্যায়, অত্যাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারলে সাম্প্রদায়িকতাও দেশ থেকে দূর হবে৷
ছবি: DW/M.M.Rahman
খরাজ মুখোপাধ্যায়, অভিনেতা, পশ্চিমবঙ্গ
আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ৮৫ শতাংশ মেকআপ আর্টিস্টই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের৷ কই, আমাদের তো সমস্যা হয় না! আমরা মন থেকে কোনও বিভেদে বিশ্বাস রাখি না৷ তাই নিজেদের মধ্যেও বিভেদ জন্মায় না৷ মনের অন্ধকার দূর করাটাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বড় হাতিয়ার৷
সত্যিকারের জ্ঞান মনের সংকীর্ণতা দূর করে৷ তাই শুধু ডিগ্রি দিয়ে লাভ নেই৷ জ্ঞানের আলো জ্বালাতে প্রথাগত শিক্ষার সঙ্গে প্রকৃত শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে৷ সেটাই হবে আদর্শ জ্ঞাননির্ভর সমাজ৷ সেই সমাজ এমন মানুষ তৈরি করবে, যার মধ্যে উগ্রতা থাকবে না৷
ছবি: DW/P. Samanta
পতিতপাবন রায়, পিয়ারলেস, পশ্চিমবঙ্গ
ব্যক্তিগতস্তরে ধর্মীয় অনুশাসন মানতে অসুবিধে নেই৷ কিন্তু সমষ্টিগতস্তরে মানতে হবে রাষ্ট্রীয় অনুশাসন৷ দেওয়ানি বিধির অধীনে সবাইকে রাখতে হবে৷ রাজনীতির অনুপ্রবেশ রুখে সবার জন্য সমান আইন প্রণয়ন দরকার৷ তবেই রাস্তা আটকে নামাজ পড়া বা মণ্ডপ তৈরি নিয়ে দাঙ্গা হবে না বা রক্তও ঝরবে না৷
ছবি: DW/P. Samanta
8 ছবি1 | 8
তবে এমন পরিস্থিতিতে উসকানি কতটা ভূমিকা পালন করে ও কোন পক্ষের দায় এতে বেশি, এই প্রশ্নটিও ওঠে৷ এ প্রসঙ্গে ড.আসিফ নজরুল বলেন, ‘‘বাংলাদেশে ধর্মবিশ্বাসী ও ধর্মবিরোধী, দুই পক্ষেই উগ্রবাদ আছে৷ দুই পক্ষই উসকানি দেয়৷ একদিকে ধর্মের মোড়লরা আর অন্যদিকে ধর্মবিরোধী মৌলবাদীরা৷ দেশে বা বিদেশে বসে তারা উসকানি দিয়ে যাচ্ছে৷ দু'টিই নিন্দনীয়৷ তবে এই ঘটনায় ধর্মান্ধরা যে বেশি প্রচারণা চালিয়েছেন, তা নিশ্চিত৷''
ড. রহমান আংশিকভাবে একমত হয়ে বলেন, ‘‘অবশ্যইধর্মান্ধ ও নাস্তিক, দুইপক্ষে উসকানির নজির আছে৷ কিন্তু নাস্তিকরা কাউকে আক্রমণ করে মারছে না৷''
এছাড়াও আলোচনায় উঠে আসে সংবাদমাধ্যমের সংবাদপ্রকাশে স্বাধীনতা ও সীমাবদ্ধতার কথা৷