ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষ্যে নেই কোনো রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা
৭ মার্চ ২০২৬
২০২১ সালে বিএনপি ৭ মার্চ নিয়ে ঢাকায় একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিলো। কিন্তু ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৬ সালের নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠন করলেও এবার নেই কোনো রাষ্ট্রীয় বা দলীয় আয়োজন।
বরং ৭ মার্চের ভাষণ নিজ উদ্যোগে বাজানোর কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেককে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম।
শনিবার সকালে নওগাঁ জেলায় আওয়ামী লীগের ভাঙচুর হওয়া অফিস থেকে ৭ মার্চের ভাষণ কিছু সময়ের জন্য প্রচারের খবর পাওয়া গেছে। সকাল থেকেই ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। সেখানে কাউকে ঢুকতে দেয়া হয়নি।
বাংলাদেশে ডিডাব্লিউ এর কনটেন্ট পার্টনার প্রথম আলো জানিয়েছে, ধানমন্ডিতে ফুল দিতে যাওয়ার পথে চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফজলে আশিক প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে তিনজন নারী ও একজন পুরুষ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিও বিভিন্ন দপ্তর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। ঢাকার ধানমন্ডিতে ৩২ নম্বরের বাড়িটিও একাধিকবার ভাঙচুর ও আগুনের হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় অন্তর্বর্তী সরকার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ মার্চের ভাষণ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ!
২০১৭ সালে ইউনেস্কো এই ভাষণকেঐতিহাসিক দলিল হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। ২০২১ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত ৭ মার্চের ভাষণকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করার আদেশ দেয়। এরপর আওয়ামী লীগের শাসনামলে অষ্টম শ্রেনির পাঠ্য বই ‘‘সাহিত্য কণিকায়” ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য জানুয়ারি মাসে যে বই বিতরণ করা হয় তা থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, "১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ একটি মোমেন্টাম তৈরি করে। ওই ভাষণ ইতিহাসের একটা অনবদ্য অধ্যায়। আমরা অতীতে দেখেছি বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকার যখন ক্ষমতায় এসেছে তখন এই ভাষণকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী গুরুত্ব দিয়েছে। আবার কেউ কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যা হয়েছে তা শুধু ৭ মার্চের ভাষণ নয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেই তারা মুছে দেয়ার চেষ্টা করেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্থাপনা ধ্বংস করেছে। ৭ মার্চের ভাষণ পাঠ্যপুস্তক থেকে নাই করে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি যেন তাদের এক ধরনের বিদ্বেষ ছিলো। কিন্তু এখন নতুন সরকার এসেছে। আশা করছি তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যথাযথ গুরুত্ব দেবে।”
তিনি মনে করেন, "৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার সরাসরি ঘোষণা ছিলো কী-না -এই বিতর্ক সৃষ্টি করে লাভ নাই। ওই ভাষণ জাতিকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে গেছে। ওই ভাষণ জাতিকে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে এটা বাদ দেয়া মেটেই ঠিক হয়নি। বিশ্ব ইতিহাসের কয়েকটি ভাষণের মধ্যে ওই ভাষণ একটি। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণটি পড়ানো হয়।”
শিক্ষক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক আফসান চৌধুরী বলেন, "১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সেনা সরকার যখন সংসদ অধিবেশন বাতিল বা পিছিয়ে দেয় তার ফলে ৭ মার্চের ভাষণ। তখন প্রতিরোধ আন্দোলন চলছিলো। ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে এই ম্যাসেজটি যায় যে আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে। এর ঐতিহাসিক পটভূমি ১৯৭১ সালে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ ছিলো।”
"এখন এর নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা আছে। কখনো বলা হয় ওটা ছিলো স্বাধীনতার ঘোষণা। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এর প্রমাণ আমার কাছে নাই। কারণ ওই ভাষণের পরদিনই তো পাকিস্তানীদের সাথে আলোচনায় বসেছে। পাকিস্তানিরা নিজেরাই হয়তো ভেবেছিলো যে শেখ সাহেব স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন এবং তখন তারা আক্রমণ করবে। ২০০০ সালে আমরা যখন পাকিস্তানে গিয়েছিলাম, আমাদের পাকিস্তানিরাও বলেছিলো এই বিষয়টা। পাকিস্তানিরা আবার এটাও বলে যে শেখ সাহেব কিন্তু ওই ভাষণে স্বাধীনতার কথা বলে দিয়েছেন চালাকি করে। বিষয়টা কে কীভাবে ভেবেছে আমরা জানি না। মানুষ কিন্তু ভাবেনি পরের দিন থেকে স্বাধীন হয়ে গেছে। মানুষ ভেবেছে প্রতিরোধ হচ্ছে, অসহযোগ হচ্ছে। সেটাই মাথায় ছিলো। এটা নয় যে একেবারে লাফ দিয়ে পড়েই স্বাধীনতা,” বলেন তিনি।
তবে এই ভাষণই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা দিয়ে উজ্জীবিত করেছে বলেও মনে করেন এই গবেষক।
তিনি বলেন, "ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো - এর মাধ্যমে এই সংবাদ গেছে যে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু প্রস্তুত মানে কি যুদ্ধ, প্রস্তুত মানে কি স্বাধীনতা-এই রকম কোনো বিষয়ের উল্লেখ নাই। বিভিন্ন মানুষের কাছে এর মানে বিভিন্ন রকম। রাজনৈতিক কর্মীরা হয়তো ভেবেছে এটা স্বাধীনতা, কেউ হয়তো ভেবেছে এটা প্রতিরোধ। কেউ মনে করেছে আন্দোলন।”
বাংলাদেশে ইতিহাসকে ইতিহাসের মর্যাদা না দিয়ে সেটিকে রাজনৈতিক ঝগড়ার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে মনে করেন গবেষক আফসান চৌধুরী।
"কিন্তু এটা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিকভাবে এর নানা মানে সৃষ্টি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে এক রকম। বিএনপির আমলে ছোট করা হয়েছে। এখন হয়তো আরো ছোট করা হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাসের বিষয় রাজনীতি দিয়ে ঠিক করা যায় না। চলমান রাজনীতিতে ইতিহাসের ঝগড়া চলে। সেটা চলছে। কিন্তু সেটা দিয়ে তো আর ইতিহাস হয় না। বিভ্রান্তি হয়। আমাদের ইতিাহাস জানা হয়ে ওঠে না ঠিক মতো।”
৭ মার্চ ও বঙ্গবন্ধু, রাজনীতি বনাম ইতিহাস
২০২১ সালে ঢাকায় বিএনপির পক্ষ থেকে যখন ৭ মার্চ নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয় তখন সেই আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি এবারের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ডয়চে ভেলের পক্ষ থেকে শনিবার তাকে ফোনে ৭ মার্চ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, "এখন একটি জরুরি মিটিং-এ যাচ্ছি , এখন এই বিষয়ে কথা বলতে পারছিনা।”
তবে বিএনপির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক সংসদ সদস্য এ বি এম মোশররফ হোসেন ডিডাব্লিউকে বলেন, "৭ মার্চের ভাষণ ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। আর এটার একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে এটা অস্বীকার করা যায় না। শাসন ব্যবস্থায় ঐতিহ্যগত গুরুত্ব আছে, কিন্তু বর্তমান অবস্থায় এর প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।”
তিনি বলেন, "আসলে আমাদের ঐতিহ্যগুলোকে আমরা এত বেশি দলীয়করণ করে ফেলি, দলীয় স্বার্থে এমনভাবে ব্যবহার করি যে তার গুরুত্ব কমে যায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এমনভাবে দলীয়করণ করেছে যে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো গুরুত্ব হারিয়েছে। ৭ই মার্চের পরিণতিও তাই হয়েছে।”
৭ মার্চ নিয়ে এবার কোনো রাষ্ট্রীয় আয়োজন না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এটা তো সরকারের বিষয়। সরকারের নীতি নির্ধারকরা বলতে পারবেন।”
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কখনও বাদ দেয়া বা কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স।
তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, "৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, যদি পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে তাহলে বাঙালিরা স্বাধীনতা ঘোষণা করবে। এবং বাঙালিরা কী করবে তাও পরিস্কার হয়। প্রয়োজনে তারা সশস্ত্র সংগ্রাম করবে।”
"আমরা দেখেছি ইতিহাস লেখার সময় যারা ক্ষমতাসীন ছিলেন তারা যার যার মতো করে ইতিহাস লিখেছেন। আমাদের এ থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক ইতিহাস দিকে যেতে হবে। আমরা দেখেছি বিগত সরকার( অন্তর্বর্তী সরকার) পাঠ্যপুস্তকে অনেক কিছু সংযোজন-বিয়োজন করেছে। যা নিয়ে বিতর্ক আছে। তারা ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দিয়েছে, এটা ঠিক হয়নি। পাঠ্য পুস্তকে ৭ মার্চের ভাষণ থাকা দরকার। এটা আমরা এখন বলছি না। যখন বাদ দেয়া হয় তখনো বলেছি।”
৭ মার্চ যে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্ব, মানছেন এনসিপির যুগ্ম আহবায়ক মনিরা শারমিনও। ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, "সেই সময়ের জন্য ৭ মার্চের ভাষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ একটা ডাকের অপেক্ষায় ছিলো ওই ভাষণের মধ্য দিয়ে মানুষ ডাক পেয়েছে। দিক নির্দেশনা পেয়েছে।”
"কিন্তু ইতিহাস আমাদের নির্মোহভাবে দেখতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমানের একাত্তর এবং এর পূর্ববর্তী ভূমিকা যেমন আলোচনায় আসা দরকার তেমনি একাত্তর পরবর্তী পঁচাত্তর পর্যন্ত তার ভূমিকাও জানা দরকার। ইতিসাসে যার যা জায়গা তা তাকে দিতে হবে। ইতিহাস তো আর অস্বীকার করা যাবেনা। কিন্তু আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি রাজনৈতিকভাবে ইতিহাসকে বলার চেষ্টা হয়েছে। যেমন জিয়াউর রহমান সাহেব যে শেখ মুজিবুর রহসানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন সেখান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাদ দিয়েছে বিএনপি। আবার আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযোদ্ধাই বলতে চায় না। আসলে যার যা অবদান তা স্বীকার করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ ছিলো একটি জনযুদ্ধ। এটা একক কোনো দল ও ব্যক্তির বিষয় নয়,” বলেন তিনি।
জামায়াতের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছে ডিডাব্লিউ। তবে কেউই এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
আওয়ামী লীগ যা ভাবছে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির প্রধান শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা দেশের বাইরে পলাতক। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে দলটির কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দেশের নানা স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলোও বন্ধ আছে। অনেক কার্যালয় দখল এবং ভাংচুর করা হয়েছে।
সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত অজ্ঞাত স্থান থেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ডিডাব্লিউকে বলেন, "৩২ নাম্বারে তারা পুলিশ মোতায়েন করেছে ৭ মার্চ উপলক্ষ্যে, কেন? ৭ মার্চ যদি গুরুত্বহীন হয়ে যায় তাহলে তো ৩২ নাম্বারে পুলিশ মোতায়েন করার দরকার ছিলো না, তাই না?”
তিনি বলেন, "এটা তো এখন মানুষের কাছে পরিস্কার যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী একটি অপশক্তি বাংলাদেশকে দখল করেছিলো। যে কারণে তারা এগুলো মুছে দেয়ার চেষ্টা করছে এবং চেষ্টা করেছে। এই পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের প্রভাব যত দিন থাকবে , অপারেট করবে ততদিন তারা তাদের চেষ্টা চালিয়ে যাবে।”
"কিন্তু বাংলাদেশ যত দিন থাকবে মুক্তিযুদ্ধ থাকবে, বঙ্গবন্ধু থাকবে, ৭ মার্চ থাকবে। এগুলো কখনোই মুছে ফেলা যাবেনা। মানুষের মন থেকে মোছা যাবেনা। মুক্তিযুদ্ধ এমন একটা শক্তি, ৭ মার্চ এমন একটা শক্তি- এটা আবার দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে,” বলেন তিনি।