কাল তালিকা, বাদ কত নাম?
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া শেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে। এর পরে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাবে। সংখ্যা নিয়ে জল্পনার মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে কাউন্টডাউন।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকা
এসআইআর প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল, সেই তালিকায় প্রথমেই বাদ পড়েছে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম। কমিশন সূত্রের খবর, নোটিস পাওয়ার পরে শুনানিতে আসেননি কমপক্ষে ছয় লক্ষ ভোটার। অনিবার্যভাবে এই ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়তে চলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে দেশের আরও ১১টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে। বিহারে নির্বাচনের ঠিক আগে সমীক্ষা হয়েছিল। সেখানে বেশ কিছু গড়বড় ধরা পড়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কমিশন বনাম রাজ্য সরকারের সংঘাত যে জায়গায় পৌঁছেছে, তা এ সব রাজ্যে দেখা যায়নি।
এসআইআরে গুজরাটে বাদ পড়েছে ৬৮ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম। মধ্যপ্রদেশে ৩৪ লক্ষের বেশি, কেরলে প্রায় ৯ লক্ষ বাদ পড়েছে। কিন্তু কোনও রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের মতো এত রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা হচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তামিলনাডু এবং কেরলে বিধানসভা ভোট হওয়ার কথা। ওই দুটি রাজ্যে বিজেপি বিরোধী দল ক্ষমতায় রয়েছে।
প্রায় চার মাসের প্রক্রিয়া
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয় গত বছরের ৪ নভেম্বর। সে দিনে সারা রাজ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনিউমারেশন ফর্ম বিলির প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
সবশেষ তালিকা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯ জন (প্রায় ৭.৬৬ কোটি)। ৪ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বুথ লেভেল অফিসাররা ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের পূরণ করা ফর্ম সংগ্রহ করেন। ১৬ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়।
সে দিন থেকে গত ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এই সংক্রান্ত আপত্তি জানানোর সময়সীমা নির্ধারিত ছিল। শুনানি শেষে ১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা ছিল। যদিও নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন কমিশন কাজ শেষ করতে পারেনি।
যদিও বিপুল এই প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে বড় সংখ্যায় অফিসাররা নিযুক্ত ছিলেন। ২৪ জন জেলা নির্বাচন আধিকারিক (ডিইও), ২৯৪ জন ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ইআরও), ৩০৫৯ জন সহকারী ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (এইআরও) কাজ করছেন।
এদের অধীনে রাজ্যের ৮০,৬৮১টি বুথে তৃণমূল স্তরে কাজ করেছেন বুথ লেভেল অফিসাররা (বিএলও)। পরে শুনানি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিচারকদের নিযুক্ত করা হয় যাতে সংশোধন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা যায়।
পশ্চিমবঙ্গে বেশি সমস্যা?
পশ্চিমবঙ্গের মতো অন্য রাজ্যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে এত সমস্যা নেই বলে দাবি বিজেপির।
এই দাবি খারিজ করে সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য বলেন, "সারা দেশে নির্বাচন সংক্রান্ত ঝামেলা হচ্ছে না, এটা ভুল তথ্য। গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থানেও অনেক বিএলও মারা গিয়েছেন। রাহুল গান্ধীর দেওয়া তালিকা অনুযায়ী গুজরাটে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি ছিল। উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকারও এই নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে।"
তিনি বলেন, "পশ্চিমবঙ্গ একটি সীমান্তবর্তী রাজ্য হওয়ার কারণে এখানে ভোটারদের সঙ্কট অনেক বেশি। দেশভাগের সময় পাঞ্জাবে জনসংখ্যা বিনিময় হলেও বাংলায় তা হয়নি। ফলে ১৯৪৭ সালের পর ১৯৬৫, ১৯৭১ এমনকি ২০০৫ সাল পর্যন্ত ওপার বাংলা থেকে বহু হিন্দু শরণার্থী এসেছেন। তাদের কাছে সব নথিপত্র নেই। এসআইআর-এর মাধ্যমে যা চাওয়া হচ্ছে, তাতে এই মানুষগুলো চূড়ান্ত সঙ্কটে পড়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারও তাদের কোনো নির্দিষ্ট আশ্বাস দিতে পারেনি।"
তিনি বলেন, "কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, উত্তরপ্রদেশের মতো বড় রাজ্যেও প্রশাসনিক সঙ্কট তীব্র। সেখানেও কয়েক কোটি মানুষকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। আমরা শুধু পশ্চিমবঙ্গের খবর দেখি বলে মনে হয় সমস্যা কেবল এখানেই।"
নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও রাজ্য সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক বিমলশঙ্কর নন্দ ডিডাব্লিউকে বলেন, "রাজ্য সরকার কখনোই চায়নি যে এসআইআর প্রক্রিয়াটা ঠিকঠাক হোক। শাসক দল পদে পদে বাধার সৃষ্টি করেছে এবং অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে প্রশাসনকে ব্যবহার করে এই সাংবিধানিক প্রক্রিয়াটিকে বানচাল করার চেষ্টা করেছে, যা ভারতীয় রাজনীতিতে অভূতপূর্ব। বিহারের মতো পশ্চিমবঙ্গেও যখন মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখনই শাসক দল প্রমাদ গুনেছিল।"
অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, "উত্তরপ্রদেশ বা গুজরাটের মতো রাজ্যে যেখানে ১৭-১৮ শতাংশ নাম বাদ গিয়েছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ৮ শতাংশ নাম বাদ যাওয়া সত্ত্বেও এত গোলমাল কেন? এর কারণ হলো, শাসক দল আতঙ্কিত।"
কত নাম বাদ পড়বে?
সাংবাদিক প্রসূন আচার্য গোড়া থেকেই এসআইআর প্রক্রিয়াকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, "৮০ লক্ষ মানুষ এখনো পর্যন্ত আনম্যাপড এবং তাদেরকে আরো রি-ভেরিফিকেশন করার কথা বলেছে। সবাই ভেবেছিল এটা কয়েক লক্ষ হবে। ৫, ৭, ১০ লক্ষ হবে। পরবর্তীকালে আবার শুনানির পর সাপ্লিমেন্টারিতে তাদের ফাইনালি নাম উঠবে। এবং এটা খুব পরিষ্কার এখন গোটা বিষয়টা জুডিশিয়াল প্রসেসের দিকে চলে গিয়েছে।"
তার মতে, "পশ্চিমবঙ্গে যতজন জুডিশিয়াল অফিসার নিযুক্ত হয়েছেন, সেটাও সংখ্যায় যথেষ্ট নয়, ৫০০ জন মতো এ পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে। এবার ভিন রাজ্য থেকে বিচারক আনতে হবে। সব মিলিয়েই ব্যাপারটা এতটাই অথৈ জলে। সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার ভাবে বলেছে যে এই পদ্ধতিতে যদি ভেরিফিকেশন চলে, তাহলে আরও ৮০ দিন সময় লাগবে। অথচ ৪০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা হয়ে যাবে। সুতরাং নাম আর তোলা যাবে না।"
তিনি বলেন, "প্রথম দফায় নাম বাদ গেল ৫৮ লক্ষের। তারপরে আবার দেড় কোটি মানুষকে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি-সহ অন্যান্য ব্যাপারে ডাকা হল। এর মধ্যে থেকে আরো ৬০-৭০ লাখ মানুষকে প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়েছে।"
প্রসূনের বক্তব্য, "আমার ধারণা যে চূড়ান্ত তালিকা যেটা কাল প্রকাশিত হবে, সেটা থেকে অন্তত ৭০ লক্ষের নাম তো প্রাথমিকভাবে বাদ যাবে। ৫৮ লাখ তো আগেই গিয়েছে। এর সঙ্গে ৭০ লক্ষ বাদ যাবে। এই ৭০ লক্ষ মানুষকে আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে ভেরিফিকেশন শেষ করে ফাইনাল লিস্টে তোলা অসম্ভব ব্যাপার। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবেন বলে আমার আশঙ্কা।"
সংখ্যালঘুদের অবস্থান ঠিক কোথায়? তাদের নাম কি বেশি বাদ পড়বে?
এর ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "পশ্চিমবঙ্গের একটা বিশেষ পরিস্থিতি।পশ্চিমবঙ্গ পার্টিশনের শিকার, এখানকার মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে বাংলাদেশের মানুষও বাংলা ভাষায় কথা বলে। এখানে ৩০ শতাংশ মুসলমান বাংলাতেই কথা বলে। তাদের বাংলাদেশি বলে দাগানো হচ্ছে। মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের অধিকাংশ মুসলিমরা সমস্ত কাগজপত্র জমা করেছিলেন, ফলে তারা আনম্যাপড হয়েছিল সবচেয়ে কম ২ শতাংশ। কিন্তু পরে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে তাদের ৬০-৭০ শতাংশ মানুষকে ডেকে পাঠানো হয়েছে।"