প্রথমে ডনাল্ড ট্রাম্প, তারপর আন্তোনিও গুতেরেস কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেন। জম্মু ও কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গুতেরেস বলেছেন, দুই পক্ষ যদি চায়, তা হলে তিনি মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত৷ গুতেরেসের প্রস্তাব ভারতের পক্ষে অস্বস্তিকর৷ কারণ, তিনি কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্থতার কথা বললেন এবং সেটাও বললেন পাকিস্তানে৷
ভারত অবশ্য গুতেরেসের এই প্রস্তাব সঙ্গে সঙ্গে খারিজ করে দিয়েছে৷ বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রবিশ কুমার জানিয়েছেন, ''জম্মু ও কাশ্মীরনিয়ে নয়াদিল্লির অভিমত আগেও যা ছিল, এখনও তাই আছে। ভবিষ্যতেও বদলাবে না। কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এ নিয়ে তৃতীয় কোনও পক্ষের মধ্যস্থতার প্রশ্নই ওঠে না। পাকিস্তান বেআইনিভাবে ও জোর করে কাশ্মীরের একটা অংশ দখল করে আছে। ফয়সালা তো সেই ব্যাপারে হওয়া দরকার৷ এর বাইরে কাশ্মীর নিয়ে কোনও সমস্যা থাকলে তা দুই দেশ আলোচনা করে মিটিয়ে নেবে। তার জন্য তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই৷''
অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্থতার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন৷ প্রতিবারই ভারতের তরফে একই কথা জানানো হয়েছে৷ তবে এ বার জাতি সংঘের মহাসচিব মধ্যস্থতার ইচ্ছে প্রকাশ করায় বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল। ভারতের উপরেও চাপ তৈরি হল। রবিশ বলেছেন, ''পাকিস্তান যাতে সন্ত্রাস বন্ধের ক্ষেত্রে উপযুক্ত, দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নেয়, সেটা নিশ্চিত করুন মহাসচিব৷ সীমান্তপারের সন্ত্রাসে ভারতের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে৷''
গুতেরেস অবশ্য পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কুরেশির সঙ্গে বৈঠক করার পর সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, জম্মু ও কাশ্মীর এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে তিনি খুই উদ্বিগ্ন৷
ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশকেই সংযত থাকতে হবে, উত্তেজনা কমাতে হবে, কথার লড়াই থামাতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সুস্থিতির জন্য দুইটি হাতিয়ার রয়েছে, আলোচনা ও কূটনীতি৷ দুই দেশ তাই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর সমর-সম্ভার কম করুক৷
কাশ্মীর নিয়ে ভারতের অবস্থান কারও অজানা নয়, তা সত্ত্বেও বারবার কেন এই মধ্যস্থতার কথা বলা হচ্ছে? তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, ''এর কারণ হল, পাকিস্তান বারবার বিষয়টি জাতিসংঘেরবৈঠকে তোলার চেষ্টা করছে। তাদের বন্ধু দেশগুলিরও সাহায্য আদায় করছে। তবে এখনও পর্যন্ত তাদের চেষ্টা সফল হয়নি। ভারতের বরাবরের অবস্থান হল, জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখ নিয়ে মধ্যস্থতার প্রশ্নই নেই৷ পাকিস্তান যে কাশ্মীরের কয়েক হাজার কিলোমিটার এলাকা দখল করে রেখেছে সেটা তাদের খালি করতে হবে। আর পাকিস্তান চাইলেও মধ্যস্থতা হবে না। কারণ, ভারত রাজি হবে না৷ ফলে ওদের প্রচেষ্টা নিষ্ফলাই থেকে যাবে।''
জিএইচ/এসজি (পিটিআই, এনডিটিভি)
গত আগস্টের ছবিঘরটি দেখুন...
স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কে যেন গলার ফাঁস হয়ে রয়েছে কাশ্মীর৷ তাই কাশ্মীর সংক্রান্ত ঘটনাবলী আজ নিজেরাই ইতিহাস৷
ছবি: Getty Images/AFP/R. Bhatবলা হয় দেশবিভাগের পর পাকিস্তান থেকে আগত উপজাতিক যোদ্ধারা কাশ্মীর আক্রমণ করে৷ তখন কাশ্মীরের মহারাজা ভারতের সাথে সংযোজনের চুক্তি করেন, যা থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়৷
ছবি: dapdভারত জাতিসংঘে কাশ্মীর প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে পর, ৪৭ ক্রমিক সংখ্যক প্রস্তাবটি গৃহীত হয়৷ ঐ প্রস্তাব অনুযায়ী গোটা কাশ্মীরে গণভোট অনুষ্ঠিত হবার কথা রয়েছে৷
ছবি: Keystone/Getty Imagesকিন্তু পাকিস্তান প্রস্তাব অনুযায়ী, কাশ্মীর থেকে সৈন্যাপসারণ করতে অস্বীকার করে৷ অতঃপর কাশ্মীরকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়৷
ছবি: Getty Imagesভারতীয় কাশ্মীরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ও ভারতের সঙ্গে সংযোজনকে সমর্থন করা হয়৷ অতঃপর ভারত বলে, আর গণভোট অনুষ্ঠানের কোনো প্রয়োজন নেই৷ জাতিসংঘ ও পাকিস্তানের মতে, গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক৷
ছবি: picture-alliance/dpa/F. Khanকাশ্মীরের ‘প্রধানমন্ত্রী’ শেখ আব্দুল্লাহ গণভোটের সমর্থক ছিলেন ও ভারতের সঙ্গে সংযোজনকে বিলম্বিত করার চেষ্টা করেন৷ ফলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ জম্মু-কাশ্মীরের নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের সংযোজনকে পাকা করেন৷
ছবি: picture-alliance/dpa/F. Khan১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীন আকসাই দখল করে৷ তার আগের বছর পাকিস্তান কাশ্মীরের ট্রান্স কারাকোরাম ট্র্যাক্ট এলাকাটি চীনকে প্রদান করে৷
ছবি: Getty Imagesকাশ্মীরকে কেন্দ্র করে আবার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়৷ কিন্তু যুদ্ধশেষে উভয় দেশের সেনা তাদের পুরোনো অবস্থানে ফিরে যায়৷
ছবি: picture-alliance/dpa/J. Singhআবার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ৷ যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর সিমলা চুক্তি সম্পাদিত হয় ১৯৭২ সালে৷ যুদ্ধবিরতি রেখাকে লাইন অফ কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণ রেখায় পরিণত করা হয় ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ সমাধান সম্পর্কে ঐকমত্য অর্জিত হয়৷
ছবি: APভারত সিয়াচেন হিমবাহ নিজ নিয়ন্ত্রণে আনার পর পাকিস্তান তা একাধিকবার দখল করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হতে পারেনি৷
ছবি: APজম্মু-কাশ্মীরে বিতর্কিত নির্বাচনের পর রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়৷ ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উগ্রপন্থাকে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ করে, কিন্তু পাকিস্তান সে দোষারোপ চিরকাল অস্বীকার করে এসেছে৷
ছবি: APগওকাদল সেতুর কাছে ভারতীয় সিআরপি রক্ষীবাহিনী কাশ্মীরি বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালালে পর শতাধিক আন্দোলনকারী নিহত হন৷ প্রায় সমস্ত হিন্দু কাশ্মীর উপত্যকা ছেড়ে চলে যান৷ জম্মু-কাশ্মীরে সেনাবাহিনীকে আফসা বা আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়৷
ছবি: AFP/Getty Images/Tauseef Mustafaকাশ্মীর ভ্যালিতে গোটা নব্বই-এর দশক ধরে অশান্তি চলে৷ ১৯৯৯ সালে আবার ভারত-পাকিস্তানের লড়াই হয়, এবার কারগিলে৷
ছবি: picture-alliance/dpaভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলাপ-আলোচনার যাবতীয় প্রচেষ্টা প্রথমে নতুন দিল্লির সংসদ ভবন ও পরে মুম্বই হামলার ফলে ব্যর্থ হয়৷
ছবি: picture-alliance/Pacific Press/F. Khanভারতীয় সেনার গুলি লেগে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর পর কাশ্মীর ভ্যালি উত্তেজনায় ফেটে পড়ে৷ বিক্ষোভ চলে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে, প্রাণ হারান অন্তত ১০০ জন৷
ছবি: picture-alliance/Pacific Press/U. Asifসংসদ ভবনের উপর হামলার মুখ্য অপরাধী আফজল গুরুকে ফাঁসি দেওয়া হয়৷ এর পর যে বিক্ষোভ চলে, তা-তে দু’জন প্রাণ হারায়৷ এই বছরই ভারত আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীদ্বয় মিলিত হয়ে উত্তেজনা উপশমের কথা বলেন৷
ছবি: Reutersভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ উপস্থিত থাকেন৷ কিন্তু এর পর নতুন দিল্লিতে পাকিস্তানি হাই কমিশনার কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ায় ভারত আলাপ-আলোচনা স্থগিত রাখে৷
ছবি: Reutersআজাদ কাশ্মীর ভিত্তিক হিজবুল মুজাহিদীন-এর অধিনায়ক বুরহান ওয়ানি-র মৃত্যুর পর কাশ্মীরে স্বাধীনতা সমর্থকরা আবার পথে নেমেছেন৷ এই আন্দোলনে এ পর্যন্ত অন্তত ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে ও বিক্ষোভ অব্যাহত আছে৷
ছবি: picture-alliance/dpa/R.S.Hussain২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামা সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ)-এর গাড়িবহরে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে৷ এতে ৪২ জওয়ান নিহত হন৷ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন জৈশ-ই-মোহাম্মদ হামলার দায় স্বীকার করেছে৷ এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সীমান্তের ভেতরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায় ভারতীয় বিমান বাহিনী৷
ছবি: picture-alliance/ZUMA Wire/P. Kumar Vermaভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নং ধারা অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীরের কাছে কিছু বিশেষ অধিকার ছিল। ৫ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ৩৭০ ধারাটি অবসানের দাবি তোলেন৷ বিল পাস হয়। একই দিনে তাতে সই করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ৷ ফলে, কাশ্মীরের ‘বিশেষ মর্যাদা' বাতিল হয়। তাছাড়া মোদী সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের মর্যাদা হারায়। জম্মু ও কাশ্মীর ও লাদাখ নামে দুইটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠিত হয়।
ছবি: Reuters