গাজা নিয়ে বিতর্কে জর্জরিত বার্লিনালে
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
এর প্রতিবাদে অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যান জার্মানির পরিবেশমন্ত্রী কার্স্টেন স্নাইডার৷
বার্লিনালেতে গাজা নিয়ে বিতর্কের রেশ এখনো কাটেনি৷ বিশেষ করে উৎসবের জুরি সভাপতি ভিম ভেন্ডার্সের এক মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে আলোচনা, সমালোচনার ঝড়৷ চলছে সমর্থন, প্রতিবাদ, প্রত্যাখ্যান বর্জনের হিড়িক৷ ভেন্ডার্স বলেছিলেন, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ‘‘রাজনীতি থেকে দূরে থাকা উচিত’’৷ তার এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অনেকেই বলছেন, এবারের আসরে শীর্ষ পুরস্কার জয়ের জন্য নির্বাচিত ইলকার কাটাক-এর ‘ইয়েলো লেটার্স’ এবং এমিন আলপার-এর ‘স্যালভেশন’ নামের চলচ্চিত্র দুটোও তো জানান দিচ্ছে ইউরোপের তিন বৃহৎ চলচ্চিত্র উৎসবের মধ্যে বার্লিনালে এখনো সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক৷
ইউরোপের অন্য দুটি বড় চলচ্চিত্র উৎসব হয় ফ্রান্সের কান এবং ইটালির ভেনিসে৷
২০২৬ সালের বার্লিনালেকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রাখতে এক ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের কথাও উঠে এসেছে এক খোলা চিঠিতে৷ অবশ্য তা সত্ত্বেও ১০ দিনের এ আসরের অনেক পুরস্কারজয়ীই পুরস্কার জয়ের অনুভূতি জানানোর সময় এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন৷
ফিলিস্তিনি পরিচালকের মন্তব্য এবং প্রতিক্রিয়া
‘ক্রনিকলস ফ্রম দ্য সিজ’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা প্রথম চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছেন সিরীয়-ফিলিস্তিনি পরিচালক আবদাল্লাহ আলখাতিব৷ পুরস্কার গ্রহণের পর তিনি বলেন, জার্মানিতে শরণার্থী হিসেবে আছেন এমন মানুষেরা তাকে বক্তৃতার সময় ‘বিপদসীমা’ (রেড লাইন) অতিক্রম করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন৷ এমন কথা উল্লেখ করে তিনি জানতে চান, কেন জার্মানি ‘‘গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার অংশীদার’’ হতে রাজি হয়েছে? তিনি আরো বলেন, ‘‘আমার বিশ্বাস আপনি বিষয়টি স্বীকার করার জন্য যথেষ্ট বুদ্ধিমান, কিন্তু আপনি পরোয়া না করার পথ বেছে নিয়েছেন৷’’
জার্মান সরকারের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তখন বার্লিনের এই চলচ্চিত্র উৎসবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশমন্ত্রী কার্স্টেন স্নাইডার৷ আলখাতিবের বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যান৷ পরে সিরীয়-ফিলিস্তিনি পরিচালকের বক্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি৷
জার্মানির সংস্কৃতি বিষয়ক কমিশনার ভলফ্রাম ভাইমারও গাজা এবং ইসরায়েল সম্পর্কে জার্মানির অবস্থান নিয়ে করা মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘‘এই মিথ্যা দাবিগুলো বিদ্বেষপূর্ণ এবং এসব রাজনৈতিক বিতর্ককে বিষাক্ত করে তোলে৷ এগুলো বার্লিনালেতে প্রদর্শিত চলচ্চিত্র শিল্পের মর্যাদা নষ্ট করে৷’’ জার্মানির সংবাদপত্র টাগেসস্পিগেলকে এ কথা বলেন তিনি৷
প্রসঙ্গত, ইসরায়েলের অন্যতম সমর্থকই শুধু নয়, ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী দেশও জার্মানি৷ বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করে, জার্মানির এ অবস্থানের মূলে রয়েছে নাৎসি হলোকস্টের ঐতিহাসিক অপরাধবোধ – জার্মানির এই নীতি ‘স্টাটসরাইজন’ বা ‘রাষ্ট্রের যুক্তি’ নামে পরিচিত৷
মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের তদন্ত বলছে, গাজায় ইসরায়েলের হামলায় যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে তা গণহত্যার সমান৷ তবে ইসরায়েল সে অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, পুরো অভিযান ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের চালানো সন্ত্রাসী হামলার আত্মরক্ষামূলক ন্যায্য জবাব৷
গাজা ইস্যুতে দ্বিমুখী চাপ
ইসরায়েলের কর্তৃপক্ষ এবং সে দেশের সাংস্কৃতিক ভাষ্যকাররাও এবারের বার্লিনালের ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করেছেন৷
জার্মানিতে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রন প্রোসর সংবাদমাধ্যম বিল্ড-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জার্মানির পরিবেশমন্ত্রী কার্স্টেন স্নাইডার উৎসব থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় তার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘মন্ত্রী স্নাইডার এবং তার নৈতিক স্পষ্টতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই৷’’ ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত মনে করেন, ‘‘বার্লিনালে ইসরায়েলবিদ্বেষীদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করলে সুনাম নষ্ট করার ঝুঁকিতে পড়বে৷’’
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে টাইমস অফ ইসরায়েল-এর এক ব্লগার লিখেছেন, ‘‘জার্মানির সাংস্কৃতিক অভিজাতরা আগুন নিয়ে খেলছে৷’’
তবে এর বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন অনেকে৷ বিশেষ করে বার্লিনালের জুরি সভাপতি ভিম ভেন্ডার্সের ভাইরাল হওয়া এক ভিডিও বক্তব্যের প্রতিবাদে উৎসব বয়কট করেন ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতী রায়৷ তিনি মনে করেন, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকা উচিত বলা ‘‘মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ নিয়ে আলোচনা বন্ধ করারই এক উপায়৷’’ তার মতে, ‘‘শিল্পী, লেখক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের এটি (মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ) বন্ধ করার জন্য সম্ভব সবকিছুই করা উচিত৷’’
এলিজাবেথ গ্রেনিয়ার/ এসিবি