চাহিদামতো ডিজেল না পেলে ধানের শীষ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা
২ এপ্রিল ২০২৬
পাম্পে গিয়ে চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন চুয়াডাঙ্গার চাষি রফিকুল ইসলাম৷ মৌসুমের এই সময়টায় ধানের শীষ বের হয় জানিয়ে তিনি আশঙ্কা করছেন, পানি না দিলে সব নষ্ট হয়ে যাবে৷
বুধবার ডয়চে ভেলেকে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘পাম্পে গেলে এক থেকে দুই লিটার তেল দেয়৷ তিন বিঘা জমিতে সেচ দিতে গেলে এটা দিয়ে কিছুই হয় না৷ তেল পেতে লাইন ধরতে হয়৷ চাহিদামতো পাওয়া যায় না৷ এ সময় ধান ও ভুট্টায় বেশি পানি লাগে৷ তেল না পেলে কীভাবে সেচ দেব? আগে ১০৫-১১০ টাকায় তেল পেতাম, এখন ১২০-১৩০ টাকা দিয়েও পাই না৷ এই সময় ধানের শীষ বের হয়৷ পানি না দিলে সব নষ্ট হয়ে যাবে৷ সামনে ঝড়বৃষ্টি, সময়মতো ফসল তুলতে না পারলে বড় ক্ষতি হবে৷''
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানান, ‘‘কোথাও তেলের সমস্যা নেই৷ ভবিষ্যতে তেল পাওয়া যাবে কী না কৃষকের মধ্যে এমন আতঙ্ক কাজ করছে৷ তাই পাম্পগুলোতে ভিড় করছে৷ তবে তেলের অভাবে দেশের কোনো জমিতে সেচ দেওয়া যায়নি এমন নজির এখনও আমরা পাইনি৷''
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘... এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে৷ উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে৷ চালের বাজারেও এর প্রভাব পড়বে৷''
বাংলাদেশে এখন বোরো ধানের ভরা মৌসুম চলছে৷ চৈত্রের তপ্ত রোদে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে ধানক্ষেত৷ কৃষিবিদরা বলছেন, এখন ধানের থোড় বের হওয়ার সময়, ফলে ক্ষেতে পানি ধরে রাখতে হবে৷ পানির স্বল্পতা হলেও ধানে চিটা হয়ে যেতে পারে৷ কিন্তু পানি দিতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়ছেন কৃষক৷ পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত ডিজেল৷ ফলে অনেক জায়গায় শুকিয়ে যাচ্ছে ধানক্ষেত৷ এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা৷ শুধু ধানের ক্ষেত্রে নয়, অন্য ফসলের ক্ষেত্রে একই অবস্থা৷জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘ধানের জমিতে সেচ দেওয়ার সঙ্গে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয় জড়িত৷ ধানে যদি চিটা হয়ে যায় তাহলে ফলন কমে যাবে৷ এতে ধানের উৎপাদন কমে যেতে পারে৷ সরকারের দায়িত্ব হবে, কৃষকদের কাছে পর্যাপ্ত ডিজেলের ব্যবস্থা করা৷ এর যে সরবরাহ চেইন সেটা নিশ্চিত করতে হবে৷ সরকার যদি এক্ষেত্রে শৈথিল্য দেখায় কিছুদিন পর এর ফল ভোগ করতে হবে৷ চাল যদি আমদানি করতে হয় তাহলে আমাদের জন্য বিপদ বাড়বে৷ এটা সরকারকে বুঝতে হবে৷''
শরীয়তপুরের জাজিরার কৃষক জলিল মন্ডল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমি ২৫ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছি৷ আমার প্রতিদিন অন্তত ১২ ঘণ্টা সেচ দেওয়া প্রয়োজন৷ ১২ ঘণ্টা সেচ দিতে প্রতিদিন ১২ লিটার ডিজেল প্রয়োজন৷ কিন্তু কৃষি কর্মকর্তাদের সুপারিশ নিয়ে নানাদিকে দৌড়ে সর্বোচ্চ চার লিটার ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছি৷ এতে ৪ ঘণ্টা সেচ দেওয়া যাচ্ছে৷ এমন পরিস্থিতিতে কী করব বুঝতে পারছি না৷ এখন যদি ধানে ঠিকমতো পানি দিতে না পারি তাহলে চিটা বেশি হয়ে যাবে, ফলন অনেক কমে যাবে৷''
কতটুকু ডিজেল আছে, কত আসতে পারে
বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানির কাজটি করে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)৷ সংস্থাটি বলছে, গত রোববার ২৯ মার্চ সরবরাহ শেষে ডিজেলের মজুত আছে ১ লাখ ৩৩ হাজার টন৷ বর্তমান চাহিদার বিবেচনায় এটি ১০ দিনের মজুত৷ এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন৷ যদিও আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ৯৫ হাজার টন ডিজেল আসতে পারে৷
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নির্ধারিত সময়ে জ্বালানি তেল আসছে না৷ মার্চে জ্বালানি তেল নিয়ে মোট ১৬টি জাহাজ আসার কথা৷ এর মধ্যে এসেছে ১০টি৷ বাকি ৬টি ডিজেলের জাহাজ এখন পর্যন্ত সময়সূচিও নিশ্চিত করেনি৷ এসব জাহাজে ১ লাখ ৫৫ হাজার টন ডিজেল আসার কথা ছিল৷
দেশে দুই ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়৷ পরিশোধিত জ্বালানি হিসেবে ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস তেল ও জেট ফুয়েল কেনা হয় বিভিন্ন দেশ থেকে৷
আর অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনা হয় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে৷ এসব তেল দেশের একমাত্র সরকারি পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) শোধন করে ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পাওয়া যায়৷
ইআরএল থেকে মাসে গড়ে ৬০ হাজার টন ডিজেল পাওয়া যায়৷ তবে যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি আসা বন্ধ রয়েছে৷ বর্তমানে ইআরএলে ব্যবহারযোগ্য মজুত আছে ২৬ হাজার টন, যা দিয়ে ৬ থেকে ৭ দিন উৎপাদন করা যাবে৷
জ্বালানি তেলের পরিস্থিতি নিয়ে দুই দিন আগে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু৷ তিনি বলেন, এ পর্যন্ত জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই৷ গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে৷ প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতায় কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি হয়েছে৷
মঙ্গলবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষে যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘‘৩ এপ্রিল ৩০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে৷ এর মধ্যে ভারত থেকে ৭ হাজার টন ডিজেল যুক্ত হচ্ছে পাইপলাইনে৷ দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া যাবে ১১ হাজার টন৷ এ মাসে চীন, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে আরও প্রায় দেড় লাখ টন ডিজেল যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে৷ এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে শিগগিরই ৬০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে দুটি জাহাজ আসবে৷ ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানি করতে ইতিমধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে৷''
জ্বালানি বিভাগ বলছে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার৷ সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার পাশাপাশি নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে অপরিশোধিত বা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে৷ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য শিথিল করায় আগামী দুই মাসে রাশিয়া থেকে ৬ লাখ টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷
কৃষিতে কত ডিজেল প্রয়োজন?
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প আছে৷ এসবের বড় অংশই ডিজেলচালিত৷ বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও হাওর এলাকায় ডিজেল ছাড়া সেচ প্রায় অসম্ভব৷ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রবি মৌসুমে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচনির্ভর ফসলের চাষ হয়৷ চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর৷ এর মধ্যে ৮ মার্চ পর্যন্ত ৪৮ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে৷ শুধু রংপুর অঞ্চলেই পাঁচ লাখ ৯ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে, যার ৩৫-৪০ শতাংশ পুরোপুরি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল৷
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে৷ উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে৷ চালের বাজারেও এর প্রভাব পড়বে৷ কৃষির জন্য আলাদা ডিজেল বরাদ্দ, ড্রাম ব্যবহারকারীদের জন্য তেল বিক্রির স্পষ্ট নির্দেশনা, মাঠ পর্যায়ে কঠোর নজরদারি, ডিজেলে ভর্তুকি ও বিদ্যুৎচালিত সেচ সম্প্রসারণ করতে হবে৷ অন্তত কৃষিতে যতটুক ডিজেল প্রয়োজন সেটা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে৷ কোনোভাবেই কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত করা চলবে না৷''
কৃষিমন্ত্রীকে ফোনের পরও মেলেনি ডিজেল?
একজন কৃষক সরাসরি কৃষিমন্ত্রীকে ফোন করে প্রতিকার চাইলেও মাঠ পর্যায়ে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি৷ প্লাস্টিকের জার বা ড্রামে তেল বিক্রিতে পাম্প মালিকদের অনীহার কারণে রবিশস্য মাড়াই, সেচ এবং হারভেস্টার মেশিনগুলো অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে৷
গত রোববার ঈশ্বরদীর এক দল ভুক্তভোগী কৃষক উপজেলা কৃষি অফিসে গিয়ে তাদের সমস্যার কথা জানান৷ এ সময় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ সরাসরি কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদের মোবাইলে কল করেন৷ মন্ত্রী তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানে কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মোমিনকে নির্দেশ দেন৷ কিন্তু বুধবার বিকেল পর্যন্ত সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি৷ ফলে গম, মসুর, খেসারিসহ রবি মৌসুমের ফসল মাড়াই এবং জমি চাষের কাজ বন্ধ৷
কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি অফিস থেকে ‘কৃষক শনাক্তকরণ কার্ড' ইস্যু করা হলেও পাম্প মালিকরা তা মানছেন না৷ কৃষি অফিসার ইউএনওকে চিঠি দিয়েছেন, যা জেলা প্রশাসকের অনুমতির অপেক্ষায়৷ কৃষকদের প্রশ্ন, এই ‘চিঠি চালাচালি' শেষ হতে হতে মাঠের ফসল কি নষ্ট হয়ে যাবে?
তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন বলেন, ‘‘মন্ত্রী বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ‘ম্যানেজ' করতে বলেছেন৷ কিছু কৃষক কার্ড জালিয়াতি করে তেল নিয়েছেন বলে অভিযোগ পেয়েছি৷ পাম্প মালিকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে৷ আশা করছি, দ্রুতই সবাই তেল পাবেন৷''
ডিজেল সংকটে কর্মহীন লাখো জেলে
শুধু ফসল নয়, ডিজেল সংকটের কারণে জেলেরাও নদীতে যেতে পারছেন না৷ শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর এলাকার জেলে রণজিৎ চন্দ্র দাস সাত দিন ধরে নৌকা ঘাটে বেঁধে বসে আছেন৷ নদী আছে, জাল আছে, ইঞ্জিনও আছে; কিন্তু নেই ডিজেল৷ এই অভাবই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে৷
নিজের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে রণজিৎ বলেন, ‘‘নদীতীরের হাটবাজারে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না৷ কেউ কেউ বাধ্য হয়ে লিটারপ্রতি ৬০-৭০ টাকা বেশি দামে কিনে নদীতে যাচ্ছে৷ কিন্তু সেই খরচ তোলা সম্ভব না৷''
জেলে ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইতোমধ্যে নদনদীতে মাছ আহরণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে৷ এর প্রভাব পড়েছে উপকূলীয় মৎস্যবন্দর ও মোকামগুলোতে৷ অনেক জায়গায় কার্যক্রম প্রায় স্থবির৷ ফলে শুধু জেলে নয়; আড়তদার, পাইকার, শ্রমিক, বরফকল মালিক, পরিবহনকর্মীসহ পুরো মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতি চাপে পড়েছে৷ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের কর্মসংস্থান এখন ঝুঁকির মুখে৷
এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হচ্ছে টানা ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা৷ এর লক্ষ্য মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও প্রজনন নিশ্চিত করা৷ জেলেরা বলছেন, জ্বালানি সংকটে কাজ বন্ধ, তার ওপর দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা; সব মিলিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায়৷
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ তিন হাজার৷ তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি৷ পরিবারসহ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখেরও বেশি৷ প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার নদী ও সাগরে যায়৷
ছোট নৌকায় দৈনিক ৫-২০ লিটার, মাঝারি নৌকায় ২০-৫০ লিটার এবং বড় ট্রলারে প্রতিদিন ১০০-৩০০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল লাগে৷ সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২৫ লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়৷
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশন জানায়, দেশে ২১৫টি শিল্প ট্রলার রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৮০টি নিয়মিত সাগরে মাছ ধরে৷ এসব ট্রলারকে একটানা ২২ থেকে ২৫ দিন সাগরে থাকতে হয়৷ কিন্তু জ্বালানি সংকটে এখন অনেক ট্রলারই ঘাটে পড়ে আছে৷
অসময়ের বৃষ্টি কৃষকের মাথায় হাত
চলতি বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ৯৫টি হাওরের দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে৷ ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা৷ তবে সেই ধান ঘরে তুলতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওরের ১০ লাখ কৃষক৷ গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে৷ ধারদেনা করে দেখার হাওরে ৩৫ কিয়ার জমিতে বোরো ধান রোপণ করেছিলেন কৃষক মুহিবুর রহমান৷ কিন্তু সেই ধান ঘরে তোলার আগেই কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পানিতে তলিয়ে যায়৷
শুধু দেখার হাওর নয়, কানলার হাওর, করচার হাওর, শান্তিগঞ্জের খাই হাওর, পাখিমারা হাওর, শাল্লার ছায়ার হাওর, জামালগঞ্জের হালির হাওর, পাগনার হাওর, তাহিরপুরের শনির হাওর, মাটিয়ান হাওরসহ জেলার বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে৷ এতে এসব হাওরের বেশিরভাগ কৃষকের কাঁচা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে৷
কৃষি বিভাগ বলছে, মাত্র এক হাজার ১০০ হেক্টর জমি ডুবেছে৷ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘‘অন্য বছর থেকে এবছর কয়েকদিনেই ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে৷ পাশাপাশি সিলেটে বৃষ্টি হচ্ছে, নদীর পানিও বাড়ছে৷ এরইমধ্যে হাওরে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ১১০০ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে৷''
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘অসময়ের এই বৃষ্টিতে কিছু উপকার হয়েছে, আবার ক্ষতিও হয়েছে৷ এই বৃষ্টি বোরো চাষীদের উপকার করেছে৷ তাদের সেচ কম লাগছে৷ কিন্তু হাওর এলাকা ডুবে গেছে৷ যেখানে ধানের থোড় আসার কথা৷ অন্যদিকে যেসব কৃষক ক্ষেত থেকে আলু আর পেঁয়াজ তুলতে পারেননি তাদেরগুলো পচে যাচ্ছে৷ এগুলো হিমাগারেও রাখা যাচ্ছে না৷ ফলে এই বৃষ্টি উপকার, ক্ষতি দুইই করছে৷''