জানুয়ারিতে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ২৫ শতাংশ
২৬ মার্চ ২০২৬
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোয় তৈরি পোশাক রপ্তানি গত জানুয়ারিতে প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে৷ বাংলাদেশের পাশাপাশি এ সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর রপ্তানিও বিভিন্ন হারে কমেছে৷
বাংলাদেশ ইইউর বাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ৷ জানুয়ারিতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১৪৩ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক৷ এ রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ কম৷ছবি: Joy Saha/ZUMA Press Wire/picture alliance
বিজ্ঞাপন
ইউরোস্ট্যাটসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইইউভুক্ত দেশগুলো চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিভিন্ন দেশ থেকে ৭০৩ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে৷ এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে ১৫ শতাংশ কম৷ যদিও পরিমাণের দিক থেকে তৈরি পোশাক আমদানি কমেছে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ৷ জানুয়ারিতে ৩৮ কোটি কেজির সমপরিমাণ তৈরি পোশাক আমদানি করে ইইউভুক্ত দেশগুলো৷ তার বিপরীতে গত বছরের জানুয়ারিতে আমদানি করেছিল ৪১ কোটি কেজির সমপরিমাণ তৈরি পোশাক৷
ইইউর দেশগুলোয় তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীন বরাবরের মতো শীর্ষস্থানে রয়েছে৷ জানুয়ারিতে এই অঞ্চলে ২২২ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করে চীন৷ এ রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ কম৷ জানুয়ারিতে চীনের প্রতি কেজি পোশাকের দাম কমেছে ৮ শতাংশ৷
বাংলাদেশ ইইউর বাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ৷ জানুয়ারিতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১৪৩ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক৷ এ রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ কম৷ গত বছরের জানুয়ারিতে রপ্তানি হয়েছিল ১৯১ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক৷ পরিমাণের দিক থেকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে সাড়ে ১৭ শতাংশ৷ সেই হিসাবে জানুয়ারিতে রপ্তানি করা তৈরি পোশাকের দাম কমেছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ৷
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের হালহকিকত
বিজিএমইএ-এর দাবি গত ১৪ মাসে বাংলাদেশে সাড়ে ৩শ’র বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে, বেকার হয়েছেন সোয়া লাখ শ্রমিক৷ এই শিল্পের হালহকিকত নিয়ে কথা বলেছেন সংশ্লিষ্টরা৷
ছবি: Joy Saha/ZUMA Press Wire/picture alliance
কষ্ট করে সংসার চালিয়েছি: রুবিনা খাতুন, অপারেটর, গার্মেন্টস কর্মী
আগে যে ফ্যাক্টরিতে চাকরি করতাম সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। চার মাস ধরে বেকার ছিলাম। আমাদের তো খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে। কোথায় যাবো? কোনো অফিসে কাজ দিচ্ছিলো না৷ খুব কষ্ট করে পরিবার চালিয়েছি৷ এখন কয়েকদিন হলো একটা চাকরি পেয়েছি৷ যে বেতন পাই তা দিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চলে৷ স্বামীরও কোনো কাজ নেই। চাকরির জন্য সকালে বের হয়, কিন্তু হতাশ হয়ে প্রতিদিনই তিনি ফিরে আসছেন।
ছবি: privat
আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই: মালিহা আক্তার, গার্মেন্টস কর্মী
৯ বছর গার্মেন্টসে চাকরি করি৷ যে বেতন পাই তা দিয়েই সংসার চলে৷ বাবা নেই, মা আর ছোট দুই ভাই৷ তারা স্কুলে পড়ে৷ ওদের স্কুলের খরচ দিয়ে সংসার চলানো কঠিন হয়ে গেছে৷ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষন ব্যক্তি আমি৷ ফলে মাস শেষে সবাই আমার দিকেই তাকিয়ে থাকে৷ বেতন তো খুব বেশি বাড়ে না৷ কিন্তু জিনিসপত্রের দাম তো প্রতিদিনই বাড়ছে৷ কিভাবে বাড়ি ভাড়া দেবো, কী খাবো? আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই৷
ছবি: privat
নতুন করে বিনিয়োগ হচ্ছে না : রাশেদুল করিম মুন্না, রপ্তানিকারক
বিনিয়োগে একটা স্থবিরতা চলছে৷ নতুন করে কেউ বিনিয়োগ করছেন না। সবাই আসলে নির্বাচিত সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন৷ সবাই তার বিনিয়োগের নিশ্চয়তা চান৷ ফলে নতুন করে কারখানা হচ্ছে না৷ এখন ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে আমরা আশা করছি৷ আর নির্বাচন না হলে ব্যবসা-বানিজ্যে আরো বেশি ঝুঁকি তৈরী হবে৷ ফলে ব্যবসা কোন দিকে যাবে সেটা এখনই ধারণা করা কঠিন৷
ছবি: privat
৪ শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে : জলি তালুকদার, অধিকারকর্মী
বর্তমান সরকারের আমলে দুই থেকে তিন লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন৷ এই সরকারের সময়েও চারজন শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, যা কোনভাবেই প্রত্যাশিত না৷ বরং এই সরকারের সময় আমরা দেখেছি, বেতন ভাতার আন্দোলনে যাওয়া শ্রমিককে গুলি করা হয়েছে৷ কোনো সুযোগ সুবিধা তো বাড়েইনি, দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে শ্রমিকদের অবস্থা৷ শ্রমিকদের জীবনমানের অবনতি ঘটছে৷
ছবি: privat
টিকতে পারবো কিনা জানি না: আরশেদ আলী রাজু, উদ্যোক্তা
আমার ছোট একটা কারখানা আছে৷ যেখানে আগে শ’দুয়েক শ্রমিক কাজ করতেন৷ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিছু শ্রমিক বাদ দিয়ে ৫০-৬০ জনের মতো রেখেছি৷ এখন আমরা দেশের বাজারের জন্য কিছু পণ্য তৈরী করছি৷ বিদেশে রপ্তানির কোনো কাজ আমরা করছি না৷ মূলত টিকে থাকার জন্য লড়াই করছি৷ শেষ পর্যন্ত টিকতে পারবো কিনা জানি না।
ছবি: privat
শ্রম আইন সংশোধন
সংশোধিত শ্রম আইন অনুযায়ী, ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা যাবে৷ একটি কারখানায় ৫টি ট্রেড ইউনিয়ন থাকতে পারবে৷ শ্রমিকেরা এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও মালিকেরা বলছেন, এটি অন্তর্দ্বন্দ্ব ও শিল্পে অস্তিতিশীলতা তৈরি করবে৷ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে মোট শ্রমিকের ১০ শতাংশ বা নূন্যতম ১০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ইউনিয়ন গঠনের বিধান রয়েছে, পাকিস্তানে যা ২০ শতাংশ।
ছবি: privat
৩৫৩ কারখানা বন্ধ, বেকার সোয়া লাখ শ্রমিক
বিজিএমইএর হিসাবে গত ১৪ মাসে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে মোট ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়েছে৷ যার ফলে এক লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন৷ সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে সাভারে, যেখানে ২১৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছে৷ প্রায় ৩১ হাজার শ্রমিক এখানে কাজ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ছেইন ইন অ্যাপারেলস, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন ও সাফওয়ান আউটারওয়্যারের মতো বড় কারখানাও রয়েছে৷
ছবি: privat
শ্রমিকদের ভাগ্যের উন্নতি হচ্ছে না : কল্পনা আখতার, অধিকারকর্মী
জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে তো শ্রমিকরাও অংশ নিয়েছিলেন৷ বৈষম্য নিরসনের যে দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল, সেটা নিরসন হয়নি৷ উল্টো কাজ হারিয়ে শ্রমিকরা বেকার হয়ে যাচ্ছেন৷ শ্রমিকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হচ্ছে না৷ শ্রমিকরা যে কাতারে ছিলেন সেই কাতারেই রয়ে গেছেন৷ যারা বেকার হয়েছেন তাদের সংসার কোনভাবেই চলছে না৷ নতুন কিছু গার্মেন্টস হলেও সেখানে তো সবার কর্মসংস্থান হচ্ছে না৷
ছবি: DW/R. Nandy
গার্মেন্টসের ভবিষ্যতের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ আইএমএফের
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ)-এর একটি প্রতিনিধিদল গত মে মাসে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পোশাক খাতের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল৷ বৈঠকে বৈশ্বিক অস্থিরতা সত্ত্বেও শিল্পের প্রবৃদ্ধির কৌশলগত উপায় নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়৷
ছবি: privat
রপ্তানি সূচক ভিন্ন কথা বলছে : ড. গোলাম মোয়াজ্জেম, অর্থনীতিবিদ
গার্মেন্টস মালিকরা যা বলছেন তার সঙ্গে কিন্তু রপ্তানি সূচক মিলছে না৷ মালিকরা বলছেন, গার্মেন্টস বন্ধ হচ্ছে, অর্ডার নেই, শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন৷ কিন্তু আমাদের রপ্তানি সূচক দুই অংকের ঘরেই রয়েছে৷ শুধুমাত্র গত মাসে এক অংকে নেমেছে৷ অর্থাৎ, আমাদের রপ্তানি আগের মতোই রয়েছে৷ হতে পারে বড় কারখানাগুলো থেকে রপ্তানি বেশি হচ্ছে, ছোট কারখানাগুলো হয়ত ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে৷ আসলে নির্বাচিত সরকার ছাড়া সঠিক বিনিয়োগ হয় না৷
ছবি: Samir Kumar Dey/DW
যেকোন সময় বেকার হতে পারি : রাজু ইসলাম
আমাদের ফ্যাক্টরিতে আগে আমার অধিনে প্রিন্স শাখায় ২৫-৩০ জন কাজ করতেন৷ এখন কারখানা ছোট হতে হতে ৫-৬ জনে এসে ঠেকেছে৷ মালিক বেতন দিচ্ছেন, কিন্তু আমরাও বুঝতে পারছি, বেতন দিতে কষ্ট হচ্ছে৷ অর্ডার একেবারেই নেই৷ এভাবে চলতে থাকলে যে কোন সময় বেকার হয়ে যেতে পারি৷ একবার বেকার হয়ে গেলে পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে৷ যে বেতন পাই তা দিয়ে তো সংসার চলে না৷
ছবি: privat
11 ছবি1 | 11
ইইউতে তৃতীয় সর্বোচ্চ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ তুরস্ক৷ এই বাজারে জানুয়ারিতে ৬২ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে তুরস্ক৷ এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ কম৷ অবশ্য দেশটির রপ্তানি করা তৈরি পোশাকের প্রতি কেজির দাম জানুয়ারিতে ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ বেড়েছে৷
ইউরোস্ট্যাস্টের তথ্যানুযায়ী, ইইউতে তৃতীয় ও চতুর্থ শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ যথাক্রমে ভিয়েতনাম ও ভারত৷ জানুয়ারিতে ভিয়েতনাম রপ্তানি করেছে ৩৬ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক৷ এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ শতাংশ কম৷
অন্যদিকে ভারত জানুয়ারিতে ৩৪ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে৷ এই রপ্তানি গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় ১৫ শতাংশ কম৷ চলতি বছরের প্রথম মাসে ভিয়েতনাম ও ভারতের প্রতি কেজি তৈরি পোশাকের দাম যথাক্রমে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ ও ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়েছে৷