২০২৪ সালে নাগরিকত্ব আইন শিথিল হওয়ার পর থেকেই জার্মানিতে বাড়ছে নাগরিকত্বের আবেদন৷ ২০২৫ সালে এই সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে৷
২০২৪ সালের মাঝামাঝি জার্মানি নাগরিকত্ব আইনে বড় পরিবর্তন আনে৷ছবি: Abed Rahim Khatib/dpa/picture alliance
বিজ্ঞাপন
২০২৫ সালে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ জার্মান নাগরিকত্ব পেয়েছেন৷ জার্মানির সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ভেল্ট আম জনটাগ' জানিয়েছে, গত বছর কমপক্ষে তিন লাখ নয় হাজার ৮৫২ জন জার্মান পাসপোর্ট পেয়েছেন৷ ২০২৪ সালে পেয়েছিলেন দুইলাখ ৯১ হাজার ৯৫৫ জন৷
২০২৪ সালের মাঝামাঝি জার্মানি নাগরিকত্ব আইনে বড় পরিবর্তন আনে৷ এর আগে জার্মান নাগরিকত্ব পেতে হলে অন্য দেশের নাগরিকত্ব ছেড়ে দিতে হতো এবং কমপক্ষে আট বছর জার্মানিতে বসবাস করতে হতো৷ নতুন আইনে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়া হয় এবং বাসস্থানের ন্যূনতম মেয়াদ পাঁচ বছরে নামিয়ে আনা হয়৷ এরপর থেকেই নাগরিকত্বের আবেদন দ্রুত বাড়তে শুরু করে৷ ২০২৪ সালে নাগরিকত্ব পাওয়ার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল৷ ২০২৫ সালে সেই বৃদ্ধির হার কিছুটা কমে ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে৷
২০২৪ সালে যারা নাগরিকত্ব পেয়েছেন তাদের মধ্যে ২৮ শতাংশ ছিলেন সিরিয়ার নাগরিক৷ এরপরের স্থানে ছিলেন তুরস্কের নাগরিকরা৷ তবে এই পরিসংখ্যান জার্মানির ১৬টি রাজ্যের মধ্যে ১৪টির৷ পূর্বাঞ্চলের রাজ্য মেকলেনবুর্গ-ফোরপমার্ন এবং সাকসেন-আনহাল্টের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি৷ কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পত্রিকাটি৷
বাংলাদেশের পাসপোর্টে এখন অনেক দেশই ভিসা দিচ্ছে না। নেতিবাচক ভাবমূর্তি, জঙ্গিবাদ, ভারতে ভিসা ‘বন্ধ’, অবৈধ অভিবাসনসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে ভিসা না পাওয়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনা থাকছে ছবিঘরে৷
ছবি: Faisal Ahmed/DW
ওরা ভাবছে আমরা পালাতে চাচ্ছি : মো. মারুফ হাসান, আর্কিটেক্ট
ক্যানাডা ও তুরস্কে পৃথকভাবে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করেছিলাম। দুই জায়গা থেকেই ভিসা দেয়নি। আমার মনে হয়েছে, সবাই মনে করছে, আমরা পালাতে চাচ্ছি। ভাবছে, আমরা একবার গেলে আর দেশে ফিরবো না। তা না হলে আমি বাংলাদেশের একজন নামকরা আর্কিটেক্ট, আমি ৬০ লাখ টাকার ব্যাংক ব্যালান্স দেখানোর পরও তারা বলছে, আমার টাকা নাকি অপর্যাপ্ত। এটা আসলে ভিসা না দেওয়ার একটা অজুহাত মাত্র।
ছবি: Private
এখানে জঙ্গিবাদীদের বিস্তার শুরু হয়েছে - এমন বদনাম ছড়িয়ে পড়েছে : মুন্সি ফয়েজ আহমেদ, সাবেক কূটনীতিক
আমাদের দেশে তো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা আছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত যখন ভিসা বন্ধ করে দেয়, তখন সারা বিশ্বেই একটা খারাপ বার্তা যায়। অনেকেই মনে করে, প্রতিবেশীরা যখন ভিসা বন্ধ করেছে, ফলে এর ভেতরে নিশ্চয়ই খারাপ কিছু আছে। এই কারণে অনেকেই আমাদের ভিসার ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থান নিচ্ছে। পাশাপাশি আমাদের বদনাম ছড়িয়ে পড়েছে এখানে জঙ্গিবাদীদের বিস্তার শুরু হয়েছে। এটা নিয়ে বিভিন্ন দেশ চিন্তা করছে।
ছবি: privat
কাজের সুবাদে যুক্তরাষ্ট্রের টিকিট পেলেও ভিসা পাইনি : আজমাইন আশরাফ, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা
এমিরেটস এয়ারলাইন্সে চাকরি করার কারণে প্রতি বছরই আমি পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করার জন্য ফ্রি টিকিট পাই। এবার কর্তৃপক্ষ আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের টিকিট দিয়েছিল। সেই কারণে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে ভিসার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু তারা ভিসা দেয়নি। আমি কিন্তু বহু দেশ ভ্রমণ করেছি। সেই বিষয়টাও তারা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। যেদিন আমার পাসপোর্ট ফেরত দিয়েছে সেদিন কাউকেই ওরা ভিসা দেয়নি। সেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি পরিবার ছিল।
ছবি: Private
৪০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছি, কিন্তু ইংল্যান্ডের ভিসা পাইনি : প্রদীপ চন্দ্র নন্দী, চেয়ারম্যান, স্বর্ণকুটির ডেভেলপার
আমার ছেলে ইংল্যান্ডের স্কুলে পড়ে। কিছু আত্মীয়-স্বজনও আছে লন্ডনে। সে কারণে আমি লন্ডনে যেতে চেয়েছিলাম। দেশে আমার ৫টি প্রতিষ্ঠান আছে। প্রতি বছর আমি ৫ কোটি টাকারও বেশি সরকারকে ট্যাক্স দেই। ব্যাংকে শত শত কোটি টাকার লেনদেন। ৪০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছি আমি। বুঝতে পারছি না কী কারণে তারা আমাকে ভিসা দেয়নি।
ছবি: Private
বাংলাদেশের ব্যাপারে অনেক দেশই নজরদারি বাড়িয়েছে : অজিত কুমার সাহা, সত্বাধিকারী, লেক্সাস ট্যুরস অ্যান্ড ট্র্যাভেলস
দুই কারণে বাংলাদেশি পাসপোর্টে অনেক দেশ ভিসা দিচ্ছে না। প্রথমত, গত বছরের সরকার পরিবর্তনের পর একটা কথা খুব প্রচার পেয়েছে যে, দেশ থেকে ১০-১২ লাখ লোক পালিয়ে যাবে। অনেক দূতাবাস ভাবছে, কেউ গেলে আর ফিরবে না। দ্বিতীয়ত, পাসপোর্টের ভেরিফিকেশন তুলে নেওয়ার কারণে অনেক রোহিঙ্গার হাতে পাসপোর্ট চলে গেছে। ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের ভিসা বন্ধ করে দেওয়ায় অনেক দেশই নজরদারি বাড়িয়েছে।
ছবি: Private
কিছু কারণে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ নিয়ে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে : শরিফুল হাসান, অভিবাসন কর্মকর্তা, ব্র্যাক
আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ নিয়ে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশিরা সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে। যিনি মেডিকেল নিয়ে যাচ্ছেন, আসলে তিনি রোগী না। যিনি ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে যাচ্ছেন তিনি টুরিস্ট না। একটা ধারণা তৈরি হয়েছে- বাংলাদেশিরা দেশ ছেড়ে চলে যেতে চান। এই বার্তা খুবই খারাপ। এর মূল কারণ এখানে সুশাসনের অভাব। ফলে অনেক ক্ষেত্রে লিগ্যাল ভিসা নিয়ে গেলেও হয়রানির শিকার হতে হয়।
ছবি: DW
ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে : মেজর জেনারেল (অব.) আ ন হ মুনিরুজ্জামান, নিরাপত্তা বিশ্লেষক
আমাদের ভাবমূর্তিতে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা ঠিক করতে পারছে না। তাদের কোনো চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি আমাদের দেশের অনেক মানুষ মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। এই মানবপাচারকে সারা বিশ্বেই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। ফলে তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলেই সতর্ক হয়ে যায়। এমনকি অনেকে আমাদের ভিসাও দিচ্ছে না। যারা দিচ্ছে, সেখানে যেতে গেলেও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
ছবি: Private
মনে হয় বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান কমে যাচ্ছে : রাফিউজ্জামান রাফি, সভাপতি, অ্যাসোসিয়েশন অব ট্র্যাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ
ভারত, ইউএই, উজবেকিস্তান, কাতার, ভিয়েতনাম, ওমান, কুয়েত, বাহারাইন বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের ভিসা দিচ্ছে না। থাইল্যান্ড কিছু ভিসা দিলেও অন্তত ৪৫ দিন সময় নিচ্ছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, জাপান খুবই কম ভিসা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমাদের পাসপোর্টের মান কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ একেবারে তলানিতে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা ভিসা নিয়ে মিসউইজ করেছি। ফলে তারাও কঠোর হয়েছে৷
ছবি: Private
8 ছবি1 | 8
আগামী দিনে ইউক্রেনী শরণার্থীদের নাগরিকত্বের আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা৷ ২০২২ সালের শুরুতে রাশিয়ার আক্রমণের পর যে ইউক্রেনীয়রা জার্মানিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই ২০২৭ সালের মধ্যে পাঁচ বছরের বাসস্থানের শর্ত পূরণ করবেন৷ উত্তরের অউরিখ অঞ্চলের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের বসন্তের মধ্যে অনেক ইউক্রেনীয় নাগরিকত্বের আবেদনের জন্য যোগ্য হবেন এবং আইনি মর্যাদা নিশ্চিত করতে তারা এই সুযোগ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে৷
উল্লেখ্য, ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা জার্মানিতে আসার পর থেকেই কাজের অনুমতি এবং পূর্ণ বাসস্থানের মর্যাদা পেয়েছিলেন, যা ২০১৫-১৬ সালে আসা সিরীয়শরণার্থীদের ক্ষেত্রে শুরুর দিকে ছিল না৷ ২০২৭ সালের মার্চে ইউক্রেনীয়দের সুরক্ষার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অনেকে নাগরিকত্বের পথ বেছে নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে৷