জার্মান সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে নিন্দা জানানোর দাবি
২৭ মার্চ ২০২৬
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কোনো শাস্তি না হলে আইনের শাসন ক্ষুণ্ণ হয় বলেও মনে করেন তারা৷ তাই জার্মান সরকারের প্রতি ইরান ও ভেনিজুয়েলায় অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দায় সরব হওয়ার আহ্বান তাদের৷
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল৷ দুই দেশের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, বেশ কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা এবং এক হাজারেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন৷
এর আগে জানুয়ারির শুরুর দিকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী৷ সেই অভিযানেও বেসামরিক নাগরিকরা নিহত হন৷ আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের সিংহভাগই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান হামলা এবং ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন মনে করেন৷
তবে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস কোনোটির জন্যই দ্ব্যর্থহীনভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা করেননি৷ ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরুর পর রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট দলের নেতা ম্যার্ৎস বলেন, ‘‘পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে এবং নিজের জনগণকে নৃশংসভাবে দমন করছে এমন একটি (দেশের) শাসকদের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপ ও ব্যবস্থাগুলোতে যে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্টতই কোনো প্রভাব নেই – (এ নিয়ে) উভয় সংকটের বিষয়টি আমরা স্বীকার করছি৷'' এর আগে, মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণের ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করতে বললেও শুধু ‘জটিল' বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন৷
ইরান যুদ্ধ শুরুর পরপর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ম্যার্ৎস৷ যাবার আগেই জার্মানির চ্যান্সেলর স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘জ্ঞান' দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনা তার নেই৷ এ কারণে তার বিরুদ্ধে ট্রাম্পকে তোষামোদ করার অভিযোগও তুলেছিলেন সমালোচকরা৷
ম্যার্ৎস সরকারকে খোলা চিঠি
সম্প্রতি জার্মান সরকারকে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন বেশ কয়েকজন আইন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ৷ ১৭ মার্চ প্রকাশিত সেই চিঠিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়ে জার্মান সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন তারা৷ চিঠিতে বলা হয়, ‘‘এই পদক্ষেপ (২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো হামলা), যা কিনা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে, জার্মান ফেডারেল সরকারের এখন পর্যন্ত দেওয়া বিবৃতিগুলো স্পষ্টভাবে তার নিন্দা করে না৷ এটি ইউরোপ এবং বিশ্বে নিয়ম-ভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অবক্ষয়ে আরো ভূমিকা রাখে৷''
খোলা চিঠির অন্যতম স্বাক্ষরকারী জেনিনা ডিল যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ান৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই মুহূর্তে, বৃহৎ শক্তিগুলোর রাজনীতি — এবং সর্বোপরি মার্কিন নীতির পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক আইন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া — আইনের শাসনের বিশাল ক্ষতি করছে৷''
হাইডেলবার্গে মাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর কম্পারেটিভ পাবলিক ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ল-এর পরিচালক অ্যান পিটার্স বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রতিবাদ না করলে অলিখিত আন্তর্জাতিক আইন বদলে যেতে পারে৷ আইন লঙ্ঘনের সমালোচনা না করলে শক্তি প্রয়োগে নিষেধাজ্ঞা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং নিয়ম-কানুন বদলে যাবে- এমন আশঙ্কাও রয়েছে৷''
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস অবশ্য নিকট অতীতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কঠোর সমালোচনা করেছেন৷ ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার তীব্র ও দ্ব্যর্থহীন নিন্দা করেছিলেন তিনি৷ তাই ইরান ও ভেনেজুয়েলার বিষয়ে তার অবস্থান সম্পর্কে জার্মান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর হেনিং হফ-এর মন্তব্য, ‘‘আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে চ্যান্সেলরের সম্পর্ককে পরিস্থিতিগত বলা যেতে পারে৷''
গ্লোবাল সাউথ-এর বিশেষজ্ঞরা অবশ্য অনেক দিন ধরেই আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে পশ্চিমা সরকারগুলোর অবস্থানকে ‘দ্বৈত নীতি' বলে সমালোচনা করে আসছেন৷ অনেক পশ্চিমা দেশের সরকারের বিরুদ্ধে গ্লোবাল সাউথ-এর বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক আইন যখন স্বার্থের অনুকূলে থাকে না, তখন তারা আইন উপেক্ষা করে৷
‘বৃহৎ শক্তিগুলোর আইন প্রয়োগে আগ্রহ কমছে'
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জেনিনা ডিল উদ্বেগজনক একটি বৈশ্বিক প্রবণতার ওপর আলোকপাত করেছেন৷ ‘‘প্রকৃত সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার ইচ্ছার মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা''-র কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু রাশিয়া ও চীনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং এটি ক্রমবর্ধমানভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য৷ তার মতে, ‘‘বৃহৎ শক্তিগুলো আইন প্রয়োগে আগ্রহ ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে৷''
এই প্রবণতা রোধে জার্মানিসহ ‘দুর্বল রাষ্ট্রগুলো' কিছু করতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তা করতে হলে ‘‘অন্য সব রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ এবং সম্মিলিতভাবে আইনের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য আরো বেশি জরুরি আগ্রহ দেখাতে হবে৷''
জার্মানির প্রেসিডেন্টের মুখে চ্যান্সেলরের পরোক্ষ সমালোচনা এবং প্রতিক্রিয়া
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়ে জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ারের বক্তব্য খুব স্পষ্ট৷ সেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে পরোক্ষভাবে জার্মানির চ্যান্সেলরের সমালোচনা করেছেন তিনি৷ জার্মানির পররাষ্ট্র দপ্তরের এক অনুষ্ঠানে স্টাইনমায়ার বলেছেন, তিনি মনে করেন যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং এটি ‘‘রাজনৈতিকভাবে একটি মারাত্মক ভুল''৷ এ বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘কোনো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনকে আমরা যদি সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত না করি, তাহলে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি কিন্তু আরো বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না৷'' জার্মানির প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক আইন কোনো পুরোনো দস্তানার মতো নয় যে, অন্যরা খুলে ফেললে আমাদেরও তা খুলে ফেলতে হবে৷''
গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রপতির চ্যান্সেলরের বিরোধিতা করা জার্মানিতে বিরল ঘটনা৷ ম্যার্ৎস এখনো স্টাইনমায়ারের মন্তব্যের জবাব দেননি৷ তবে সিডিইউ/সিএসইউ সংসদীয় দলের নেতা ইয়েন্স স্পান প্রেসিডেন্ট স্টাইনমায়ারকে সংযম প্রদর্শনের অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, ‘‘এক্ষেত্রে এটি (ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা) আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা তা মূল্যায়নের দায়িত্ব ফেডারেল সরকারের৷ আমি আশা করবো, জার্মান ফেডারেল প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এই মূল্যায়নের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করবেন এবং সেটিকে সম্মান করবেন৷''
গত জানুয়ারি মাসে জার্মান সরকার জানিয়েছিল, তারা ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের আইনি প্রভাব মূল্যায়ন করবে৷ তবে মূল্যায়ন করতে তারা ‘সময় নেবে' বলেও জানানো হয়েছিল৷ এখনো কোনো মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়নি৷
ক্রিস্টফ হাসেলবাখ/ এসিবি