তিনি এখন আর খুব বেশি সিনেমায় অভিনয় করেন না। বরং রাজনাতিটাই মন দিয়ে করেন। তাঁর স্বামী অমিতাভ বচ্চন যেখানে বন্ধু রাজীব গান্ধীর অনুরোধ ফেলতে না পেরে রাজনীতিতে নেমে কিছুদিনের মধ্যেই কার্যত পালিয়ে বেঁচেছিলেন, সেখানে তিনি রাজনীতির জগতে দিব্যি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। সাংসদ হিসাবেও যথেষ্ট সক্রিয়। এহেন জয়া বচ্চন, যিনি পশ্চিমবঙ্গে এখনো 'ধন্যি মেয়ে' বলে পরিচিত, তিনিও নেমে পড়লেন বিধানসভা ভোটের প্রচারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধে তিনি দিনে দুইটি করে জনসভা করবেন।
বলিউড নায়িকার প্রথম জনসভা টালিগঞ্জে, যেখানে অরূপ বিশ্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন বলিউডের সঙ্গে যুক্ত বিজেপি-র বাবল সুপ্রিয়। টলিপাড়ায় বলিউডের নায়িকাকে নিয়ে এসে বিজেপি-র তারকা প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়াই আরও জোরালো করছে তৃণমূল। শুধু টালিগঞ্জ নয়, জয়া প্রতিদিন অন্য জায়গাতেও প্রচার করবেন। কলকাতা ও তার আশপাশের জেলায় এবার ভোট আসছে। তাই জয়া এদিকেই বেশি ব্যস্ত থাকবেন।
তৃণমূল এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে 'বাংলার ঘরের মেয়ে' বলছে। তা 'বাংলার ঘরের মেয়ে' এতদিন পর্যন্ত মূলত, টলিউডের ঘরের ছেলে-মেয়েদের দিয়েই প্রচার করাচ্ছিলেন। দেব, শতাব্দী, নুসরত, মিমি, জুন মালিয়া থেকে শুরু করে তৃণমূলের তারকা ব্রিগেডের তালিকাটা বেশ বড়। এবারই কাঞ্চন মল্লিক, জুন মালিয়া, সোহম চক্রবর্তী, রাজ চক্রবর্তী, সায়নী সহ বেশ কয়েকজনকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। তাদের ছেড়ে প্রবাসী বাঙালি ও সমাজবাদী পার্টির তারকা ডেকে এনে ভোট প্রচার করাতে হচ্ছে কেন?
পশ্চিমবঙ্গে কীভাবে লড়ছেন মমতা
আগামী ২৭ মার্চ থেকে আট পর্বের বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে। কেমনভাবে লড়ছেন গত দশ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ছবি: Prabhakarmani Tewari/DW
মমতাই প্রথম
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমেই ২৯১টি কেন্দ্রে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দিয়েছেন। পাহাড়ের তিনটি আসন ছেড়ে দিয়েছেন শরিক গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাকে। বিজেপি ও বাম জোট প্রথম দুই দফার প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে তিনি বাকিদের থেকে এগিয়ে রইলেন।
ছবি: Getty Images/AFP/D. Sarkar
বাদ ৬৪ জন বিধায়ক
এবার কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মমতা। গতবারের ৬৪ জন বিধায়ককে এবার আর প্রার্থী করেননি তৃণমূল-সুপ্রিমো। তাদের কেউ বিজেপি-তে গেছেন। অন্যরা জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। সবমিলিয়ে গতবারের তুলনায় শতাধিক প্রার্থী বদল করেছেন মমতা। নেতাদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ থাকলে তাকে আর প্রার্থী করা হয়নি। ৮০ বছরের বেশি বয়সীরা বাদ পড়েছেন। তাই অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র ভোটে লড়ছেন না। উপরের ছবিটি বাজেট পেশ করার সময় অমিত মিত্রর।
ছবি: DW/S. Bandopadhyay
নতুন কেন্দ্রে মমতা
মুখ্যমন্ত্রী নিজে লড়ছেন নতুন কেন্দ্র নন্দীগ্রামে। তার আগের কেন্দ্র ভবানীপুরে নয়। বিজেপি-তে যোগ দেয়া তার একদা লেফটন্যান্ট শুভেন্দু অধিকারীর চ্যালেঞ্জ ভোঁতা করে দিতে তিনি এই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ১০ মার্চ তিনি মনোনয়নপত্র পেশ করবেন। নন্দীগ্রামে ইতিমধ্যে বড়সড় জনসভা করেছেন মমতা।
ছবি: DW
কম মুসলিম প্রার্থী
গতবারের তুলনায় এবার তৃণমূলে মুসলিম প্রার্থীদের সংখ্যা কম। তৃণমূল এবার ৪৭ জন মুসলিম প্রার্থী দিয়েছে। গতবার দিয়েছিল ৫৭ জন। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের অভিযোগ, হিন্দুরা ক্ষুব্ধ বুঝে মুসলিম প্রার্থী কমিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। পশ্চিমবঙ্গে ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোট আছে।
ছবি: Getty Images/AFP/D. Sarkar
প্রচার মমতাময়
তৃণমূলের প্রচার মমতাময়। মুখ্যমন্ত্রী সবকটি কেন্দ্রে প্রচারে যাবেন। জনসভা করবেন। পদযাত্রাও। ইতিমধ্যে কলকাতা ও শিলিগুড়িতে পদযাত্রা করে ফলেছেন। তাই নন্দীগ্রামে তিনি বেশি সময় দিতে পারবেন না, তা আগেই জানিয়ে এসেছেন। সেখানে তার ভোটের দায়িত্বে পূর্ণেন্দু বসু।
ছবি: DW/Sirsho Bandopadhyay
আক্রমণাত্মক প্রচার
বিজেপি-র প্রধান দুই নেতা নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ যে অভিযোগ করবেন, তার জবাব দেয়ার কৌশল নিয়েছেন মমতা ও তার ভোট-কৌশলী প্রশান্ত কিশোর। বিজেপি এবার প্রচারে অভিষেককে টার্গেট করেছে। মমতা তার জবাব দিয়েছেন। পাল্টা টেনে এনেছেন অমিত শাহের ছেলে জয় শাহের প্রসঙ্গ। প্রধানমন্ত্রীকেও আক্রমণ করেছেন।
ছবি: DW/S. Bandopadhyay
প্রচারের ভাষা
আক্রমণ করতে গিয়ে অনেক সময়ই ভাষার উপর নিয়ন্ত্রণ থাকছে না তৃণমূল নেতাদের। মোদী-শাহকে হোঁদলকুতকুত ও কিম্ভূতকিমাকার বলেছেন তৃণমূল নেত্রী। এই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা নিয়ে আপত্তিও উঠেছে।
ছবি: Getty Images/AFP/D. Sarkar
আমল দিচ্ছে না তৃণমূল
অনেকে প্রার্থী হতে পারেননি। অনেকে বাদ পড়েছেন। তা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ তুঙ্গে। আরাবুল ইসলাম, সোনালি গুহরা প্রকাশ্যেই মুখ খুলেছেন। তবে এই ক্ষোভ আমল দিতে চাইছেন না মমতা। তিনি এখন নেমে পড়েছেন ভোটের ময়দানে। শুধু একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আবার জিতলে তিনি বিধান পরিষদ বানাবেন। বেশ কিছু নেতাকে বিধান পরিষদের সদস্য করা হবে।
ছবি: Getty Images/D. Sarkar
পিকে-র কৌশল
তৃণমূলের ভোট কৌশল তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে প্রশান্ত কিশোর বা পিকে-র। তিনি একদিকে সামাজিক মাধ্যমে তৃণমূলকে খুবই সক্রিয় করেছেন। অন্যদিকে কীভাবে বিজেপি-র প্রচারের জবাব দিতে হবে, তার পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রার্থীদের বিষয়ে একের পর এক সমীক্ষা করেছেন। দুর্নীতি ও অন্য অভিযোগ নিয়ে মানুষের ক্ষোভ কমানোর জন্য একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন।
ছবি: Hindustan Times/Imago Images
কঠিন লড়াই
এবার কঠিন লড়াইয়ের মুখে মমতা। তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে বিজেপি। ফলে পশ্চিমবঙ্গের এবারের ভোট খুবই চিত্তাকর্ষক হবে। মমতার সামনেও লড়াই রীতিমতো কঠিন।
ছবি: DW/S. Bandopadhyay
10 ছবি1 | 10
বিজেপি-র রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের দাবি, ''জয়া বচ্চনের সঙ্গে বাংলার কোনো যোগাযোগ নেই। তাকে এই প্রজন্ম চেনে না। উল্টোদিকে মিঠুন'দা বরাবর বাংলার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখেছেন। তাই মিঠুনদার সঙ্গে জয়া বচ্চনের কোনো তুলনা হয় না।''
সত্যিই কি তাই? প্রবীণ সাংবাদিক জয়ন্ত ভট্টাচার্য ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, ''হতে পারে এই প্রজন্ম জয়া বচ্চনকে সেভাবে চেনে না। কিন্তু আগের প্রজন্ম ধন্যি মেয়েকে চেনে। তাকে পছন্দ করে।'' জয়ন্ত মনে করেন, ''মিঠুন দলবদল করেছেন। জয়া সমাজবাদী পার্টিতে বরাবর আছেন এবং রাজনীতিটা তিনি সিরয়াসলি করেন।'' জয়ন্তর মতে, ''তৃণমূল এবার বাংলার বাইরের রাজনীতিকদের পরিকল্পনা করে ডাকছে। যেমন যশবন্ত সিনহা। তিনি মোদী-শাহ-নাড্ডার বক্তব্যকে পাল্টা যুক্তি দিয়ে কাটছেন। মানুষের কাছে তা বিশ্বাসয়োগ্য লাগতে পারে। জয়া বচ্চন পরিচিত মুখ, তার প্রচুর ভক্ত আছে। তাকে দিয়ে মিঠুনের মোকাবিলা করতে চাইলেও অসুবিধা নেই।''
তৃণমূলের মুখপাত্র ও রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ওব্রায়েন বলেছেন, ''বাংলা কেন তার মেয়েকে চায়, জয়াজি তা মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করবেন। '' তিনি তা অবশ্যই করতে পারেন। তবে ঘটনা হলো, তৃণমূল ও বিজেপি-র সৌজন্যে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এবার খুব বেশি করে ঢুকে পড়েছেন তারকারা, টলিউড তো বটেই, বলিউডও। তাদের দেখতে ভিড় হচ্ছে ঠিকই, তবে তাদের জন্য ভোটটা কি ঘাসফুল বা পদ্মে পড়বে?