করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় টিকা আবিষ্কারের অপেক্ষা করলেও আমরা কি অন্যান্য মারাত্মক রোগ থেকে সুরক্ষিত? যেমন মিজলস বা হামের টিকা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন না৷
ছবি: Imago/photothek/U. Grabowsky
বিজ্ঞাপন
২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে কোলন শহরে ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছিল৷ অনেক মানুষ সর্দি-কাশির ফলে কাহিল হয়ে পড়েছিলেন৷ শহরের এক হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মী হিসেবে আলেক্স সাউয়ারও আচমকা অসুস্থ বোধ করলেন৷ তবে তিনি তখনো জানতেন না, যে ফ্লু নয় – তাঁর আসলে মিজলস বা হাম হয়েছে৷
প্রথম উপসর্গগুলি ফ্লুয়ের মতোই৷ ক্লান্তি, গলায় ব্যথা, কাশি ইত্যাদি৷ হামের ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে আলেক্স নিজে ছোঁয়াচে রোগের উৎস হয়ে উঠলেন৷
মিজলস হলেই শহরের স্বাস্থ্য দফতরে তা নথিভুক্ত করা হয়৷ এপ্রিল মাস পর্যন্ত মোট আট জন সেই তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন, যা মোটেই অস্বাভাবিক নয়৷ তবে সেই হাসপাতালের কর্মীরা লক্ষ্য করলেন, যে একমাত্র শহরের এয়ারেনফেল্ড এলাকায়ই হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে৷ সেটা কি তাহলে মহামারির লক্ষণ?
আলেক্স সাউয়ার নিজের পারিবারিক ডাক্তারের কাছেই গিয়েছিলেন৷ তিনি গলার ব্যথা সারাতে একটি অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়েছিলেন৷ ফ্লুয়ের মতো উপসর্গের কারণে প্রথম দিকে হাম প্রায়ই শনাক্ত করা যায় না৷ কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক খেলে হাম সারে না৷ আলেক্সের অবস্থার অবনতি ঘটতে লাগলো৷ সেই সময়ের কথ মনে করে তিনি বললেন, ‘‘শরীর একেবারে ভেঙে পড়ে৷ এর বর্ণনা দেওয়া কঠিন৷ আমি কোনোদিন স্টিমরোলারের নীচে চাপা পড়ি নি বটে, তবে মনে হচ্ছিল আমার সঙ্গে যেন সে রকমই কিছু একটা ঘটেছে৷ ৪০ ডিগ্রিরও বেশি জ্বরের ফলে কিচ্ছু করার উপায় ছিল না৷ খাবার কোনো ইচ্ছা থাকে না, ওজন কমে যায়৷ বলদের মতো ঘাম হয়৷ ভালো ঘুম হয় না, আবার পুরোপুরি জেগে থাকারও উপায় নেই৷ এমন অসহায় অবস্থায় মনে হচ্ছিল কিছু একটা করতে হবে৷’’
শিশুরোগের লক্ষণ চিনুন, মারাত্মক ক্ষতি থেকে দূরে থাকুন
প্রতিটি মা-বাবার কাছে সন্তানের সুস্থতার চেয়ে মূল্যবান বোধহয় আর কিছু নেই৷ তাই শিশুরোগের লক্ষণগুলো জানা থাকলে সন্তানের জীবন সহজ ও সুন্দর হতে পারে৷ ছবিঘরে থাকছে এ বিষয়েই বিশেষজ্ঞের দেওয়া কিছু পরামর্শ৷
ছবি: Fotolia
শিশুর টিকা
শিশুর জন্মের এক বছরের মধ্যে হুপিং কাশি, দিপথেরিয়া, টিটেনাস, পোলিও, হাম, মাম্স এবং জলবসন্তের টিকা ইত্যাদি অবশ্যই দিতে হবে৷ তাছাড়া আরো কিছু টিকা রয়েছে যেগুলো পরে কিশোর বয়সে আবারও নতুন করে দিতে হয়৷ শিশুর স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি টিকাই নির্দিষ্ট সময়ে দেয়া প্রয়োজন৷ তবে এ বিষয়ে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন৷
ছবি: picture-alliance/dpa/K.J. Hildenbrand
রোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু শিশুরোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে মারাত্মক৷ যেমন হাম৷ জার্মানির শিশু-কিশোর অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক ডা. এসারের ভাষায়, ‘‘অনেকের ধারণা হাম ক্ষতি করে না৷ অথচ এটি একটি সংক্রমণ রোগ, যা নার্ভ বা স্নায়ু সিস্টেমকে আক্রমণ করতে পারে৷ হামের পর শতকরা ১০ জন শিশুর মস্তিষ্কের তরঙ্গে পরিবর্তন হয় আর অন্তত একজনের মাথায় থেকে যায় মানসিক ব্যাধির লক্ষণ৷
ছবি: imago stock&people
শিশুর জ্বর
প্রায়ই দেখা যায় কোনো অসুখ হওয়ার আগে শিশুদের জ্বর হয়৷ তাই জ্বরকে মোটেও হালকাভাবে নেয়া বা নিজে থেকে জ্বরের ওষুধ দেয়া কখনোই উচিত নয়৷ তবে এক শিশুর জ্বর হওয়ার আগে যদি তার বড় বা ছোট ভাই-বোনের ভাইরাস ঘটিত সংক্রমণ হয়ে থাকে, তাহলে দু-একদিন অপেক্ষা করা যেতে পারে৷
ছবি: picture-alliance/Agencia Estado
পান করতে না চাইলে
শিশুদের শরীরে তরল মজুদ রাখার সীমাবদ্ধতা রয়েছে৷ তাই শিশু জল বা অন্য কোনো পানীয় পান করতে না চাইলে, খুব তাড়াতাড়ি শিশুদের শরীরের ভেতরটা শুকিয়ে গিয়ে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে৷ তাই শিশু পান করতে না চাইলে বা অনেকটা সময় কোনো তরল পদার্থ পান না করে থাকলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত৷
ছবি: Fotolia/Zsolt Bota Finna
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
কথা না বলা, না হাঁটা, খেলা না করা বা কানে কম শুনছে মনে হলে খুব বেশি চিন্তা না করে ডাক্তারের কাছে যাওয়াই স্রেয়৷ কারণ সব শিশু একই বয়সে একই কাজ করে না৷ কেউ হয়ত ১০ মাস বয়সেই হাঁটতে শুরু করে আবার কেউ ১৪ মাসেও হাঁটে না৷ তাছাড়া অনেক শিশু হামগুড়ি না দিয়েই হাঁটতে শুরু করে৷ এ বিষয়গুলো অনেক সময় বংশগত কারণেও হয়ে থাকে৷
ছবি: Fotolia/deber73
অযথা অসুখ খুঁজবেন না!
‘‘অকারণে শিশুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন না৷ তবে কোনো কিছু অন্যরকম মনে হলে বা কোনো দ্বিধা থাকলে প্রয়োজনে নিজের মা বা মুরুব্বিদের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন৷ সারাক্ষণ শিশুকে অসুস্থ মনে করলে বা সে কথা তাকে বললে, তা শিশুমনে প্রভাব ফেলে৷ এবং পরবর্তীতে শিশুকে তা সত্যিই মানসিকভাবে অসুস্থ করে তুলতে পারে৷’’ বলেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এসার৷
ছবি: picture-alliance/dpa/R. Schlesinger
নিজের মতো চলতে দিন
নিজের ৩১ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে ডা. এসার বলেন, ‘‘ছোটখাটো ব্যাপারে শিশুকে বিরক্ত না করে, তাকে তার মতো চলতে এবং অন্য শিশুদের সাথে খেলতে দিন৷ খেলার মধ্য দিয়ে শিশুদের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে, ওরা হয় ওঠে আত্মবিশ্বাসী৷ লক্ষ্য রাখুন শিশুর আগ্রহ কোন দিকে৷ কারণ বেশি জোড় করলে শিশু মনে তার প্রভাব পড়ে এবং মনোজগতে ক্ষতচিহ্ন থেকে যায়৷’’
ছবি: Fotolia/Fotofreundin
মানসিক দ্বন্দ্ব থেকে দূরে রাখুন
একটা শিশু কিন্তু বুঝতে পারে না, কী কারণে তার মা অন্যের সাথে টেলিফোনে বা সরাসরি বাবার বদনাম বা সমালোচনা করছেন৷ শিশুরা এ সব নিয়ে কোনো প্রতিবাদ বা আলোচনা করতে পারে না ঠিকই, তবে শিশুমনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং এর ফলে সৃষ্টি হয় মানসিক দ্বন্দ্ব৷ তাই দাম্পত্য কলহ কখনই শিশুদের সামনে নয়! মা-বাবার ঝগড়া সন্তানের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে৷
ছবি: Fotolia
8 ছবি1 | 8
অ্যামবুলেন্স করে কোনোরকমে হাসপাতালে ভর্তি হলেন আলেক্স৷ এর পরেই গোটা শরীরের উপর লাল দাগ ছেয়ে গেল৷ তখন প্রথম বার মিজলস বা হাম ধরা পড়লো৷ আলেক্সকে এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হয়েছিল৷ শরীরে ৪০ডিগ্রি সেলসিয়াস জ্বর৷ তারপর আবার চোখের সমস্যাও শুরু হলো৷ আলেক্স বলেন, ‘‘যত বার মিজলস হবে, ততবার কনজাংকটিভাইটিস হবেই৷ আমার ক্ষেত্রে সেটা এতটাই মারাত্মক রূপ ধারণ করেছিল, যে তিন দিন পর আমি প্রায় কিছুই দেখতে পারছিলাম না৷ সবকিছু ঝাপসা হয়ে উঠেছিল৷ ফলে সেটাই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছিল৷ এমন ভয়ংকর অবস্থা বর্ণনাও করা যায় না৷’’
এর মধ্যে শহরের স্বাস্থ্য দফতরে প্রতিদিন আরও মিজলস রোগীর নাম নথিভুক্ত করা শুরু হলো৷ কর্মীরা তৎপর হয়ে উঠলেন এবং রোগের প্রসার বন্ধ করতে যারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁদের শনাক্ত করার কাজ শুরু করলেন৷ কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল৷ কোলনের স্বাস্থ্য দফতরের কর্মকর্তা প্রো. গেয়ারহার্ড ভিজেম্যুলার বলেন, ‘‘মিজলস যে কোলন শহরের জনসংখ্যার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, তা আমরা বুঝতে পারলাম৷ ফলে আমাদের মনে দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে পড়লো৷’’
দ্রুতবেগে হামের রোগীদের সংখ্যা বাড়তে লাগলো, যা ছিল এর এক বছর আগের তুলনায় দশ গুণ বেশি৷ ২০১৮ সালের মার্চ মাসে হাসপাতাল ও ডাক্তারের চেম্বারে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়তে লাগলো৷ ডাক্তাররা বুঝলেন যে এই সব রোগী পাঁচ দিন আগেই ছোঁয়াচে রোগের উৎস হয়ে উঠেছেন৷
এই সময়কালে তাঁরা আশেপাশের অরক্ষিত সব মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে দিতে পারেন৷ টিকার ভয়, সচেতনতার অভাব অথবা ভুলো মনের কারণে অনেকেরই হাম থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই৷ দুবার টিকা না নিলে যে কেউ এমন ভাইরাসে আক্রান্ত হতে ও ছড়িয়ে দিতে পারে৷
এফা শুলটেস/এসবি
গতবছরের জানুয়ারির ছবিঘরটি দেখুন...
ইউরোপে ‘হাম’ রোগের প্রকোপ বাড়ছে
হাম রোগের প্রকোপ বাড়ার কথা জানা যায় গতবছর প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি রিপোর্ট থেকে৷ অবশ্য চলতি বছরে সারা ইউরোপে হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে গত বছরের চেয়েও বেশি৷ বিস্তারিত থাকছে ছবিঘরে৷
ছবি: picture-alliance/dpa
মাত্র ছ’মাসে...
২০১৮ সালের প্রথম ছ’মাসে ইউরোপে ৪২,০০০ মানুষ হামের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন৷
ছবি: imago stock&people
টিকা না নেওয়ার কারণে
হামের বিরুদ্ধে টিকা না নেওয়াই হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডাব্লিউএইচও৷
ছবি: picture-alliance/dpa
জার্মানিতে টিকার হার
বর্তমানে জার্মানিতে হামের টিকা নেওয়ার হার শতকরা ৯৩ ভাগ৷
ছবি: Sean Gallup/Getty Images
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবাণী
হাম ভাইরাস নিয়ে ২০১৭ সালেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্কবাণী দিয়েছিল৷
ছবি: picture-alliance/Keystone/U. Flueeler
ডাব্লিউএইচও-র লক্ষ্য হাম নির্মূল করা
ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগ্যানাইজেশন বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য হাম নির্মূল করা৷ অ্যামেরিকা মহাদেশ এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলিতে ইতিমধ্যেই এটি করতে সফল হয়েছে৷
ছবি: picture-alliance/Keystone/U. Flueeler
জার্মানি
হাম একটি ছোঁয়াচে রোগ৷ অনেক মা-বাবা এই রোগকে তেমন গুরুত্ব দেন না বলেই অনেক শিশু অন্যশিশুদের সাথে খেলার ফলে হামে সংক্রমিত হয়৷ তাই এ রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি, প্রয়োজন টিকা নেওয়াও৷
ছবি: picture-alliance/dpa/R. Schlesinger
হামকে অনেকে তেমন গুরুত্ব দেন না
অনেকে মনে করেন, হাম তেমন ক্ষতিকর কোনো অসুখ নয়৷ তবে হাম সম্পর্কে জার্মানির রবার্ট কখ ইন্সটিটিউট জানায় যে, হাম থেকে মস্তিষ্কে সংক্রমণ পর্যন্ত হতে পারে৷ তবে তা হাজারে মাত্র একজনের হয়ে থাকে এবং এদের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু ঘটে৷