তৃণমূলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিতর্ক নতুন মাত্র পেয়েছে। বুধবার নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আহত হওয়ার পরে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন, নির্বাচন কমিশন পুলিশ-প্রশাসনে রদবদল করার ফলেই মুখ্যমন্ত্রীর সফরে যথেষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। এর পিছনে 'চক্রান্ত' আছে। শুক্রবার নির্বাচন কমিশন সেই অভিযোগের কড়া উত্তর দিয়েছে। তিন পাতার চিঠিতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তৃণমূলের অভিযোগ ভিত্তিহীন। যদিও নির্বাচন কমিশনের সেই উত্তর পাওয়ার পরে ফের সরব হয়েছে তৃণমূল।
তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, নির্বাচন কমিশন রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেলকে সরিয়ে দেওয়ার ফলেই নন্দীগ্রামের ঘটনা ঘটেছে। ভারতে কোনো রাজ্যে নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পরে নির্বাচন কমিশন সেই রাজ্যের প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করতে পারে। পুলিশ এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার রদবদল তারা করে। পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে কমিশন রাজ্যে পুলিশ অবজার্ভার নিয়োগ করেছে। সেই পুলিশ অবজার্ভারের নির্দেশেই রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেলকে সরানো হয়েছিল।
কমিশন তার চিঠিতে জানিয়েছে, কমিশনের নির্দেশে ডিজিকে সরানো হলেও প্রশাসনিক কাজে কমিশন হস্তক্ষেপ করে না। অর্থাৎ, প্রশাসন চালায় রাজ্যই। ফলে তৃণমূলের অভিযোগ ভিত্তিহীন। তৃণমূল অভিযোগ করেছিল, নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে কাজ করেছে। সেই অভিযোগেরও কড়া ভাষায় উত্তর দিয়েছে কমিশন। বলা হয়েছে, কমিশন কারো অঙ্গুলিহেলনে কাজ করে না।
আগামী ২৭ মার্চ থেকে আট পর্বের বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে। কেমনভাবে লড়ছেন গত দশ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ছবি: Prabhakarmani Tewari/DWমমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমেই ২৯১টি কেন্দ্রে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দিয়েছেন। পাহাড়ের তিনটি আসন ছেড়ে দিয়েছেন শরিক গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাকে। বিজেপি ও বাম জোট প্রথম দুই দফার প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে তিনি বাকিদের থেকে এগিয়ে রইলেন।
ছবি: Getty Images/AFP/D. Sarkarএবার কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মমতা। গতবারের ৬৪ জন বিধায়ককে এবার আর প্রার্থী করেননি তৃণমূল-সুপ্রিমো। তাদের কেউ বিজেপি-তে গেছেন। অন্যরা জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। সবমিলিয়ে গতবারের তুলনায় শতাধিক প্রার্থী বদল করেছেন মমতা। নেতাদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ থাকলে তাকে আর প্রার্থী করা হয়নি। ৮০ বছরের বেশি বয়সীরা বাদ পড়েছেন। তাই অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র ভোটে লড়ছেন না। উপরের ছবিটি বাজেট পেশ করার সময় অমিত মিত্রর।
ছবি: DW/S. Bandopadhyayমুখ্যমন্ত্রী নিজে লড়ছেন নতুন কেন্দ্র নন্দীগ্রামে। তার আগের কেন্দ্র ভবানীপুরে নয়। বিজেপি-তে যোগ দেয়া তার একদা লেফটন্যান্ট শুভেন্দু অধিকারীর চ্যালেঞ্জ ভোঁতা করে দিতে তিনি এই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ১০ মার্চ তিনি মনোনয়নপত্র পেশ করবেন। নন্দীগ্রামে ইতিমধ্যে বড়সড় জনসভা করেছেন মমতা।
ছবি: DWগতবারের তুলনায় এবার তৃণমূলে মুসলিম প্রার্থীদের সংখ্যা কম। তৃণমূল এবার ৪৭ জন মুসলিম প্রার্থী দিয়েছে। গতবার দিয়েছিল ৫৭ জন। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের অভিযোগ, হিন্দুরা ক্ষুব্ধ বুঝে মুসলিম প্রার্থী কমিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। পশ্চিমবঙ্গে ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোট আছে।
ছবি: Getty Images/AFP/D. Sarkarতৃণমূলের প্রচার মমতাময়। মুখ্যমন্ত্রী সবকটি কেন্দ্রে প্রচারে যাবেন। জনসভা করবেন। পদযাত্রাও। ইতিমধ্যে কলকাতা ও শিলিগুড়িতে পদযাত্রা করে ফলেছেন। তাই নন্দীগ্রামে তিনি বেশি সময় দিতে পারবেন না, তা আগেই জানিয়ে এসেছেন। সেখানে তার ভোটের দায়িত্বে পূর্ণেন্দু বসু।
ছবি: DW/Sirsho Bandopadhyayবিজেপি-র প্রধান দুই নেতা নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ যে অভিযোগ করবেন, তার জবাব দেয়ার কৌশল নিয়েছেন মমতা ও তার ভোট-কৌশলী প্রশান্ত কিশোর। বিজেপি এবার প্রচারে অভিষেককে টার্গেট করেছে। মমতা তার জবাব দিয়েছেন। পাল্টা টেনে এনেছেন অমিত শাহের ছেলে জয় শাহের প্রসঙ্গ। প্রধানমন্ত্রীকেও আক্রমণ করেছেন।
ছবি: DW/S. Bandopadhyay আক্রমণ করতে গিয়ে অনেক সময়ই ভাষার উপর নিয়ন্ত্রণ থাকছে না তৃণমূল নেতাদের। মোদী-শাহকে হোঁদলকুতকুত ও কিম্ভূতকিমাকার বলেছেন তৃণমূল নেত্রী। এই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা নিয়ে আপত্তিও উঠেছে।
ছবি: Getty Images/AFP/D. Sarkarঅনেকে প্রার্থী হতে পারেননি। অনেকে বাদ পড়েছেন। তা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ তুঙ্গে। আরাবুল ইসলাম, সোনালি গুহরা প্রকাশ্যেই মুখ খুলেছেন। তবে এই ক্ষোভ আমল দিতে চাইছেন না মমতা। তিনি এখন নেমে পড়েছেন ভোটের ময়দানে। শুধু একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আবার জিতলে তিনি বিধান পরিষদ বানাবেন। বেশ কিছু নেতাকে বিধান পরিষদের সদস্য করা হবে।
ছবি: Getty Images/D. Sarkarতৃণমূলের ভোট কৌশল তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে প্রশান্ত কিশোর বা পিকে-র। তিনি একদিকে সামাজিক মাধ্যমে তৃণমূলকে খুবই সক্রিয় করেছেন। অন্যদিকে কীভাবে বিজেপি-র প্রচারের জবাব দিতে হবে, তার পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রার্থীদের বিষয়ে একের পর এক সমীক্ষা করেছেন। দুর্নীতি ও অন্য অভিযোগ নিয়ে মানুষের ক্ষোভ কমানোর জন্য একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন।
ছবি: Hindustan Times/Imago Imagesএবার কঠিন লড়াইয়ের মুখে মমতা। তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে বিজেপি। ফলে পশ্চিমবঙ্গের এবারের ভোট খুবই চিত্তাকর্ষক হবে। মমতার সামনেও লড়াই রীতিমতো কঠিন।
ছবি: DW/S. Bandopadhyay রাজ্য সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের এই ধরনের বিতর্ক নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন রাজ্যে এ ধরনের বিতর্ক হয়েছে। যেহেতু কমিশন রাজ্য সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে সরাতে পারে, তাই রাজ্য যে কোনো সমস্যায় কমিশনের দিকে আঙুল তোলে। কমিশন পাল্টা জানায়, নির্বাচন প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে চালানোর জন্যই তারা সে কাজ করেছে। রাজ্য প্রশাসনের কাজে হস্তক্ষেপ করা তাদের অভিপ্রায় নয়। তবে পশ্চিমবঙ্গে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী আহত হওয়ায় বিষয়টি অন্য মাত্রা পেয়েছে।
কমিশনের এই চিঠি পাওয়ার আগেই বেশ কিছু তথ্য নিয়ে দিল্লিতে কমিশনের সদর দফতরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল তৃণমূল। দলের ছয় সদস্যের দল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এবং পশ্চিমবঙ্গ যুব মোর্চার সভাপতি সৌমিত্র খাঁয়ের ভিডিও ফুটেজ নিয়ে পৌঁছে গিয়েছে নির্বাচন কমিশনে। তৃণমূলের অভিযোগ, প্রতিটি ফুটেজেই বলা হয়েছে, নন্দীগ্রামে গিয়ে মমতা আক্রান্ত হতে পারেন। বিজেপি অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এসজি/জিএইচ (পিটিআই)