মিরপুরের পল্লবীতে কণ্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, মাজারে হামলা, জ্বালানি সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দাবি করেছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি৷
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অধিকার কমিটির সভায় পল্লবীর শিশুসহ সব শিশু ধর্ষণ-হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়৷ গত চার মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও ১৭ জন খুনের ঘটনায় সভায় গভীর উদ্বেগ জানানো হয়৷ছবি: Suvee Subyen/COLOURBOX
বিজ্ঞাপন
আজ শুক্রবার গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির এক সভায় এসব কথা বলা হয়৷ সভার পরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সভার আলোচনার বিষয় জানানো হয়৷
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অধিকার কমিটির সভায় পল্লবীর শিশুসহ সব শিশু ধর্ষণ-হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়৷ গত চার মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও ১৭ জন খুনের ঘটনায় সভায় গভীর উদ্বেগ জানানো হয়৷ সভায় বলা হয়, দেশব্যাপী নারী ও শিশুদের প্রতি এমন সহিংসতা বৃদ্ধি সামাজিক অস্থিরতা, সংবেদনহীনতা ও নিষ্ঠুরতার প্রকাশ৷ জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দ্রুত না হওয়ার পাশাপাশি এসব ঘটনার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন–সামাজিক সচেতনতা তৈরির ঘাটতি এ ধরনের অপরাধকে ভয়ংকর পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে৷ তবে এরপরও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না৷
অধিকার কমিটির সভায় বক্তারা মাদ্রাসায় ছেলে ও মেয়েশিশু নির্যাতন–ধর্ষণ–হত্যা বন্ধে ধর্মীয় নেতাদের প্রতিবাদী, কার্যকর ভূমিকা পালনের আহবান জানান বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়৷ একই সঙ্গে সভায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়৷
দেশব্যাপী হামে শিশুদের ক্রমবর্ধমান আক্রান্ত হওয়া, মারা যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা জানায় অধিকার কমিটি৷ এ ব্যাপারে তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরো সক্রিয় ভূমিকা পালনের দাবি জানায়৷
নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ার কিছু উপায়ের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশের কয়েকজন সচেতন নাগরিক৷ চলুন জেনে নেই তাদের ভাবনা৷
ছবি: Sazzad Hossain/DW
‘মানুষের মনোগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি’
মানবাধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান মনে করেন, ‘‘নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য কম তো আইন প্রণীত হয়নি৷ কিন্তু সেসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ হয়নি বলে নারী ও শিশুরা বারবার সহিংসতা, যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন৷ সবচেয়ে জরুরি হলো আপামর মানুষের মনোগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন৷ মানুষরূপী মুখোশের আড়ালে ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি, আর হীনমন্যতা কাজ করলে সমাজে শুধু নারী, শিশু নয়, কোনো প্রগতিশীল মানুষই নিরাপদ থাকবেন না৷’’
ছবি: DW
‘নারী ও শিশু নিরাপত্তা আইন জোরদার করতে হবে’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অদ্বিতীয়া বলেন, ‘‘নারী ও শিশু নিরাপত্তা আইন জোরদার করতে হবে৷ তাদের নিরাপত্তা রক্ষার্থে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালু করতে হবে৷ পাশাপাশি তারা যেনো নিজেদের রক্ষা করতে পারে এমন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে৷’’
ছবি: DW
‘সাদা পোশাকে টহল নিশ্চিত করতে হবে’
অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মনে করেন, নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় আইনের দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ করতে হবে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো সক্রিয় হতে হবে৷ তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা স্তরে সাদা পোশাকে টহল নিশ্চিত করতে হবে৷ টহলরতদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সাথে বা নিজেদের মধ্যে কনফারেন্স কল বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে সর্বদা যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখতে হবে৷’’
ছবি: DW
‘পারিবারিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজন’
চিকিৎসক সিফাত নাহার বলেন, ‘‘নারী ও শিশুদের সুরক্ষার জন্য সবার প্রথমে প্রয়োজন বিদ্যমান আইনের সংস্কার এবং তার যথাযথ প্রয়োগ যা একটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব৷ এর পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষা খুবই প্রয়োজন৷ এছাড়াও বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন কমিয়ে দেশীয় সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও আচার ব্যবহারের প্রচলন বাড়ানো প্রয়োজন৷’’
ছবি: DW
‘স্কুল পর্যায়ে লিঙ্গ সমতা ও নৈতিক শিক্ষা দরকার’
প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক বিপাশা চক্রবর্তী বলেন, ‘‘বাংলাদেশে নারী ও শিশু সুরক্ষায় বিদ্যমান আইনগুলো আরও কার্যকর করতে হবে৷ নতুন আইন প্রণয়ন করাও জরুরি৷ পাশাপাশি নীতি নির্ধারণে নারী ও শিশুর অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন৷ এছাড়া জনগণের মধ্যে ব্যাপক আকারে সচেতনতা তৈরি করতে হবে৷ বিশেষত, স্কুল পর্যায়ে লিঙ্গ সমতা ও নৈতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ৷’’
ছবি: DW
‘শুধু কঠোর আইন সুরক্ষা নিশ্চিত করবে না’
সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী তায়্যিব-উল-ইসলাম সৌরভ বলেন, ‘‘আমি মনে করি না যে শুধু কঠোর আইন করেই নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে৷ সবার আগে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, যেটি আমাদের মতো দেশে অনেক অভাব রয়েছে৷ আইনের কথা বলতে গেলে, ভুক্তভোগী এবং সাক্ষীর নিরাপত্তা ও সহায়তা বৃদ্ধি এবং ওয়ানস্টপ সাপোর্ট সেন্টার কার্যকর করতে হবে৷’’
ছবি: DW
‘সার্বিক পরিবেশ নারী ও শিশু অধিকারবান্ধব হতে হবে’
উদ্যোক্তা সোনিয়া সরকার সনি বলেন, ‘‘নারী আর শিশুদের নিরাপত্তাসহ সার্বিক সুরক্ষায় সরকারকে আরও বেশি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে৷ তা না হলে আধুনিক সমাজ বিনির্মাণে বেশ বেগ পেতে হবে৷ সামাজিক আর পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ দেশের সার্বিক পরিবেশ নারী আর শিশু অধিকারবান্ধব হতে হবে৷’’
ছবি: DW
‘শিশু নির্যাতন হলে বিচার দ্রুত করতে হবে’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব বলেন, ‘‘বর্তমানে যে আইনগুলি আছে তা যেন শুধু কাগজে না থাকে৷ এগুলো যত দ্রুত সম্ভব যথার্থভাবে কার্যকর করতে হবে৷ নারী এবং শিশু সবার ক্ষেত্রে যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়৷ শিশুদের ক্ষেত্রে যেন জেন্ডার বেজড কোনো বিচার না হয়৷ শিশুরা যে জেন্ডারই হোক না কেন তাদের উপর কোনো নির্যাতন হলে তার বিচার দ্রুত করতে হবে৷’’
ছবি: DW
‘দায়িত্বের অবহেলা’
অটোচালক মো: জসিম উদ্দিন বলেন, ‘‘এমন একটা আইন পাস করতে হবে যাতে করে দ্রুত বিচার করা যাবে৷ কোনোভাবেই এর শাস্তি ঝুলিয়ে রাখা যাবে না৷ নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা সঠিকভাবে না দেয়ার জন্য দায়ী হচ্ছে রাষ্ট্রের আইন ব্যবস্থা এবং জনগণ এর দায়িত্বের প্রতি অবহেলা৷ উন্নত দেশগুলোতে কোন সমস্যা হলে সবাই একসাথে কাজ করে, যা আমাদের দেশে তেমন দেখা যায় না৷ আমরা কেউ কারো বিপদে এগিয়ে যেতে চাই না৷’’
ছবি: DW
‘আমাদের সব ব্যবস্থা রয়েছে’
অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ বলেন, ‘‘নারী এবং শিশুর নিরাপত্তা রক্ষা না শুধু, একটি রাষ্ট্রের জনগণ এবং জীববৈচিত্র রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর৷ জনগণ হিসেবে আমাদের অধিকার এবং রাষ্ট্রের তা দায়িত্ব৷ আমাদের যে সকল বিভিন্ন হটলাইন রয়েছে, সে সকল হটলাইন গুলোকে অ্যাকটিভ থাকতে হবে৷ আমাদের সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে৷ জনগণ হিসেবে আমরা সেই সকল ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত না৷’’
ছবি: DW
10 ছবি1 | 10
এছাড়া সভায় রাজধানীর শাহ আলী মাজারে হামলা–ভাঙচুরের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করারও দাবি জানান অধিকার কমিটির সদস্যরা৷
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিদ্যুৎ–গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা বন্ধের দাবি জানানো হয় সভায়৷ বিনা বিচারে ৭০০ দিনের বেশি সময় ধরে আটক বম সম্প্রদায়ের মানুষের মুক্তি দাবি করা হয়৷ আরাকান আর্মির হাতে আটক জেলেদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহবান জানায় অধিকার কমিটি৷
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্যচুক্তির বিরুদ্ধে আগামী ৭ জুন পর্যন্ত কর্মসূচি সম্পর্কে সভায় অধিকার কমিটি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷
অধিকার কমিটির এই সভায় সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ৷ কমিটির সদস্য হারুন উর রশীদ, মোশাহিদা সুলতানা, আকরাম খান, জয়দীপ ভট্টাচার্য, শহীদুল ইসলাম, মাহতাব উদ্দীন আহমেদ, নাজমুস সাকিব, একরাম হোসেন, বাকী বিল্লাহ, অনুপ কুমার কুন্ডু, রাফিকুজ্জামান ফরিদ, ছায়েদুল হক প্রমুখ সভায় উপস্থিত ছিলেন৷