আচমকাই যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে। মিসাইল হামলার হাই অ্যালার্ট জারি হয়ে গিয়েছিল মার্কিন নৌসেনার একাধিক যুদ্ধ জাহাজে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা যায়, যুদ্ধ নয়, সামরিক মহড়ায় নেমেছে ইরানের সেনা বাহিনী। তবে সেই মহড়াও অভিনব। উপসাগরীয় অঞ্চলে নকল মার্কিন যুদ্ধজাহাজ তৈরি করা হয়েছিল। এরপর ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড সেই জাহাজ লক্ষ্য করে মিসাইল ছোড়ে। গুড়িয়ে দেওয়া হয় নকল মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ।
মঙ্গলবারের এই ঘটনায় রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ। ট্রাম্প সরকার ইরানের উপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে। তারই মধ্যে রেভোলিউশনারি গার্ডের গুরুত্বপূর্ণ এক কম্যান্ডারকে হত্যা করেছে অ্যামেরিকা। যার জেরে কার্যত যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল দুই দেশের মধ্যে। করোনা এসে দুই দেশের সেই তিক্ত সম্পর্কে খানিকটা হলেও জল ঢেলেছিল। আপাত দৃষ্টিতে পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক হয়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবার ইরানের সেনাবাহিনী বুঝিয়ে দিল, অ্যামেরিকার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এতটুকু বদলায়নি। বস্তুত, এ দিনের মহড়ার পর রেভোলিউশনারি সেনার তরফে বিবৃতি প্রকাশ করে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ক্ষমতা দেখানোর জন্যই ওই নকল মহড়ার আয়োজন করা হয়েছিল। বস্তুত, গোটা মহড়াটি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছে। দেশের মানুষকে দেখানো হয়েছে, ইরানের ক্ষমতা।
একটা সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল ইরান৷ সেখান থেকে চিরশত্রুতায় রূপ নিয়েছে তাদের সম্পর্ক৷ কীভাবে এই মেরুকরণ ঘটল দেখুন ছবিঘরে৷
ছবি: gemeinfrei১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক৷ তিনি ব্রিটিশদের কাছ থেকে দেশটির তেল সম্পদ জাতীয়করণ করেন৷ ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্স এবং এবং মার্কিন সিআইএ ক্যু ঘটিয়ে মোসাদ্দেককে উৎখাত করে৷
ছবি: picture-alliance/CPA Media Co. Ltdমোসাদ্দেকের পতনের পর ক্ষমতায় ফেরেন ইরানের নির্বাসিত শেষ সম্রাট রেজা শাহ পাহলভি৷ পরবর্তী দুই দশক ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গড়ে ওঠে নিবিড় বন্ধুত্ব৷ এক পর্যায়ে মার্কিন অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতায় পরিণত হয় পারস্য উপসাগরের দেশটি৷ যুক্তরাষ্ট্রের কোন অনুরোধই এসময় ফেলেননি শাহ, এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার৷
ছবি: gemeinfreiশাহের আমলে ইরানের তেল ব্যবসায় প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশ ও অ্যামেরিকান কোম্পানিগুলোর৷ ইরানি জনগণের মধ্যে রাজতন্ত্রবিরোধী ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে৷ ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন রেজা শাহ পাহলভি৷
ছবি: Getty Images/Afpদুই সপ্তাহ পর দেশে ফেরেন নির্বাসিত নেতা আয়াতোল্লাহ খোমেনি৷ তিনি ইরানের ‘ইসলামি বিপ্লবের’ নেতৃত্ব দেন৷ কিছুদিনের মধ্যেই দেশটির ছাত্ররা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে৷ ৪৪৪ দিনের জন্য বন্দী হয় ৫২ অ্যামেরিকান৷
ছবি: picture-alliance/dpa/AFP/G. Duvalবন্দী সঙ্কটের সমাধান না হওয়ায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার৷ দেশটিতে মার্কিন পণ্য রপ্তানি ও তেল আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়৷ জব্দ করা হয় ইরানের ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ৷ বের করে দেয়া কূটনীতিকদের৷
ছবি: Imago/ZumaPressএক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ইরান আক্রমণ করে সাদ্দাম হুসেন৷ যুদ্ধ চলাকালে ইরাককে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, অর্থ, সামরিক প্রযুক্তি এমনকি রাসায়নিক অস্ত্রও সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্র৷ এই যুদ্ধ চলে আট বছর৷ এসময় লেবাননে ইরানের সমর্থিত হেজবুল্লাহ গোষ্ঠীর হামলায় বৈরুতের একটি ব্যারাকে ২৪৪ অ্যামেরিকান নিহত হয়৷
ছবি: picture-alliance/Bildarchiv১৯৮৮ সালে পারস্য উপসাগরে ইরানের একটি যাত্রিবাহী বিমানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র৷ নিহত হয় ইরানের ২৯০ জন যাত্রী৷ একে দুর্ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান৷ এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক আরও তিক্ততায় রূপ নেয়৷
ছবি: picture alliance/dpa/A. Taherkenarehইরান সন্ত্রাসীদের মদত দেয়ার পাশাপাশি পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে, এমন অভিযোগে দেশটিকে একঘরে করার জন্য প্রচার চালায় ক্লিনটন প্রশাসন৷ ১৯৯৬ সালে বিদেশি কোম্পানিগুলোর ইরানে বিনিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ওয়াশিংটন৷
ছবি: AP১৯৯৮ থেকে পরবর্তী দুই বছর মোহাম্মদ খাতামি সরকারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ প্রকাশ করে ক্লিনটন প্রশাসন৷ এজন্য রোডম্যাপও ঘোষণা করা হয়৷ খাতামি দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের প্রস্তাব দেন৷ ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পণ্য আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়৷
ছবি: AP২০০৫ সালে আহমদিনেজাদের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের আবারও অবনতি ঘটে৷ ইরান এসময় পরমাণু কার্যক্রম শুরু করে৷ বুশ ইরানকে সন্ত্রাসের রপ্তানিকারক হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করেন৷ তবে ২০১৫ সালে ওবামা যুক্তরাষ্ট্র ও জোট রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইরানের পরমাণু কার্যক্রম স্থগিতকরণ চুক্তিতে বৈরিতার সেই বরফ কিছুটা গলে৷
ছবি: AP২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে পরমানু চুক্তি বাতিল করে ডনাল্ড ট্রাম্প৷ ইরানের উপর চাপ প্রয়োগ করতে নতুন করে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ওয়াশিংটন৷ দুই দেশের প্রক্সি ওয়ার অনেকটাই যুদ্ধাবস্থায় রূপ নিয়েছে চলতি বছরের তিন জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জেনারেল কাসিম সোলেইমানিকে হত্যার পর৷
ছবি: AFP/Fars/H. Mersadi অ্যামেরিকাও প্রাথমিক ভাবে ইরানের এই অভিনব মহড়ায় হতচকিত হয়ে গিয়েছিল। উপসাগরীয় অঞ্চলে দুইটি মার্কিন যুদ্ধ জাহাজে হাই অ্যালার্ট ঘোষণা হয়েছিল। তবে খানিকক্ষণের মধ্যেই বোঝা যায়, এটি ইরানের সামরিক মহড়া। আসল যুদ্ধ নয়। তবে যে ভাবে ইরান এ কাজ করেছে, তার তীব্র সমালোচনা করেছে অ্যামেরিকা। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌ বাহিনীর কম্যান্ডার বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, ''এই অঞ্চলে অ্যামেরিকা সহযোগী দেশগুলিকে নিয়ে উপসাগরের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে। এই অঞ্চলকে রক্ষা করাই আমাদের লক্ষ্য। আর ইরান সেখানে নিজেদের আক্রমণাত্মক চেহারা প্রকাশ করছে। যা এই অঞ্চলের শান্তি প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।'' বস্তুত, যে ভাবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করার ছবি দেখানো হয়েছে, তা মোটেই ভালো ভাবে নেয়নি অ্যামেরিকা।
এ দিন টেলিভিশনে দেখা গিয়েছে, নকল মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে একের পর এক মিসাইল আক্রমণ চালাচ্ছে ইরান। নকল ফাইটার জেটও দেখা গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ইচ্ছে করেই ইরান এই কাজ করেছে। প্রতিবেশী দেশগুলিকে ইরান বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে এখনও তাদের শক্তি অটুট। একই সঙ্গে অ্যামেরিকাকেও একই বার্তা দিতে চেয়েছে তারা।
এসজি/জিএইচ (রয়টার্স, এএফপি)