1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

নাড়ির টানে ‘দেশে’ ফেরা

রোহিত পণ্ডিত/এসি১৮ অক্টোবর ২০১৫

কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারের সন্তান রোহিত পণ্ডিত আজ ২৮ বছর বয়সের যুবক৷ তাঁর হিন্দু পরিবার কাশ্মীর ছাড়েন ১৯৮৯-১৯৯০ সালে, রোহিতের যখন দু'বছর বয়স৷ সম্পর্ক আর স্মৃতি কিন্তু রয়েই গেছে৷

Kaschmir Landschaft
ছবি: Getty Images/AFP/T. Mustafa

কথায় বলে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখড়ের প্রাণ যায়৷ ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে কাশ্মীরের মানুষদের ঠিক সেই দশা৷ তারা যেন উলুখড়, আর আমি সেই উলুখড়ের একটি খড়৷

আমাদের পরিবার যখন কাশ্মীর ছাড়েন, তখন তাদের সঙ্গে আরো প্রায় তিন লক্ষ কাশ্মীরি পণ্ডিত কাশ্মীর ছাড়েন – কারণ ইসলামপন্থি কাশ্মীরে এই হিন্দু পণ্ডিতদের আর কোনো জায়গা ছিল না৷

শিশু রোহিত ১৯৯৪ সালে জম্মুতেছবি: Privat

আমরা পালাই জম্মুতে৷ আমাকে স্কুলে ‘কাশ্মীরি', ‘কাপুরুষ', এই সব আখ্যা শুনতে হয়েছে৷ আমাদের ক্যাম্পগুলোর পাশে বড় বড় সভা হতো, আলোচনা হতো, জোর গলায় ধ্বনি দেওয়া হতো, আমরা যেন কাশ্মীরে ফেরৎ যাই৷

ধীরে ধীরে আমরা জম্মুতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম৷ জম্মুও আমাদের দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেল৷ বাবা-মা কিন্তু পুরনো দিনের গপ্পো, দাদু যে আমাদের গাঁয়ে কতো গণ্যমান্য ছিলেন, সেই সব কাহিনি শোনাতে ছাড়েননি৷ আমি হাঁ করে সেই সব গল্প শুনতাম৷ ধোঁয়াটে ভাবে মনে পড়ত আমাদের পুরনো বাড়ির কাঠের সিঁড়ির কথা৷ ফেলে আসার সময় অনেক পরিবার নাকি তাদের ফটো অ্যালবাম পর্যন্ত সাথে নিয়ে আসার সময় পায়নি৷ আজ আমাদের জম্মুতে বাড়ি আছে বটে, কিন্তু সেটা শুধুই একটা বাড়ি, ‘আমাদের বাড়ি' নয়৷

খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন

আমি প্রথমবার কাশ্মীরে ফিরি ২২ বছর বয়সে, বাবার সঙ্গে৷ বিমানে জম্মু থেকে শ্রীনগর গিয়েছিলাম৷ বিমানের জানলা থেকে বরফে ঢাকা হিমালয়, পরে কাশ্মীর উপত্যকার ঘন সবুজ, যার চতুর্দিকে পাহাড়৷ জম্মু অথবা ভারতের অপরাপর অংশের চেয়ে এ যেন সম্পূর্ণ আলাদা৷ আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল৷ এয়ারপোর্ট নামার পর আমি টারম্যাকে হাঁটু গেড়ে মাটি চুম্বন করে বলি, ‘‘এই আমার স্বদেশ৷'' আজও মনে আছে৷

কাশ্মীরের রাস্তায় রাস্তায় ঘোরার সময় আমি আমাদের সেই সব পারিবারিক খোসগল্পের নানা খুঁটিনাটি চিনতে পারছিলাম৷ পাহাড়, বন, নদী, মাঠ৷ আলো-ঠিকরনো নদী আর শান্ত, ঘুমন্ত হৃদ, সুন্দর বাগান আর রাজকীয় চিনার৷ পুবে হিমালয়, পশ্চিম আর দক্ষিণে পির পাঞ্জাল রেঞ্জ কাশ্মীরকে ঘিরে রেখেছে৷ শ্রীনগরের মধ্যে দিয়ে ঝিলাম নদী বয়ে যাচ্ছে৷ এ সব স্বপ্ন নয়, বাস্তব৷ এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা৷

আমরা অনন্তনাগে গেলাম আমাদের বাড়িটা যেখানে ছিল, সেই জায়গাটা দেখতে – কিন্তু বাবা সেটা খুঁজে পেলেন না৷ পরে স্থানীয় একজন এসে জায়গাটা দেখিয়ে দিলেন৷ ১৯৯৬ সালে আমাদের বাড়িটা পুড়িয়ে দেওয়া হয়৷ বাবা জমিটার উপর অনেকক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন৷ আমিও টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করিনি৷ কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম, এই কাশ্মীরই আমাদের ‘বাড়ি'৷

২০০৯ সালে বাবার সাথে রোহিত কাশ্মীরে বেড়াতে গেছেনছবি: Privat

পরে কাছের গ্রামে অনেকেই বাবাকে চিনতে পারলেন৷ এক মহিলা এসে জিগ্যেস করলেন, আমি কে? পরে আমাকে জড়িয়ে ধরে জিগ্যেস করলেন, আমার মা কেমন আছেন৷ জানা গেল, তিনি আর আমার মা একই স্কুলে পড়াতেন৷ একটি বাচ্চা ছেলে তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করছিল, ‘ওরা কি কাশ্মীরি পণ্ডিত? ওদের তো ঠিক আমাদের মতো দেখতে...৷'

ফেরা, ফেরৎ, ফিরতি

এক বছর পরে আমি আবার অনন্তনাগে ফিরি এবং থাকি একটানা তিন বছর৷ এবার স্থানীয় মানুষজনদের সঙ্গে অনেক কথা বলি৷ বুঝতে পারি যে, কাশ্মীরে অশান্তির ফলে হিন্দু, মুসলিম সকলেই কষ্ট পেয়েছে৷ আমরা কাশ্মীরি পণ্ডিতরা কাশ্মীরের বাইরে কষ্ট পেয়েছি, কাশ্মীরি মুসলিমরা কাশ্মীরেই কষ্ট পেয়েছে৷ কাশ্মীর তার কাশ্মীরিয়াৎ হারিয়েছে, যার অর্থ ছিল, সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারে৷

আজ আমরা তা ছেড়ে এসেছি, পেরিয়ে এসেছি, কেননা আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না, আমাদের হারানোর মতো আর কিছু ছিল না৷ কাজেই আমরা অন্যত্র ঘর বেঁধেছি৷ দেশে ফেরার আশা বিলীন হয়েছে৷ এই পঁচিশ বছরে একটা আস্ত প্রজন্ম বড় হয়েছে, যারা কাশ্মীর সম্পর্কে কিছু জানে না, ভাষাটা পর্যন্ত নয়৷ তাদের পক্ষে ফেরত যাওয়াটা হবে ঠিক সেখান থেকে পালানোর মতোই সমস্যাকর৷

অতিথি হিসেবে আমরা, কাশ্মীরি পণ্ডিতরা, আজও কাশ্মীরে স্বাগত৷ তবে গোটা উপত্যকা জুড়ে একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করা যায়৷ কথায় বলে, ‘কাশ্মীরে পরিস্থিতি আর আবহাওয়া যে কোন সময় বদলে যেতে পারে৷' একদিন পুরোপুরি ঠান্ডা, পরদিনই রাস্তায় বিক্ষোভ, পাথর ছোঁড়া৷ আমরা কাশ্মীরি পণ্ডিতরা শুধু এটুকু আশা করব যে, ভারত, পাকিস্তান আর বাকি যারা পরস্পরের বিরুদ্ধে দ্বেষ পোষণ করে, তার সবাই অতীত ছেড়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে – আমাদের মতো৷

রোহিতের গল্প আপনার কেমন লাগলো? জানান নীচের ঘরে৷

স্কিপ নেক্সট সেকশন এই বিষয়ে আরো তথ্য
স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ

ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ