নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্দার্ন জানিয়েছেন যে এবার থেকে সামরিক-শৈলীর সেমি-অটোম্যাটিক এবং অটোম্যাটিক অস্ত্র আর বিক্রি করা হবে না দেশটিতে৷ দু'টি মসজিদে হামলার ঘটনায় ৫০ ব্যক্তি নিহতের পর এই ঘোষণা করেন তিনি৷
বিজ্ঞাপন
গত ১৫ মার্চ ক্রাইস্টচার্চে দু'টি মসজিদে হামলা চালাতে সামরিক-শৈলীর সেমি-অটোম্যাটিক এবং অটোম্যাটিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল হামলাকারীরা৷ বৃহস্পতিবার এ ধরনের অস্ত্র নিউজিল্যান্ডে আর বিক্রি করা হবে না বলে জানান দেশের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্দার্ন৷
তিনি বলেন, ‘‘শুক্রবারের সন্ত্রাসী হামলায় ব্যবহৃত প্রতিটি সেমি-অটোম্যাটিক অস্ত্র নিষিদ্ধ করা হবে৷''
সামরিক-শৈলীর সেমি-অটোম্যাটিক এবং অ্যাসাল্ট রাইফেলের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে৷ পাশাপাশি যেসব যন্ত্রাংশ ক্রয় করে কোনো অস্ত্রকে অটোম্যাটিকে রূপান্তর করা যায়, সেসব যন্ত্রাংশ বিক্রিও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়বে৷
আর্দার্ন জানান, আগামী ১১ এপ্রিল থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে৷ এবং যেসব অস্ত্র ইতোমধ্যে বিক্রি হয়েছে সেগুলো তাদের মালিকদের কাছ থেকে ফেরত নিতে পুনরায় কিনে নেয়ার উদ্যোগ নেবে সরকার৷ তবে নতুন আইন কার্যকরে ঠিক কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে, তা এখনও জানাননি তিনি৷
প্রসঙ্গত, মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর দায়ে আটককৃত সন্দেহভাজন বৈধভাবে অস্ত্র কিনেছিল৷ পরবর্তীতে অবৈধভাবে সেসব অস্ত্রের ক্ষমতা বাড়িয়েছিল সে৷ আর্দার্ন বলেছেন, ইন্টারনেট থেকে কিছু যন্ত্রাংশ কিনে সহজেই সেটা করা যায়৷
যদিও কিউয়ি পুলিশ এখনো সন্ত্রাসী হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি, তবে ভিডিও ফুটেজ দেখে ধারণা করা হচ্ছে যে অন্তত একটি অস্ত্র হচ্ছে এআর-১৫ মডেলের সেমি-অটোম্যাটিক রাইফেল৷ এই অস্ত্র নিউজিল্যান্ডে বেশ সহজলভ্য৷
১৫ মার্চের সেই হামলায় পাঁচজন প্রবাসী বাংলাদেশিও নিহত হন৷ সেসময় নিউজিল্যান্ড সফররত বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা দেরিতে মসজিদটির কাছে পৌঁছানোয় প্রাণে বেঁচে যান৷
সেই হামলার পরপরই নিউজিল্যান্ডের শিথিল অস্ত্র আইন কঠোর করার ঘোষণা দেন জেসিন্ডা আর্দার্ন৷ অবশ্য নতুন এই নিষেধাজ্ঞা কোন কোনক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না, সেটা মন্ত্রিসভায় ঠিক করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি৷ বিশেষ করে যেসব কৃষকের পশুরপাল হত্যা করার প্রয়োজন হয়, তাদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নাও হতে পারে৷ তবে তাদের ক্ষেত্রেও কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি৷
এআই/ডিজি (রয়টার্স, এপি)
বিশ্ব নেতৃত্বের আদর্শ এখন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী
জাসিন্ডা আর্ডার্ন৷ নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থেকে তিনি এখন পরিণত হয়েছেন বিশ্বকে শান্তির পথে নেতৃত্ব দেয়ার দূত হিসেবে৷ তার উত্থানের গল্প থাকছে এই ছবিঘরে৷
ছবি: Reuters/A. Wiegmann
যোগাযোগের ছাত্রী
১৯৮০ সালে জন্ম নেয়া আর্ডার্নের বেড়ে ওঠা মুরুপাড়া নামে নিউজিল্যান্ডের মাউরি আদিবাসী অধ্যুষিত একটি ছোট্ট শহরে৷ যেখানে শিশুদের পায়ে দেয়ার মতো জুতা ছিল না, এমনকি দুপুরে তারা খাবারও পেত না৷ এই ঘটনাই তাকে রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করে৷ উচ্চ মাধ্যমিক শেষে আর্ডার্ন পড়াশোনা করেন যোগাযোগ বিদ্যায়৷ তার আগে ১৭ বছর বয়সেই যুক্ত হন নিউজিল্যান্ডের লেবার পার্টির রাজনীতিতে৷
ছবি: picture-alliance/AP Photo/M. Baker
বিশ্ব রাজনীতির পাঠ
স্নাতক শেষ করে আর্ডার্ন নিউজিল্যান্ডের লেবার পার্টির একজন সংসদ সদস্যের অধীনে গবেষক হিসেবে কাজ করেন৷ ২০০৫ সালে পাড়ি জমান ব্রিটেনে৷ আড়াই বছর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মন্ত্রীসভার দপ্তরে চাকরি করেন৷ ২০০৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব সোশ্যালিস্ট ওয়েলথের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘুরে বেড়িয়েছেন আলজেরিয়া, চীন, ভারত, ইসরায়েল, জর্ডার্ন ও লেবাননে৷
ছবি: Reuters/A. Wiegmann
জাতীয় রাজনীতির পথ চলা
২০০৮ সালে আর্ডার্ন লেবার পার্টির সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েও ১৩,০০০ ভোটে হেরে যান৷ কিন্তু দেশটির সংবিধানিক নিয়মে তিনি সংসদে যাওয়ার সুযোগ পান৷ ২৮ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে জায়গা করে নেন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভে৷
ছবি: Getty Images/P. Walter
‘জাসিডামেনিয়া’
২০১৭ সালে লেবার পার্টির উপ প্রধান নির্বাচিত হন আর্ডার্ন৷ নির্বাচনের দু’মাস আগে দলটির প্রধান পদত্যাগ করলে সেই ভারও চাপে তার কাঁধে৷ নির্বাচনি প্রচারে তরুণদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হন আর্ডার্ন৷ তাকে নিয়ে এসময় দেশটিতে জনপ্রিয়তার যে ঢেউ উঠে, তা পরিচিত ‘জাসিডামেনিয়া’ নামে৷
ছবি: Getty Images/P. Walter
বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী প্রধানমন্ত্রী
মাত্র দু’মাসের নেতৃত্বে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাই দলকে নির্বাচনে বিজয়ী করেন আর্ডার্ন৷ ২০১৭ সালে ৩৮ বছর বয়সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন৷ নিউজিল্যান্ডের ১৫০ বছরের ইতিহাসেও তিনি সবচেয়ে কম বয়সি সরকার প্রধান৷
ছবি: picture-alliance/Zumapress
প্রভাবশালী নারী
আর্ডার্ন সমকামী বিবাহের সমর্থক৷ জলবায়ু পরিবর্তন, শিশু দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চকিত৷ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নিউজিল্যান্ডের সরকার হবে সহানুভূতিশীল৷ ২০১৮ সালে ‘ফোর্বসের পাওয়ার উইমেনের’ তালিকায় জায়গা করে নেন তিনি৷ আছেন টাইম ম্যাগাজিনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকাতেও৷
ছবি: Reuters/A. Wiegmann
সন্তান জন্ম
টিভি উপস্থাপক ক্লার্ক গেফোর্ডকে বেছে নিয়েছেন তিনি সঙ্গী হিসেবে৷ ২০১৮ সালের ২২ জুন বেনজির ভুট্টোর পর বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বকালে সন্তানের জন্ম দেন আর্ডার্ন৷ এজন্য মাত্র ছয় সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়েছিলেন তিনি৷
ছবি: picture-alliance/dpa/Office of the Prime Minister of New Zealand/D. Henderson
সন্তান কোলে জাতিসংঘে
বিশ্বে প্রথমবার কোনো প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের কক্ষে সন্তান নিয়ে বক্তৃতা দিতে যান৷ তিনি জাসিন্ডা আর্ডার্ন৷ গত বছর নেলসন ম্যান্ডেলা পিস সামিটে অংশ নিয়ে আর্ডার্ন বিশ্ব গণমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হয়েছেন৷ বক্তৃতা দেয়ার সময় সন্তান ছিল সঙ্গী ক্লার্ক গেফোর্ডের কোলে৷
ছবি: Reuters/C. Allegri
ক্রাইস্টচার্চের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া
ক্রাইস্টচার্চে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৫০ জনকে হত্যার পর জাসিন্ডা আর্ডার্নকে নতুন করে চেনে বিশ্ব৷ এই ঘটনার অভিযুক্তকে কোনো কার্পণ্য না করেই সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হিসেবে অভিহিত করেন তিনি৷ দ্রুত অস্ত্র আইন পরিবর্তনের ঘোষণা দেন৷ মুসলমানদের উদ্দেশ্যে জানান, নিউজিল্যান্ড মোটেও এমনটা নয়৷ এই দেশে তারা স্বাধীনভাবেই থাকতে পারবে৷
ছবি: Reuters/E. Su
হিজাবে আর্ডার্ন
জাসিন্ডা আর্ডার্ন ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার পর ছুটে যান নিহতদের স্বজনদের কাছে৷ তাদের জড়িয়ে ধরেন, সমবেদনা প্রকাশ করেন৷ শুধু তাই নয়, মুসলমানদের সাথে একত্মতার প্রকাশ হিসেবে তিনি একাধিক দিন হিজাব পরে বেরিয়েছেন৷
ছবি: picture-alliance/AP Photo/TVNZ
সংসদে আরবি ভাষা
২০১৯ সালে ১৯ মার্চ সংসদে বক্তব্য দেন আর্ডার্ন৷ শুরুতেই সবাইকে ‘আস সালামু আলাইকুম’ বলে সম্বোন্ধন করেন তিনি৷ জানান ক্রাইস্টচার্চের ঘটনায় অভিযুক্তের নামও তিনি কখনও মুখে আনবেন না৷
ছবি: Getty Images/M. Tantrum
করোনার বিরুদ্ধে লড়াই
করোনা প্রতিরোধে বিশ্বে যে কয়টি দেশ সাফল্য পেয়েছে তার একটি নিউজিল্যান্ড৷ আর্ডার্নের নেতৃত্বে দেশটির সরকার করোনা ভাইরাসকে কখনো হুমকি হতে দেয়নি৷ শুরুতেই সীমান্ত বন্ধ করে কড়াকড়ি আরোপ করে সরকার৷ সামাজিক দূরত্ব, কোয়ারান্টিন, আইসোলেশনসহ বিভিন্ন নিয়মগুলো সুচারুভাবে পালন করা হয়৷ চলে বিস্তৃত পরিসরে করোনার পরীক্ষা৷ ফলাফল অন্য দেশগুলো যখন হিমশিম পরিস্থিতিতে তখন অনেকটাই নির্ভার নিউজিল্যান্ড৷