সরকার যখন একতরফা আচরণ করে, বিভ্রান্তি যখন কুয়াশার মতো ছেয়ে থাকে সমাজ-আকাশে, তখন হানাহানি স্বাভাবিক ঘটনাপ্রবাহ।
বিজ্ঞাপন
২০২৩ সালের জুলাই মাসে ভারতের নয়াদিল্লিতে উত্তর-পূর্ব রাজ্য মণিপুরে জাতিগত সংঘর্ষের সময় নারীদের যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে কর্মীরা প্ল্যাকার্ড ধরে স্লোগান দিচ্ছেন ছবি: Kabir Jhangiani/NurPhoto/picture alliance
ঠিক এক বছর আগে মাওবাদী অধ্যুষিত ছত্তিশগড়ের বস্তারে খবর করতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল মুকেশ চন্দ্রকারের সঙ্গে। কয়েকটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে বস্তারের খবর পাঠাতেন মুকেশ। কাজ শেষ করে এক বিকেলের আড্ডায় মাওবাদী অঞ্চলে কীভাবে স্থানীয় রিপোর্টারদের কাজ করতে হয় সেই গল্প শোনাচ্ছিলেন তিনি। কথায় কথায় বলছিলেন, ''হয়তো একদিন নিজেই খবর হয়ে যাবো!'' একবার নয়, বার বার বলছিলেন কথাটা।
কয়েক মাসের মধ্যেই যে সত্যিই সেই খবর শুনতে হবে, ভাবতে পারিনি। নতুন বছরের শুরুতেই এলো খবর। খুন হয়েছেন মুকেশ। একটি সেপটিক ট্যাংকের ভিতর থেকে উদ্ধার হয়েছে তার দেহ। বিকেলের ওই আড্ডায় মুকেশ বলছিলেন, বস্তারে রাস্তাঘাট তৈরির বরাত নিয়ে বিপুল দুর্নীতি হচ্ছে এবং সেই দুর্নীতির সঙ্গে রাঘব বোয়ালরা জড়িত। বেশ কিছু কাগজ হাতে এসেছে তার। আর তারই ভিত্তিতে একটি খবর তৈরি করছেন। হয়তো তখনই তিনি জানতেন, ওই খবরের পরিণতি কী হতে পারে! সে জন্যই হয়তো বার বার বলছিলেন, ''নিজেই একদিন খবর হয়ে যাবো!''
মুকেশ একা নন, ভারতের কোণায় কোণায় খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে বার বার আক্রান্ত হচ্ছেন সাংবাদিকেরা। কখনো খুন হচ্ছেন, কখনো গুম হচ্ছেন, কখনো বা তীব্র লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। মূলস্রোতের খবরের চ্যানেলের টিরআপি শো-তে যার ছিঁটেফোঁটাও জানা যায় না।
শুধু সাংবাদিক নয়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কোথাও ধর্মের নামে, কোথাও জাতের নামে, কোথাও স্রেফ গুজবের নামে। ২০১৭ সালে গোটা পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ছেয়ে গেছিল ছেলেধরা গুজব। উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রায় প্রতিটি জেলা থেকে খবর আসছিল গণধোলাইয়ের। মানুষের মারে মৃত্যু হচ্ছিল ছেলে ধরা সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের। সত্যিই কি তারা ছেলেধরা? সাংবাদিক হিসেবে উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গের কোণায় কোণায় ঘুরেছিলাম সেবার। পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলাম, সেসব অঞ্চলে যেখানে গ্রামের মানুষ গণপ্রহারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কথা বলেছিলাম তাদের সঙ্গে। অবাক হয়ে দেখেছিলাম, প্রতিটি জেলাতেই ঘুরে বেড়াচ্ছে সমাজ মাধ্যমের কিছু ফেক বা ভুয়া খবর। খবরগুলির বয়ান দেখেই বোঝা যায়, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সংকীর্ণ স্বার্থে গোটা রাজ্যজুড়ে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এর পিছনে যে রাজনৈতিক অভিসন্ধি আছে এবং একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে যে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, খবরগুলিতে চোখ বোলালেই তা স্পষ্ট হয়।
গ্রামের মানুষ ভাবেননি এত কিছু। নিছক সন্দেহের বসে একের পর এক মানুষকে ধরে পিটিয়ে মেরে দিয়েছেন তারা। অনেক সময় দেখা গেছে সেই ঘটনায় ঢুকে পড়েছে ব্যক্তিগত আক্রোশও। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গের সেই ঘটনা রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে ঝাড়খণ্ড পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল।
এই ঘটনার কয়েক বছরের মধ্যে দিল্লি চলে আসা। এসেই হাথরাস। মনে পড়ে, মাঝ রাত্তিরে গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে যখন পৌঁছালাম, তখন গোটা এলাকা পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না এলাকায়। কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না পরিবারের সঙ্গেও। বহু চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত নিহত ধর্ষিতার এক ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলো ঠিকই কিন্তু তখন তিনি কার্যত বাকশক্তিরহিত। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দূরে মাঠের দিকে, যে মাঠে ঘটেছিল গোটা ঘটনাটি।
বিশ্বজুড়ে উগ্রপন্থার উত্থান
পৃথিবীর নানা দেশে নানা রূপে উগ্রপন্থার উত্থান নিয়ে আলোচনা চলছে। কোথাও রাজনৈতিক, কোথাও সামাজিক ক্ষেত্রে উগ্রপন্থা শক্তিশালী হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কয়েকটি দেশের পরিস্থিতি জানুন ছবিঘরে।
ছবি: Andy Von Pip/ZUMA Press Wire/picture alliance
বাংলাদেশ
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৮০টির বেশি মাজারে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বেশ কয়েকটি জেলায় নারীদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দেয়া, লালন উৎসব বন্ধ করে দেয়া, নারীদের পোশাক নিয়ে হেনস্থার মতো ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামপন্থি সংগঠন হিজবুত তাহরীর দীর্ঘদিন পর ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে মিছিল করেছে। সরকার উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিলেও নানা ঘটনা ঠেকাতে ব্যর্থতার সমালোচনাও রয়েছে।
ছবি: DW
ভারত
ভারতে কেবল উগ্র ডানপন্থি হিন্দুত্ববাদ নয়, কোনো কোনো অঞ্চলে উগ্র বামপন্থাও দীর্ঘ দিনের সংকট। আসাম, নাগাল্যান্ড এবং মনিপুরে জাতিগত সংঘাতে প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। গ্লোবাল প্রজেক্ট অ্যাগেইনস্ট হেইট অ্যান্ড এক্সট্রিমিজম-এর 'হুমকির মুখে গণতন্ত্র' শীর্ষক প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শাসনামলে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আরো বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ছবি: Getty Images/AFP/S. Hussain
পাকিস্তান
ধর্মীয় উগ্রপন্থার পাশাপাশি বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের মাথাব্যথার কারণ। সম্প্রতি (১১ মার্চ) ট্রেনের যাত্রীদের জিম্মি করে বালুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অর্ধশত মানুষ নিহত হন। ১৩ মার্চ আফগান সীমান্তে চেক পোস্টে জঙ্গি গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালিবানের আত্মঘাতি বোমা হামলায় একাধিক সেনা নিহতের ঘটনা ঘটে। ১৪ মার্চ ঘটেছে মসজিদে বোমা হামলার ঘটনা।
ছবি: Arshad Arbab/dpa/picture-alliance
আফগানিস্তান
দেশটির তালেবান সরকার উগ্রবাদকে সমর্থন দেয়, এমন অভিযোগ রয়েছে। এ বছরের জানুয়ারিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বেশ কয়েকজন তালেবান নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ফেব্রুয়ারিতে নারীশিক্ষা বন্ধ ইস্যুতে তালেবান সরকারের সমালোচনা করায় দুবাইয়ে পালাতে বাধ্য হন দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আব্বাস স্তানিকজাই।
ছবি: AFP
ইরান
বিশেষ করে নারীদের লক্ষ্য করে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ রয়েছে খোদ ইরান সরকারের বিরুদ্ধে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনি হত্যার প্রতিবাদে নারীদের বিক্ষোভের পর থেকে নিপীড়ন আরো জোরদার হয়েছে। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ, নির্যাতন এবং নির্বিচারে আটকসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।
ছবি: Allison Bailey/NurPhoto/picture alliance
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
ডনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ঘোষণা দিয়েছেন, লিঙ্গ বলতে তিনি শুধু নারী এবং পুরুষকেই বোঝেন। অভিবাসীবিরোধিতা, এলজিবিটিকিউ বিরোধিতা, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, রাশিয়া ঘনিষ্ঠতা, এমন নানা ইস্যুতে ডনাল্ড ট্রাম্পের নীতি হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট গোষ্ঠীগুলোকেই সমর্থন করে বলেও অভিযোগ উদারপন্থিদের। এর ফলে দেশটিতে আদর্শিক বিভাজন বাড়ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে 'হুমকির মুখে গণতন্ত্র' প্রতিবেদনে।
ছবি: Jose Luis Magana/AP Photo/picture alliance
জার্মানি
জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থি অল্টারন্যাটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড (এএফডি) সাম্প্রতিক পার্লামেন্ট নির্বাচনে ইতিহাসের সেরা সাফল্য পেয়েছে। ১৫২ আসন পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তারা। অর্থনৈতিক অবনতি ঠেকাতে আগের সরকারগুলোর ব্যর্থতাকেই এই দলটির উত্থানের কারণ হিসাবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বিরোধী দল হিসাবে নানা নীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা জার্মানি এবং ইউরোপকে ভোগাবে, এমন শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন অনেকে।
ছবি: Michael Kuenne/Zumapress/picture alliance
ফ্রান্স
গত বছরের নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থিরা প্রায় ক্ষমতার কাছাকাছিই চলে এসেছিল। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ ভোট পায় উগ্র ডানপন্থি ‘রাসঁব্লে নাসিওনাল’ বা আরএন দল৷ তাদের ঠেকাতে মধ্য ও বামপন্থিদের এক অংশ একত্রিত হয়ে জোট গ্রহণ করেন। শেষ ফলে অবশ্য বামপন্থিদের অন্য একটি জোট জয়লাভ করে। কিন্তু রাজপথে উগ্র ডান এবং উগ্র বাম, দুইদিকেই শক্তিবৃদ্ধির ফলে নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরির শঙ্কা করছেন অনেকে।
ছবি: Wakil KOHSAR/AFP
ইটালি
ইটালির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি তরুণ বয়সে মুসোলিনির ‘গুণমুগ্ধ' হিসেবে পরিচিত ছিলেন৷ তবে সেই অবস্থান থেকে এখন সরে এসেছেন বলে দাবি তার৷ তবে তার অভিবাসনবিরোধী নীতির সমালোচনায় মুখর অনেক বিরোধী রাজনীতিবিদ। গত বছর নব্য-ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে পরিচিত এমএসআই-এর এক সময়কার প্রধান কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করে কট্টর ডানপন্থিরা৷ এমএসআই থেকেই পরবর্তীতে জর্জা মেলোনির দল ব্রাদার্স অব ইটালির উত্থান হয়৷
ছবি: Francesco Benvenuti/AP Photo/picture alliance
ব্রাজিল
কট্টর ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো ২০২২ সালে নির্বাচনে হারার পরও উগ্র ডানপন্থিদের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি ব্রাজিল সরকার। নির্বাচনে হারার পর অভ্যুত্থানের চেষ্টার অভিযোগে বলসোনারোর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। দেশটিতে লেবাননের হিজবোল্লাহ ছাড়াও হামাস এবং আল কায়েদার সক্রিয় থাকার একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ ব্রাজিলে বেশ কয়েকটি নব্য নাৎসি গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।
ছবি: Miguel Schincariol/AFP/Getty Images
আর্জেন্টিনা
'হুমকির মুখে গণতন্ত্র' শীর্ষক প্রতিবেদনে আর্জেন্টিনায় বেশ কয়েকটি সক্রিয় উগ্র-ডানপন্থি সংগঠন চিহ্নিত করা হয়েছে। ফ্রন্ট প্যাট্রিয়টা ফেডারেল এবং বান্দেরা নেগ্রার মতো নব্য-নাৎসি এবং হোয়াইট সুপ্রিম্যাসিস্ট গোষ্ঠী সহিংস কার্যকলাপ এবং ঘৃণা প্রচারের সাথে জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছবি: Luis Robayo/AFP
11 ছবি1 | 11
এরও বছরকয়েক পরে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের সময় আবার ঢুঁ মারলাম হাথরাসে। গেলাম সেই বাড়িতে। গোটা বাড়ি ঘিরে রেখেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। খাতায় সই করে, পরিচয়পত্র জমা রেখে ঢুকতে হলো বাড়িতে। দেখা হলো, সেই ভাইয়ের সঙ্গে। সাংবাদিককে দেখে একটিই কথা বললেন তিনি, মামলা আর টেনে নিয়ে যেতে পারছেন না। পুলিশ নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বাড়ি থেকে বার হতে দেয় না। ঠাকুর সমাজের গ্রাম তাদের উপর ভয়ংকর অসন্তুষ্ট। কেন ধর্ষণ করে খুন করার অপরাধে গ্রামের উচ্চবর্ণের ছেলেদের জেলে নিয়ে যাবে পুলিশ! নিহত ধর্ষিতার ভাই বলছিলেন, প্রতিনিয়ত তাদের মনে হয়, যে কোনো সময় আক্রমণ হবে। তারা কাজ করতে যেতে পারেন না, সন্ধের পর বাড়ির বাইরে থাকতে পারেন না। এভাবে কতদিন চলবে? সংসার চলবে কী করে?
তিনটি টুকরো ছবি। দেশের তিন প্রান্তের। অথচ তিনটি ছবি থেকেই একই বর্ণনা প্রতিফলিত হচ্ছে। চূড়ান্ত অরাজক এক পরিস্থিতি। দেশের প্রতিটি প্রান্তে প্রায় প্রতিদিনই এমন ছোটবড় অরাজকতার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
প্রশ্ন ওঠে, কেন হচ্ছে? উত্তর সহজ-- হতে দেওয়া হচ্ছে। ঠিক এই কারণেই রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন প্রণব মুখোপাধ্যায় জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে শুনিয়েছিলেন সহিষ্ণুতার কথা। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সুবাদে প্রণব বুঝতে পারছিলেন, দেশ ক্রমশ এক অসহিষ্ণু আবহের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। যেখানে কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে চাইছে না। সমবেদনা, সহনশীলতার ধারণাগুলি ক্রমশ উবে যাচ্ছে।
সমাজ সত্যি সত্যিই এখন জোকার ছবির শেষ দৃশ্যের দিকে এগোচ্ছে। এক চূড়ান্ত নৈরাজ্যের দিকে। আর এর সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে নীতিহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে। রাজনীতির কাঠামো যখন ধর্ম, বর্ণ, জাতের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, রাজনীতির কারবারিরা যখন প্রকাশ্যে ধর্ম-বর্ণ-জাত নিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা করেন, তখন সমাজে সহশীলতা আশা করা অন্যায়। সরকার এবং প্রশাসন যখন নীতি আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে মেরুকরণ তৈরি করে, তখন সমাজ ক্ষতবিক্ষত হয়। বর্তমান ভারত তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
যারা এর বিরোধিতা করার চেষ্টা করছেন, তাদের প্রাণ যাচ্ছে। যারা কিছুই করছেন না, তাদেরও প্রাণ যাচ্ছে কো-ল্যাটারাল ড্যামেজে। যে কোনো নৈরাজ্যে তাই ঘটে। এদেশেও তা-ই ঘটছে।