1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

নৈরাজ্যে যা ঘটে, এদেশে ঠিক তা-ই ঘটছে

ডয়চে ভেলের দিল্লি প্রতিনিধি স্যমন্তক ঘোষ৷
স্যমন্তক ঘোষ
১৪ মার্চ ২০২৫

সরকার যখন একতরফা আচরণ করে, বিভ্রান্তি যখন কুয়াশার মতো ছেয়ে থাকে সমাজ-আকাশে, তখন হানাহানি স্বাভাবিক ঘটনাপ্রবাহ।

২০২৩ সালের জুলাই মাসে ভারতের নয়াদিল্লিতে উত্তর-পূর্ব রাজ্য মণিপুরে জাতিগত সংঘর্ষের সময় নারীদের যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে কর্মীরা প্ল্যাকার্ড ধরে স্লোগান দিচ্ছেন ছবি: Kabir Jhangiani/NurPhoto/picture alliance

ঠিক এক বছর আগে মাওবাদী অধ্যুষিত ছত্তিশগড়ের বস্তারে খবর করতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল মুকেশ চন্দ্রকারের সঙ্গে। কয়েকটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে বস্তারের খবর পাঠাতেন মুকেশ। কাজ শেষ করে এক বিকেলের আড্ডায় মাওবাদী অঞ্চলে কীভাবে স্থানীয় রিপোর্টারদের কাজ করতে হয় সেই গল্প শোনাচ্ছিলেন তিনি। কথায় কথায় বলছিলেন, ''হয়তো একদিন নিজেই খবর হয়ে যাবো!'' একবার নয়, বার বার বলছিলেন কথাটা।

কয়েক মাসের মধ্যেই যে সত্যিই সেই খবর শুনতে হবে, ভাবতে পারিনি। নতুন বছরের শুরুতেই এলো খবর। খুন হয়েছেন মুকেশ। একটি সেপটিক ট্যাংকের ভিতর থেকে উদ্ধার হয়েছে তার দেহ। বিকেলের ওই আড্ডায় মুকেশ বলছিলেন, বস্তারে রাস্তাঘাট তৈরির বরাত নিয়ে বিপুল দুর্নীতি হচ্ছে এবং সেই দুর্নীতির সঙ্গে রাঘব বোয়ালরা জড়িত। বেশ কিছু কাগজ হাতে এসেছে তার। আর তারই ভিত্তিতে একটি খবর তৈরি করছেন। হয়তো তখনই তিনি জানতেন, ওই খবরের পরিণতি কী হতে পারে! সে জন্যই হয়তো বার বার বলছিলেন, ''নিজেই একদিন খবর হয়ে যাবো!''

মুকেশ একা নন, ভারতের কোণায় কোণায় খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে বার বার আক্রান্ত হচ্ছেন সাংবাদিকেরা। কখনো খুন হচ্ছেন, কখনো গুম হচ্ছেন, কখনো বা তীব্র লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। মূলস্রোতের খবরের চ্যানেলের টিরআপি শো-তে যার ছিঁটেফোঁটাও জানা যায় না।

শুধু সাংবাদিক নয়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কোথাও ধর্মের নামে, কোথাও জাতের নামে, কোথাও স্রেফ গুজবের নামে। ২০১৭ সালে গোটা পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ছেয়ে গেছিল ছেলেধরা গুজব। উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রায় প্রতিটি জেলা থেকে খবর আসছিল গণধোলাইয়ের। মানুষের মারে মৃত্যু হচ্ছিল ছেলে ধরা সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের। সত্যিই কি তারা ছেলেধরা? সাংবাদিক হিসেবে উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গের কোণায় কোণায় ঘুরেছিলাম সেবার। পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলাম, সেসব অঞ্চলে যেখানে গ্রামের মানুষ গণপ্রহারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কথা বলেছিলাম তাদের সঙ্গে। অবাক হয়ে দেখেছিলাম, প্রতিটি জেলাতেই ঘুরে বেড়াচ্ছে সমাজ মাধ্যমের কিছু ফেক বা ভুয়া খবর। খবরগুলির বয়ান দেখেই বোঝা যায়, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সংকীর্ণ স্বার্থে গোটা রাজ্যজুড়ে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এর পিছনে যে রাজনৈতিক অভিসন্ধি আছে এবং একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে যে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, খবরগুলিতে চোখ বোলালেই তা স্পষ্ট হয়।

গ্রামের মানুষ ভাবেননি এত কিছু। নিছক সন্দেহের বসে একের পর এক মানুষকে ধরে পিটিয়ে মেরে দিয়েছেন তারা। অনেক সময় দেখা গেছে সেই ঘটনায় ঢুকে পড়েছে ব্যক্তিগত আক্রোশও। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গের সেই ঘটনা রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে ঝাড়খণ্ড পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল।

এই ঘটনার কয়েক বছরের মধ্যে দিল্লি চলে আসা। এসেই হাথরাস। মনে পড়ে, মাঝ রাত্তিরে গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে যখন পৌঁছালাম, তখন গোটা এলাকা পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না এলাকায়। কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না পরিবারের সঙ্গেও। বহু চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত নিহত ধর্ষিতার এক ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলো ঠিকই কিন্তু তখন তিনি কার্যত বাকশক্তিরহিত। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দূরে মাঠের দিকে, যে মাঠে ঘটেছিল গোটা ঘটনাটি।

এরও বছরকয়েক পরে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের সময় আবার ঢুঁ মারলাম হাথরাসে। গেলাম সেই বাড়িতে। গোটা বাড়ি ঘিরে রেখেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। খাতায় সই করে, পরিচয়পত্র জমা রেখে ঢুকতে হলো বাড়িতে। দেখা হলো, সেই ভাইয়ের সঙ্গে। সাংবাদিককে দেখে একটিই কথা বললেন তিনি, মামলা আর টেনে নিয়ে যেতে পারছেন না। পুলিশ নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বাড়ি থেকে বার হতে দেয় না। ঠাকুর সমাজের গ্রাম তাদের উপর ভয়ংকর অসন্তুষ্ট। কেন ধর্ষণ করে খুন করার অপরাধে গ্রামের উচ্চবর্ণের ছেলেদের জেলে নিয়ে যাবে পুলিশ! নিহত ধর্ষিতার ভাই বলছিলেন, প্রতিনিয়ত তাদের মনে হয়, যে কোনো সময় আক্রমণ হবে। তারা কাজ করতে যেতে পারেন না, সন্ধের পর বাড়ির বাইরে থাকতে পারেন না। এভাবে কতদিন চলবে? সংসার চলবে কী করে?

তিনটি টুকরো ছবি। দেশের তিন প্রান্তের। অথচ তিনটি ছবি থেকেই একই বর্ণনা প্রতিফলিত হচ্ছে। চূড়ান্ত অরাজক এক পরিস্থিতি। দেশের প্রতিটি প্রান্তে প্রায় প্রতিদিনই এমন ছোটবড় অরাজকতার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

প্রশ্ন ওঠে, কেন হচ্ছে? উত্তর সহজ-- হতে দেওয়া হচ্ছে। ঠিক এই কারণেই রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন প্রণব মুখোপাধ্যায় জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে শুনিয়েছিলেন সহিষ্ণুতার কথা। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সুবাদে প্রণব বুঝতে পারছিলেন, দেশ ক্রমশ এক অসহিষ্ণু আবহের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। যেখানে কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে চাইছে না। সমবেদনা, সহনশীলতার ধারণাগুলি ক্রমশ উবে যাচ্ছে।

সমাজ সত্যি সত্যিই এখন জোকার ছবির শেষ দৃশ্যের দিকে এগোচ্ছে। এক চূড়ান্ত নৈরাজ্যের দিকে। আর এর সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে নীতিহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে। রাজনীতির কাঠামো যখন ধর্ম, বর্ণ, জাতের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, রাজনীতির কারবারিরা যখন প্রকাশ্যে ধর্ম-বর্ণ-জাত নিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা করেন, তখন সমাজে সহশীলতা আশা করা অন্যায়। সরকার এবং প্রশাসন যখন নীতি আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে মেরুকরণ তৈরি করে, তখন সমাজ ক্ষতবিক্ষত হয়। বর্তমান ভারত তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

যারা এর বিরোধিতা করার চেষ্টা করছেন, তাদের প্রাণ যাচ্ছে। যারা কিছুই করছেন না, তাদেরও প্রাণ যাচ্ছে কো-ল্যাটারাল ড্যামেজে। যে কোনো নৈরাজ্যে তাই ঘটে। এদেশেও তা-ই ঘটছে।

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ