1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

পশ্চিমবঙ্গে একা লড়বে কংগ্রেস, লাভ তৃণমূলের?

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় রদবদল। বামেদের সঙ্গে নয়, বিধানসভায় একা লড়বে কংগ্রেস। কেন এই সিদ্ধান্ত?

কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেনুগোপাল কিছু বলছেন এবং বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে শুনছেন।
পশ্চিমবঙ্গে বামেদের সঙ্গে নয়, বিধানসভা নির্বাচনে একাই লড়বে কংগ্রেস। ছবি: Rahul Sharma/ANI

বৃহস্পতিবার দিল্লিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচন চতুর্মুখী লড়াইয়ের (তৃণমূল, বিজেপি, বাম এবং কংগ্রেস) সাক্ষী হতে চলেছে।

​দিল্লির বৈঠকে বিচ্ছেদ

​বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরীএবং এআইসিসি-র সাধারণ সম্পাদক, বাংলার পর্যবেক্ষক গুলাম আহমেদ মির। সূত্রের খবর, অধীর জোটের পক্ষে সওয়াল করলেও হাইকমান্ড শেষ পর্যন্ত সংগঠনের স্বার্থে একক লড়াইয়ের সিদ্ধান্তেই সিলমোহর দেয়। শুভঙ্কর জানান, অধীর চৌধুরীকে মুখ করেই দল নির্বাচনে ঝাঁপাবে। দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সহমত জানিয়ে অধীর বলেন, "এআইসিসি-র সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।"

কংগ্রেস নেতৃত্বের একটি বড় অংশের মতে, বিগত নির্বাচনগুলিতে বামেদের সঙ্গে জোট করে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। নিচুতলার কর্মীদের মনোবল ফেরাতে এবং দলের নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষায় একক লড়াই জরুরি বলে মনে করছে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব।

তাদের যুক্তি, ২৯৪টি আসনে প্রার্থী দিলে দলের হারানো জমি পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে। সব বিধানসভা এলাকায় কর্মীদের চাঙ্গা করে তোলা যাবে। কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী ও খাড়গেও এই যুক্তিতে সায় দিয়েছেন।

কংগ্রেসের একক লড়াই

২০১৬-তে বাম-কংগ্রেস জোট প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেলেও ২০২১-এ দুই পক্ষই শূন্য হাতে ফিরেছিল। এই বিচ্ছেদের ফল কী হবে?

প্রবীণ কংগ্রেস নেতা, সাবেক প্রদেশ সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, "রাজ্যে যে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া রয়েছে, তা অনস্বীকার্য। কংগ্রেস কতটা সফলভাবে সেই জনমতকে নিজেদের পক্ষে আনতে পারে, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করছে।"

২৯৪টি আসনে প্রার্থী দেওয়া কংগ্রেসের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জের, তেমনই সংগঠনের শক্তি যাচাইয়ের বড় সুযোগ।

প্রদীপ বলেন, "মৈত্রীর সম্ভাবনা বাস্তবায়িত না হলেও, দলগতভাবে আমরা আমাদের লড়াই জারি রাখব। দলের হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমরা তাকে পাথেয় করেই এগোচ্ছি। কংগ্রেসের প্রতিটি কর্মী ও নেতা ঐক্যবদ্ধভাবে ময়দানে নামবে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো নির্বাচনের ফলাফলের চেয়েও বড়, দলের আদর্শ ও রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে সাধারণ মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়া।"

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের নেতৃত্বে আনেনি কংগ্রেস: আব্দুল মান্নান

10:05

This browser does not support the video element.

তার মতে, "পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৃণমূল এবং বিজেপি এমন এক দ্বিমুখী মেরুকরণ তৈরি করেছে, যেখানে সাধারণ মানুষের কাছে বিকল্প বেছে নেওয়ার জায়গাটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই নির্বাচনে একটি শক্তিশালী বিকল্প শক্তি হিসেবে উঠে আসার সুযোগ আমাদের সামনে ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটি পূর্ণতা পায়নি। এই 'বাইনারি' বা দ্বিমুখী লড়াই ভাঙা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।"

বামেদের চ্যালেঞ্জ বাড়ল

বামফ্রন্ট বিশেষ করে সিপিএম-এর জন্য এটি বড় ধাক্কা। সাগরদিঘি মডেলে যে সাফল্য তারা দেখেছিল, তা ধাক্কা খেল।

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী ডিডাব্লিউকে বলেন, "কংগ্রেস একটি সর্বভারতীয় দল এবং তারা কখন কী সিদ্ধান্ত নেবেন তা একান্তই তাদের নিজস্ব বিষয়। তারা আগে তৃণমূলের সঙ্গে জোট করেছিলেন, পরে বামেদের সঙ্গেও লড়েছেন। এখন যদি তারা এককভাবে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন, তাতে বামপন্থীদের ভিন্ন মত বা আপত্তি করার কোনো কারণ নেই।"

তিনি মনে করেন, "বামপন্থীরা বরাবরই তৃণমূল এবং বিজেপির বিরুদ্ধে সকল ধর্ম নিরপেক্ষ (সেকুলার) দলকে একত্রিত করার কথা বলে এসেছে। কংগ্রেস ধর্ম নিরপেক্ষ দল হওয়া সত্ত্বেও কেন শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে লড়তে পারল না, তা তাদের নেতৃত্বকেই ভেবে দেখতে হবে।" 

তার মতে, "পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি ও আরএসএস-এর প্রভাব বেড়েছে। আরএসএস সুকৌশলে রাজ্যে তৃণমূল বনাম বিজেপি, এমন একটি 'বাইনারি' বা দ্বিমুখি লড়াই তৈরি করতে চাইছে। মূলত আরএসএস-এর মনোভাব নিয়েই এই দুই দল চলছে।"

তৃণমূলের সুবিধা?

কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে বিরোধী ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার ফলে প্রথাগতভাবে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস লাভবান হতে পারে। বাম-কংগ্রেস জোট থাকলে যে 'অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি' ভোট দুই ভাগে ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকত, তা এখন তিন ভাগে (বাম, কংগ্রেস ও বিজেপি) বিভক্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, "বিরোধীদের ভোট যত বেশি বিভক্ত হবে, শাসকদলের জন্য পরিস্থিতি ততটাই সুবিধাজনক হয়ে উঠবে। বিপক্ষের ভোট ভাগ হওয়া মানেই শাসকদলের জন্য বড় জয়।  কংগ্রেস, সিপিএম এবং বিজেপি আলাদাভাবে লড়াই করলে তৃণমূলের জন্য পথ অত্যন্ত মসৃণ হয়ে যাবে।"

তিনি বলেন, "এই জোট না হওয়ার ফলে তৃণমূল কংগ্রেস রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় তৃণমূলের পাল্লা ভারি হতে পারে। মালদা বা মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলোতে কংগ্রেস ভালো ফল করলেও, অন্য অনেক জায়গায় জোট না থাকার সুবিধা সরাসরি তৃণমূলের দিকে যেতে পারে।"

তার বক্তব্য, "বিজেপি তাদের নিজস্ব মমতাবিরোধী ভোটব্যাংক বজায় রাখবে। অন্যদিকে, এই নির্বাচন সিপিএমের জন্য খুবই কঠিন হতে পারে। কারণ, সিপিএমের কট্টর মমতাবিরোধী ভোট আগেই বিজেপিতে গিয়েছে এবং বাকি ধর্মনিরপেক্ষ ভোটগুলো তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।"

​বামেদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "বামেদের জন্য প্রকাশ্য জোটের চেয়ে আসন সমঝোতা বেশি কার্যকর হতে পারে। সুনির্দিষ্ট নীতি বা কর্মসূচির ভিত্তিতে জোট না হলেও, 'সেকুলার' বা ধর্মনিরপেক্ষ এজেন্ডার ভিত্তিতে বিভিন্ন দলের মধ্যে একটি আন্ডারস্ট্যান্ডিং গড়ে তোলা প্রয়োজন। মুর্শিদাবাদে মহম্মদ সেলিম বা তামান্নাদের একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে। যদি তাঁরা অন্যান্য সমমনা দলের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে পারেন, তবে বামেদের ভোট কিছুটা বাড়তে পারে।''

​ ত্রিমুখী না চতুর্মুখী লড়াই? 

এতদিন লড়াই মূলত তৃণমূল বনাম বিজেপি এবং বাম-কংগ্রেস জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কংগ্রেস আলাদা লড়লে বিশেষ করে মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলোতে লড়াই হবে চতুর্মুখী। এতে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক বড়সড় ভাঙনের মুখে পড়তে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক মইদুল ইসলামের মতে, "বাম-কংগ্রেস জোট না হওয়ায় নির্বাচনী ময়দানে 'তৃতীয় শক্তি' দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে ফ্লোটিং ভোটারদের দ্বিধা অর্থাৎ যারা তৃণমূল এবং বিজেপি উভয়কেই অপছন্দ করতেন, তাদের সামনে বিকল্প কমে গিয়েছে। অন্যদিকে যারা বিজেপিকে রুখতে চান, তারা সরাসরি তৃণমূলকে ভোট দেবেন। যারা তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান, তাদের ভোট বিজেপির দিকে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ফলস্বরূপ, জোট না হওয়ায় কার্যত তৃণমূল ও বিজেপি উভয় দলই লাভবান হতে পারে।"

২০২১ সালের ভোটে জোট করে লড়েও কংগ্রেস ও বামেরা সংখ্যালঘু প্রধান মালদার ১২টি আসনের একটিতেও জিততে পারেনি। 

রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণ, "সংখ্যালঘু ভোট শুধুমাত্র কংগ্রেসের নয়, সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সিপিএম এবং হুমায়ুন কবীরের মতো নেতাদেরও প্রভাব রয়েছে। মমতার সংখ্যালঘু ভোটারদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন একজোট হয়ে কাজ করছে। নির্বাচন কমিশনকে ইমপিচ করার মতো পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে তিনি সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন, যা তাঁর নির্বাচনী অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।"

প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেন, "মালদা এবং মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলোতে কংগ্রেসের ভিত যথেষ্ট মজবুত। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে আমাদের দলের প্রতি আস্থা অটুট রয়েছে। এই অঞ্চলে এককভাবে লড়াই করার শক্তি কংগ্রেসের আছে এবং আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।"

মইদুল ডিডাব্লিউকে বলেন, "সিপিআইএম যদি আইএসএফ, মিম বা হুমায়ুন কবিরের মতো আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করতে পারে, তবেই সেখানে ‘চতুর্মুখী’ লড়াই সম্ভব। অন্যথায় লড়াইটি দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকবে।"

কেরালা ফ্যাক্টর

দক্ষিণের রাজ্য কেরালার ভোট একসঙ্গে থাকায় সেটা কি কংগ্রেস নেতৃত্বকে ভাবিয়েছে?

সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্যের মতে, "এই জোট না হওয়াটাই ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। পশ্চিমবঙ্গে এবং কেরালায় প্রায় একই সময়ে ভোট হতে চলেছে। কেরালায় এবার কংগ্রেসের জয়ের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে জোট হলে কেরালায় বাম বা বিজেপি সেই সুযোগ নিয়ে কংগ্রেসকে বিপাকে ফেলতে পারত। রাহুল গান্ধীর প্রধান পরামর্শদাতা কেসি বেণুগোপাল কেরালা থেকে নির্বাচিত এবং তিনি সেখানকার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। তাই কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব কখনোই চাইবেন না, পশ্চিমবঙ্গে জোট করে কেরালার নিশ্চিত জয়কে ঝুঁকিতে ফেলতে।"

সিপিএমের অবস্থান প্রসঙ্গে মইদুল বলেন, "কেরালায় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই করার সুবিধার্থে জাতীয় স্তরে জোট না করা তাদের জন্য লাভজনক হতে পারে। ২০১৬ সালের অভিজ্ঞতা থেকে সিপিএম হয়তো বুঝেছে যে কংগ্রেসের ভোট তাদের ঝুলিতে ততটা আসে না, যতটা বামেদের ভোট কংগ্রেসে যায়।"

ভোটের পূর্বাভাস দিতে গিয়ে তিনি বলেন, "মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশ বিজেপির সুবিধা হওয়ার ভয়ে আঞ্চলিক মুসলিম দলগুলোকে ভোট না দিয়ে বৃহত্তর কোনো শক্তির দিকে ঝুঁকতে পারে। তবে নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি পুরোপুরি স্পষ্ট হবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা সামনে আসার পর। কোন পকেট থেকে কোন সম্প্রদায়ের (মুসলিম, মতুয়া বা অবাঙালি) ভোটাররা বাদ গেলেন বা যুক্ত হলেন, সেই তথ্য হাতে পেলেই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল সম্পর্কে সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে।"

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ