পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যপাল ও সাংসদ সংঘাত, দুজনেই এফআইআর করলেন
২১ নভেম্বর ২০২৫
রাজভবনের সঙ্গে রাজ্য সরকারের সংঘাত কোনো নতুন বিষয় নয়। এবার পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
দ্বন্দ্বের নেপথ্যে
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা বা এসআইআর চলছে। এর সমর্থনে মন্তব্য করেছিলেন রাজ্যপাল বোস। তার এই অবস্থানের বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ। তার দাবি, বিজেপির অপরাধীদের রাজভবনে আশ্রয় দিয়েছেন রাজ্যপাল। তৃণমূল কর্মীদের আক্রমণ করার জন্য রাজভবনে অস্ত্র মজুত করা হচ্ছে।
সাংসদ অভিযোগ তোলার পরেই গত সোমবার রাজভবনে বম্ব স্কোয়াডকে ডাকেন বোস। রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। রাজ্যপালের বাসস্থলে তল্লাশি চাক্ষুষ করার জন্য সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেয়া হয় রাজভবনের দরজা। পুরো প্রক্রিয়া ভিডিও রেকর্ডিং করা হয়। তল্লাশি শেষে রাজ্যপাল বলেন, রাজভবনে এমন কিছু মেলেনি যা সাংসদ দাবি করেছেন। তাই তাকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।
এরপরে রাজভবনের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার কলকাতার হেয়ার স্ট্রিট থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ছটি ধারায় কল্যাণের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। ১৫১, ১৫২, ১৯৬ এ এবং বি, ৩৫৩, ১৯৭ ধারায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এই অভিযোগ দায়েরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একই থানায় সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন কল্যাণ। তার বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল সাংসদ। তিনি ভারতীয় ন্যায়সংহিতার পাঁচটি ও নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার একটি ধারায় বোসের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন।
১৫ নভেম্বর রাজভবনে সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যপাল যে মন্তব্য করেন, সেগুলিকে অভিযোগপত্রে তুলে ধরেছেন কল্যাণ। তার দাবি, বোস রাজ্যের ভোট প্রক্রিয়ায় নাক গলাতে চাইছেন। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ৮ অক্টোবর এবং ১৭ নভেম্বর বোসের দেওয়া সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারকে হাতিয়ার করেছেন সাংসদ।
বিরল সংঘাত
ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয়রাজ্যপালের সঙ্গে রাজ্য সরকারের সংঘাতনতুন কোনো বিষয় নয়। পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের অন্য রাজ্যে দশকের পর দশক এই দ্বন্দ্বের ইতিহাস রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয় ১৯৬৭ সালে। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাজ্যপাল ধর্মবীরের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে ফের যুক্তফ্রন্টের সরকার গঠিত হলে এই দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়।
বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পরে রাজ্যপাল বিডি সিংয়ের সঙ্গে শাসক দল সিপিএমের বিরোধ বেধেছিল। নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক উত্তাপের সময়ে রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর মন্তব্য হইচই ফেলেছিল।
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক অতীতে জগদীপ ধনখড়ের সঙ্গে রাজ্যের সংঘাত তুঙ্গে উঠেছিল। বোসের সঙ্গেও নানা বিষয়ে নবান্নের মতবিরোধ লেগেই আছে। তবে কোনো সাংসদের সঙ্গে বিরোধ ও তার জেরে চলতি ঘটনাক্রম বেনজির।
রাজ্যপালের পদক্ষেপ কেন
প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যপালের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেও তা কতটা কার্যকরী হতে পারে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী ডিডাব্লিউকে বলেন, "ভারতবর্ষের সংবিধান রাজ্যপাল এবং রাষ্ট্রপতিকে রক্ষাকবচ দিয়ে রেখেছে। তাদের কোনো আদালতে নিয়ে যাওয়া যায় না। তাদের বিরুদ্ধে কেউ যদি মামলা করেন, সেটা একটা বোকামি। আদালতে সেই মামলা উঠবে এবং নিজে থেকেই তা খারিজ হয়ে যাবে। যতক্ষণ তারা সাংবিধানিক পদে আছেন, তাদের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করতে পারবেন না।"
তবে তিনি এও বলেন, "রাজ্যপালও যে থানায় গিয়ে একজনের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছেন, সেটাও নজিরবিহীন ঘটনা। রাজ্যপাল নিশ্চিত ভাবে বলতে চাইছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে এমনই একটা অরাজক পরিস্থিতি রয়েছে, যেখানে একজন সাংসদ উল্টোপাল্টা অভিযোগ করছেন। রাজ্যপাল এই অসত্য প্রমাণের জন্যই রাজভবনে তল্লাশি করিয়েছেন। রাজ্যের শাসক দল যে অভিযোগগুলি আনছে, সেগুলি ভিত্তিহীন প্রমাণ করাই তার লক্ষ্য। এই প্রবণতা চলতে থাকলে পশ্চিমবঙ্গের সাংবিধানিক ঐক্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।"
রাজ্যপাল বারবার পশ্চিমবঙ্গের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে সরব হয়ে থাকেন। কল্যাণের বিরুদ্ধে এফআইআর করেও তিনি কি প্রমাণ করতে চাইলেন যে পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন নেই?
রাজাগোপাল বলেন, "রাজ্যপাল হয়তো এটাই দেখাতে চাইছেন যে, পুলিশে ডায়েরি করেও কিছু হয় না। এটা ওর কাছে অস্ত্র হয়ে দাঁড়াবে যে, রাজ্যপাল অভিযোগ করা সত্ত্বেও পুলিশ আইন মেনে কর্তব্য করছে না। একজন সাংসদের কোনো রক্ষাকবচ নেই। সাংসদের বিরুদ্ধে যখন অভিযোগ এসেছে, তখন পুলিশ তদন্ত করতে পারে।"
তার মতে, "রাজ্যপাল সুনির্দিষ্ট প্রমাণ জোগাড়ের চেষ্টা করছেন। ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ বা এই ধরনের কোনো কড়া পদক্ষেপ যদি উনি নিতে চান, যদি সুপ্রিম কোর্টে যান, তাহলে এগুলো তথ্যপ্রমাণ হিসেবে দেখাতে পারবেন পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলার কী অবস্থা।"
সমস্যা হবে কল্যাণের?
পুলিশ রাজ্যপালের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত না করলে বিষয়টা কি এখানেই ধামাচাপা পড়ে যাবে?
রাজাগোপাল বলেন, "কল্যাণের অভিযোগ সত্যি নয়, এটা প্রমাণিত হলে তিনি সমস্যায় পড়তে পারেন। এখন সংসদের এথিক্স কমিটি খুব শক্তিশালী। তাদের হাতে হয়তো ওর সাংসদ পদ চলে যেতে পারে। আমার ধারণা, মহুয়া মৈত্রের যদি সাংসদ পদ এথিক্স কমিটির হাত দিয়ে চলে যেতে পারে, তাহলে কল্যাণও সংসদীয় নিয়ম লংঘন করেছেন, এই অভিযোগে তার সংসদের পদ বাতিল হতে পারে।"
তিনি বলেন, "এই মুহূর্তে তৃণমূলের কল্যাণকে প্রয়োজন। অনেক মামলায় তিনি দলকে সাহায্য করছেন। এখন দল কল্যাণের বিরুদ্ধে কিছু বলবে না। কিন্তু তিনি বড় গাড্ডায় পড়ে গেলে, তৃণমূল তখন ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারে।"
সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্র ডিডাব্লিউকে বলেন, "কল্যাণের এই কাজটাকে তৃণমূলের কাজ হিসেবে দেখতে হবে, যতক্ষণ না দল বলছে যে, ওর এই কাজের প্রতি আমাদের সমর্থন নেই। রাজনৈতিকভাবে কল্যাণ যা বলছেন, সেটা তৃণমূলের বক্তব্য হিসেবেই দেখতে হবে। রাজ্যের সঙ্গে রাজ্যপালের যে সংঘাত ছিল, এটা তারই একটা পর্যায়।"
বিরোধী ভূমিকায় রাজ্যপাল?
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রাজ্যপালের ভূমিকা রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের মতো হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে বিভিন্ন পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে।
শুভাশিস বলেন, "পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও অন্যান্য অবিজেপি দল শাসিত রাজ্যে রাজ্যপালের সঙ্গে ক্ষমতায় থাকা শাসকদলের একটা বিরোধ আছেই। তামিলনাড়ু, কেরল, কর্নাটকে এমন বিরোধ আছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে রাজ্যপালের বিরুদ্ধে রাজ্যগুলো শীর্ষ আদালতেও গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ আদালতে গিয়েছে রাজ্যপালের বিরুদ্ধে। অনেকগুলো মামলায় তামিলনাড়ু গিয়েছে।"
তার মতে, "এই অভিযোগটা উঠছে যে, রাজ্যপালের কথা অনেক সময় বিরোধীদের ভাষার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। এ বিষয়টা তো আজকে শুরু হয়নি, অতীতেও ছিল। তবে রাজ্যপাল যেটা বলছেন, সেটা আরো আইনি ভাষায় রাজনৈতিক ইঙ্গিত বাদ দিয়ে বলা যায়। এই রাজনৈতিক ইঙ্গিত বাদ দিয়ে যদি রাজ্যপাল বলতেন, তাহলে হয়তো প্রতিক্রিয়া এত স্পষ্ট হত না। কিন্তু যে ভাষায় রাজ্যপাল বলছেন, আর যে স্বরে বিরোধী নেতা কথা বলছেন, রাজ্যের শাসক দল যদি তাতে মিল খুঁজে পায়, তাহলে তাদের প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তার মানে এই নয় যে, কল্যাণ ঠিক কাজ করছেন। এমন খারাপ দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন অবিজেপি রাজ্যে।"
সাংবিধানিক মর্যাদায় প্রশ্ন
রাজ্যপালের ভূমিকা ও সাংসদের মন্তব্য, এই দুয়ের ফলে গণতান্ত্রিক রীতি ও সাংবিধানিক পরম্পরা কি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না?
শুভাশিস বলেন, "শাসক দল এবং রাজ্যপাল, উভয়েরই সজাগ থাকা উচিত যাতে এই ধরনের ঘটনা না ঘটে। অতীতেও যে কখনো এমনটা হয়নি, তা নয়। বামফ্রন্ট আমলেও বারবার রাজ্যপালের সঙ্গে মতবিরোধ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মতবিরোধ হয়েছে রাজ্যপাল অনন্ত প্রসাদ শর্মার ক্ষেত্রে। তার বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন করেছে বামেরা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সন্তোষ ভট্টাচার্যর নিয়োগ নিয়ে এই বিবাদ হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই রাজ্যপালকে বদলি করে দেয়া হয়।"
তার মতে, "রাজ্যপালদের একটা বড় অংশের ক্ষেত্রে, কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আছে এমন মানুষদের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেটা একটা ক্রাইটেরিয়া। আমাদের সংবিধান যখন তৈরি হয়, তখন এই আলোচনাটা হয়েছিল। আম্বেদকার বলেছিলেন, যারা রাজ্যপাল হবেন, তারা এরকম করবেন না। তারা আইনজ্ঞ ও দায়িত্বশীল হবেন। দুর্ভাগ্যক্রমে আম্বেদকর যখন ছিলেন তখন এইসব ঘটনা ঘটেনি। অনেকদিন ধরেই বিরোধীদের অভিযোগ এমনকি বিজেপি যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন তারা এই অভিযোগ করেছে যে রাজ্যপাল কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করেন।"
অতীতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদ চত্বরে দাঁড়িয়ে তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতিকে অনুকরণ করেছিলেন। শুভাশিস বলেন, "এতে সাংবিধানিক পদের অবমূল্যায়ন হচ্ছে। তবে এটা কারণ নয়, এটা ফলাফল। অবমূল্যায়ন নানাভাবে চলছে অনেক দিন ধরে। কল্যাণের ঘটনা থেকে এটা শুরু হয়নি, দীর্ঘদিন ধরে এই অবমূল্যায়ন চলছে এবং তার জন্য শাসক এবং বিরোধী সব গুরুত্বপূর্ণ দলই দায়ী। যে যখন ক্ষমতায় থেকেছে, তারা এমন কিছু সুযোগ ব্যবহার করেছে যা বিরোধীদের মধ্যেও সেই মানসিকতা তৈরি করেছে। সরকার বদল হলে তারা আবার বদলে যায়। কোনোটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অবমূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অংশ বলেই মনে হয়।"