1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লাখ ভোটার নিয়ে প্রশ্ন, বড় অংশ মুসলিম

১ মার্চ ২০২৬

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে৷ কিন্তু ৬০ লক্ষ ভোটার নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন৷ সংশয় আছে তাদের কতজন ভোট দিতে পারবেন তা নিয়ে৷

তালিকা দেখছেন দুইজন
চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হলেও আরো ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারের পরিচয় এখনও বিচারাধীন ছবি: Payel Samanta/DW

বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা বা এসআইআর–এর প্রক্রিয়ায় শনিবার ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন৷ খসড়া তালিকার তুলনায় আরো বেশি সংখ্যায় ভোটাররা বাদ পড়েছেন৷ ‘বিচারাধীন' ভোটারের সংখ্যা বিপুল৷

এক নজরে তালিকা

সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী গত অক্টোবরে পশ্চিমবঙ্গে ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষের বেশি৷ এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরে খসড়া তালিকায় ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ কোটি ৮ লক্ষ৷ অর্থাৎ এসআইআর–এর প্রাথমিক খসড়া প্রকাশের সময়েই প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল৷

সংশোধন প্রক্রিয়া শেষে আরো প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে৷ অর্থাৎ তালিকা থেকে মোট বাদ গেছে ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জন ভোটারের নাম।

পাশাপাশি আরো ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারের পরিচয় এখন বিচারাধীন৷ তাদের প্রত্যেকের নামের পাশে ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন' লেখা রয়েছে৷ অর্থাৎ তাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে৷ বিচারকরা নথিপত্র পরীক্ষা করে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন৷ এই প্রক্রিয়া শেষ হলে একাধিক অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হবে শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী৷ তখন জানা যাবে শেষমেশ রাজ্যের ভোটার সংখ্যা কত হল৷

কোন জেলায় বেশি

বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া জেলাগুলিতেই বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা বেশি৷ মুর্শিদাবাদে ১১ লক্ষেরও বেশি ভোটারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত৷ মালদায় এই সংখ্যা প্রায় ৮ লক্ষ ২৮ হাজার৷ উত্তর ২৪ পরগনায় ৫ লক্ষ ৯১ হাজার এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় প্রায় ৫ লক্ষ ২২ হাজার বিচারাধীন ভোটার৷ অর্থাৎ, এই চার জেলাতেই মোট বিচারাধীন ভোটারের প্রায় অর্ধেকের বাস যাদের বড় অংশ সংখ্যালঘু৷

সবচেয়ে বেশি ও কম

পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে উত্তরবঙ্গের ডাবগ্রাম–ফুলবাড়ি কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে৷ সংখ্যাটা প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার৷ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার বাগদা, যেখানে ১৫ হাজার ৩০৩ জন ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে৷ সবথেকে কম ভোটার বাদ পড়েছেন পুরুলিয়ার কাশীপুর কেন্দ্রে৷ সেখানে মাত্র চার জনের নাম বাদ পড়েছে৷

খসড়া তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার পরে মনে করা হয়েছিল, ফর্ম–৬ জমা দিয়ে পুনরায় নাম তোলার চেষ্টা করবেন বাদ-পড়া অনেক ভোটার এবং নতুন ভোটারদের আবেদনও বাড়বে৷ কিন্তু কমিশনের তথ্য বলছে, এ বার ফর্ম–৬ জমা দেওয়ার হার প্রত্যাশার তুলনায় কম৷

মতুয়াদের কী অবস্থা

চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি মতুয়া অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে৷ উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক কেন্দ্রে মতুয়া সম্প্রদায়ের উপস্থিতি রয়েছে৷

এ সব এলাকায় বহু ভোটার ‘বিচারাধীন' তালিকায় চলে গিয়েছেন৷ বাগদা ছাড়াও উত্তর ২৪ পরগনার বগনাঁ উত্তর কেন্দ্রে ৭ হাজার ৯২৬ জন, বনগাঁ দক্ষিণে ৬ হাজার ৯০২ এবং গাইঘাটায় ৬ হাজার ৭৭০ জনের নাম বাদ পড়েছে৷ নদিয়ার হরিণঘাটায় ৯ হাজার ৩৭ জন, রানাঘাট দক্ষিণে ৭ হাজার ১২৬, রাণাঘাট উত্তর–পূর্বে ৬ হাজার ৪০৪ এবং রানাঘাট উত্তর–পশ্চিমে ৬ হাজার ৭০৪ জনের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে৷

ভোটার তালিকা থেকে মতুয়াদের নাম বাদ পড়া প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘বনগাঁর চারটি বিধানসভা কেন্দ্রেই যদি প্রায় ৩৬ হাজার মতুয়ার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়ে থাকে, তবে তা বিজেপির জন্য খুব একটা ভালো বার্তা বয়ে আনছে না৷ বিজেপি নেতারা বারবার দাবি করেছিলেন যে ভোটার তালিকায় একজন হিন্দুর গায়েও হাত পড়বে না, শুধু অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরাই বাদ যাবে৷ কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বোঝা যাচ্ছে, হয় তাদের এই বার্তা পৌঁছয়নি অথবা নির্বাচন কমিশনের প্রক্রিয়ায় তাদের কথার কোনো গুরুত্বই নেই৷''

মতুয়াদের ক্ষোভ ও তার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুরা ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভোটার তালিকায় নাম তোলার অধিকারী৷ অথচ দীর্ঘকাল এ দেশে বসবাস করার পরেও যদি তাদের নাম বাদ যায়, তবে তারা ক্ষিপ্ত হবেই৷ শুধু যাদের নাম বাদ গিয়েছে তারা নন, তাদের আশেপাশের মানুষের মধ্যেও এর প্রভাব পড়বে৷ মতুয়ারা নিশ্চিতভাবেই ভোটের বাক্সে এই ক্ষোভ উগরে দিতে চাইবেন৷''

সংখ্যালঘুরা নিশানায়?

তৃণমূল, সিপিএম-সহ বিজেপি বিরোধী বিভিন্ন দল গোড়া থেকেই অভিযোগ করেছে, সংখ্যালঘুদের নাম বাদ দেয়ার চক্রান্ত করা হয়েছে চলতি প্রক্রিয়ায়৷ চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে সেই অভিযোগ অনেকটাই প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক মইদুল ইসলাম৷

তিনি ডয়চে ভেলে বলেন, ‘‘এই তালিকা দেখে বোঝা যাচ্ছে মুসলিমদের সমস্যা সবচেয়ে বেশি৷ মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলা যেখানে জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি সংখ্যালঘু, সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বিচারাধীন৷ এর পাশাপাশি রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, যেখানে সংখ্যালঘুরা ৫০ শতাংশের কম হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছে৷ যদিও নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনায় মতুয়াদের একটা বড় সংখ্যাও এর মধ্যে আছে৷ এই পুরো প্রক্রিয়াটাই হয়েছে মুসলমানদের টার্গেট করে৷ সে কারণেই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি ক্যাটেগরি পশ্চিমবঙ্গে আমদানি করা হয়েছে৷ এনিউমারেশন ফর্মে মতুয়া বা অন্যান্য হিন্দুদের অসুবিধা হয়েছিল, মুসলমানদের নয়৷ এটাকে ব্যালান্স করার জন্য লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বিষয়টিকে সামনে আনা হয়েছে৷''

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় জনবিন্যাসের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে৷ মইদুলের মতে, ‘‘মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুরে বরাবরই সংখ্যালঘুদের সংখ্যা বেশি৷ তারা বাংলাদেশে যাননি৷ এখানকার মুসলমানরা পিছিয়ে পড়া, সে কারণে তাদের সচেতনতার অভাব রয়েছে৷ এর ফলে তাদের জন্মহার বেশি৷ জনসংখ্যার এই বৃদ্ধি ঘটেছে বলে তাদের হেনস্থা করা হবে৷''

মতুয়া ও মুসলমান ভোটার কমার ফলে বিজেপি ও তৃণমূলের জনসমর্থনে প্রভাব পড়তে পারে৷

মতুয়াদের সম্পর্কে বিজেপি ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নিজে এসে মতুয়াদের বিষয়ে খেয়াল রাখার কথা বলেছিলেন৷ কিন্তু এই তালিকা দেখে মনে হচ্ছে মতুয়াদের বিষয়টি আলাদাভাবে কোনো গুরুত্বই পায়নি৷ উত্তর ২৪ পরগনার চূড়ান্ত তালিকায় এখনো অনেক মতুয়া ভোটারের নাম বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে৷ এই সংখ্যাতত্ত্ব স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে বিজেপি এবং তাদের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি৷ এর প্রভাব ভোটে পড়তে পারে৷''

মইদুলের বক্তব্য, ‘‘জুডিশিয়াল অফিসাররা বিচারাধীন ৬০ লক্ষ মানুষের নথিপত্র খতিয়ে দেখবেন। এই কাজটায় তারা দক্ষ। এই ভোটারদের অধিকাংশই প্রকৃত বলে আমার ধারণা। যদি দেখা যায়, এর মধ্যে বড় সংখ্যক মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেল, তাহলে বলতে হবে, এসআইআর ভ্রান্ত। এর ফলে নির্বাচনটাও ভ্রান্ত বলতে হবে।''

মুসলমান ভোটারের সংখ্যা হ্রাস পেলে তৃণমূলের ভোটবাক্সে টান পড়তে পারে। তবে অনেক পর্যবেক্ষক বিষয়টার অতিসরলীকরণ করতে চাইছেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বর্তমানে রাজ্যের মুসলিম ভোট প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে এই ভোট বামেদের দিকে থাকলেও এখন তা তৃণমূলের দিকেই যাচ্ছে। তবে এখন হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে ভারতীয় উন্নয়ন পার্টি'র মতো নিজস্ব দল তৈরি হওয়ায় সমীকরণ বদলাতে পারে। সবসময় শাসকের সঙ্গে থাকলেই ফায়দা হবে, মুসলিমরা এখন এই ধারণা অনুযায়ী নাও চলতে পারে।''

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ