1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

পুলিশ-প্রশাসনে রদবদলে ভোট অবাধ হবে?

পায়েল সামন্ত পশ্চিমবঙ্গ
২০ মার্চ ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ ও প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল চলছে। ৭২ ঘন্টায় ৪৩ জনকে বদলি করা হয়েছে। এতে কি অবাধ ভোট নিশ্চিত করা যাবে?

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কমিশন
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন কমিশনছবি: Satyajit Shaw/DW

রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। প্রচার পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। নির্বাচনী আচরণবিধির কার্যকর হওয়ার পরে নির্বাচন কমিশনের হাতে এখন প্রশাসন পরিচালনার ভার। তারা দায়িত্ব নিতে ব্যাপক রদবদল শুরু হয়েছে।

পুলিশের পরে প্রশাসন 

নির্বাচন কমিশন সবার আগে রাজ্যের মুখ্যসচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে সরিয়ে দেয়। বদল করা হয় বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপারদের। এরপরে আমলাদের বদলে দেয়া হচ্ছে। 

গত মঙ্গলবার ১৩টি জেলা ও পুলিশ জেলার পুলিশ সুপারকে সরিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। চারটি কমিশনারেটের পুলিশ কমিশনারকেও সরানো হয়েছিল। বুধবার এই ১৩টি জেলার জেলাশাসক অর্থাৎ জেলার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে সরানো হয়েছে। 

কোচবিহার, মালদা, উত্তর দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসককে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তার আগে অপসারণ করা হয়েছিল কোচবিহার মালদা, ইসলামপুর, মুর্শিদাবাদ, জঙ্গিপুর, বারাসত, বসিরহাট, ডায়মন্ডহারবার জেলা ও পুলিশ জেলার সুপারদের।

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের নেতৃত্বে আনেনি কংগ্রেস: আব্দুল মান্নান

10:05

This browser does not support the video element.

যে জেলার জেলাশাসকরা বদলি হয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছে জলপাইগুড়ি, নদিয়া,  দার্জিলিং, পূর্ব বর্ধমান, আলিপুরদুয়ারএছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে সরানো হয়েছে। কলকাতা উত্তরের আধিকারিক হচ্ছেন স্মিতা পান্ডে। কলকাতা দক্ষিণে এই দায়িত্ব সামলাবেন রণবীর কুমার। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন পর্বে এই দুজন রোল অবজারভারের ভূমিকা পালন করেছেন। 

রাজ্য পুলিশের পাঁচটি রেঞ্জের ডিআইজিকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। রায়গঞ্জ, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, জলপাইগুড়ি ও প্রেসিডেন্সি রেঞ্জে নতুন অফিসাররা দায়িত্ব পেয়েছেন। সব মিলিয়ে রবিবার ভোট ঘোষণার পরে, তিন দিনের মধ্যে ৪৩ জন শীর্ষ আমলা ও পুলিশকর্তাকে নির্বাচন কমিশন সরিয়ে দিয়েছে যা অভূতপূর্ব।

ভোট প্রস্তুতি ঘিরে নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাজ্যপাল রবীন্দ্রনারায়ণ রবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকেরা। লোক ভবনে গিয়ে রাজ্যপালের সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্য সচিব দুষ্মন্ত নারিয়াল, স্বরাষ্ট্র সচিব সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ, রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্ত এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয়কুমার নন্দা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটাকে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলা হলেও সূত্রের খবর, বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সহিংসতা কি কমবে

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ঘিরে বার বার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। অসংখ্য প্রাণহানি হয়েছে। পুলিশ-প্রশাসনে রদবদল হলেও কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সাবেক পুলিশকর্তা সলিল ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, "শান্তিপূর্ণ, ভয়হীন ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করাই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, যাতে সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের এই উৎসবে নির্ভয়ে অংশ নিতে পারেন। অতীতেও বিভিন্ন পদক্ষেপ বা বদলি দেখা গিয়েছে, তবে সাফল্যের চাবিকাঠি হলো সদিচ্ছা। দায়সারাভাবে কাজ না করে উদ্দেশ্য সফল করার মানসিকতা নিয়ে এগোলে তবেই পরিবর্তন সম্ভব।"

তার বক্তব্য, "নির্বাচন কমিশন যেভাবে সক্রিয় হয়েছে এবং যে সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গবাসী একটি হিংসামুক্ত নির্বাচন দেখতে পাবেন বলে আশা করা যায়। তবে এই প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ সাফল্য কেবল প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি স্তরের সরকারি আধিকারিক, পুলিশ প্রশাসন এবং সর্বোপরি সাধারণ নাগরিকের আন্তরিক সহযোগিতা ও সৎ ইচ্ছা থাকলে তবেই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব।"

এক সময় আমলা হিসেবে কাজ করা সাবেক আইএএস অফিসার সুখবিলাস বর্মা ডিডাব্লিউকে বলেন, "পশ্চিমবঙ্গের বিগত নির্বাচনগুলিতে ব্যাপক রিগিং, দুর্নীতি এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতি একটি সাধারণ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। এটা সাধারণ ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দেয়। প্রশাসনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচন করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা ভাঙতেই হয়তো নির্বাচন কমিশন এবার এত বিপুল সংখ্যায় উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের রদবদলের পদক্ষেপ নিচ্ছে।''

রাজ্য বিধানসভার সাবেক এই সদস্যের মতে, "বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী আসছে। দুটো পর্যায়ে নির্বাচনের ফলে পর্যাপ্ত বাহিনী মোতায়েন করা যাবে। এতে রক্তপাতহীন ও নিরাপদ নির্বাচন হবে আশা করা যায়। নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা হচ্ছে, তারা চাইছে নির্বাচন ঠিকঠাকভাবে সেরে ফেলতে।"

বাহিনী কতটা কাজে লাগবে

এ বার রাজ্যের ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর আড়াই লক্ষ জওয়ানকে মোতায়েন করা হবে। কিন্তু বাহিনী মোতায়েন করলেই নির্বাচন ভয়মুক্ত হবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে কি?

অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্ম (এডিআর)-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার সঞ্চালক উজ্জয়িনী হালিমের মতে, "নির্বাচন অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত করতে কেবল কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনই যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে মূল সমস্যা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। সুষ্ঠু ও রক্তপাতহীন নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর যে সদিচ্ছা প্রয়োজন, বাস্তবে তার পরিবর্তে উসকানিমূলক বক্তব্য ও শক্তির আস্ফালনই বেশি দেখা যায়।"

রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিরোধ চরমে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তোপ দাগছেন কমিশনের বিরুদ্ধে। এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে নির্বাচন শান্তিতে হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বাংলায় কথা বললেই কি 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' বলা হবে?

07:34

This browser does not support the video element.

উজ্জয়িনীর বক্তব্য, "নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক রদবদল করে রাতারাতি তৃণমূল স্তরের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল বা হিংসা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বন্দুকের নলের পাহারায় ভোটদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গণতন্ত্রের জন্য একটি লজ্জাজনক অধ্যায়। সুষ্ঠু নির্বাচন সুনিশ্চিত করতে ভোটারদের সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি তবে বাহিনী মোতায়েন করলে আর্থিক লেনদেন বা উপহারের অপব্যবহার কিছুটা ঠেকানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে কমিশনের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।"

দুই পক্ষের দায়িত্ব

উচ্চপদস্থ অফিসারদের বদলি নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন, উভয় পক্ষের দায় আছে বলে মনে করেন সাবেক আইএএস অফিসার জহর সরকার। 

পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক জহর ডিডাব্লিউকে বলেন, "নির্বাচন কমিশনের একটা ক্ষমতা আছে, যা টিএন শেষনের আমল থেকে প্রয়োগ করা হচ্ছে। কোনো আধিকারিক নির্বাচন ঠিক মতো পরিচালনা করতে পারবেন না, এটা কমিশন মনে করলে তাকে সরিয়ে দিতে পারে। আমার সময়ও করা হয়েছিল। এই জিনিসটা বাড়তে বাড়তে এমন একটা জায়গায় চলে গিয়েছে যে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বনাম রাজ্য সরকার। এই যুদ্ধের বলি হচ্ছেন অফিসাররা।"

তার মতে, "এই যে মুখ্যসচিবকে সরিয়ে দেয়া হল, সেটা অভূতপূর্ব। ভারতে কোনো মুখ্যসচিবকে নির্বাচন ঘোষণার দিনে সরানো হয়নি। আবার উল্টো দিক থেকে দেখলে বলতে হয়, এই মুখ্যসচিব আটজন না নয়জন সিনিয়রকে টপকে এই পদে এসেছেন। এতে একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই মুখ্যসচিব রাজ্যের শাসক দলের কাছের মানুষ। নইলে কেন এতজন অফিসারকে টপকে তাকে এই পদে বসানো হল? সিনিয়রিটির ভিত্তিতে প্রথম তিন-চারজনের মধ্যে কাউকে এই দায়িত্ব দেয়া যেত। এটাও কিন্তু নিয়ম বহির্ভূত। আবার নির্বাচন কমিশনের এই মুখ্যসচিবকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও অপ্রত্যাশিত।"

মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব

বদলির বিষয়টাকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার উপরে জোর দেন রাজ্যসভার সাবেক সদস্য জহর সরকার। তার বক্তব্য, "এটা অনেকে হয়ত খেয়াল করেননি, গত এক মাসে রাজ্য সরকারও প্রায় ১০০ জন অফিসারকে বদলি করেছে। এখন নির্বাচন কমিশনও একইভাবে আধিকারিকদের সরিয়ে দিচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।"

তিনি বলেন, "আধিকারিকরাও রক্ত-মাংসের মানুষ এবং তাদেরও ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার রয়েছে। হঠাৎ করে বদলি হওয়ার ফলে তাদের সন্তানদের স্কুল পরিবর্তন বা পড়াশোনার ক্ষতি হয়।"

প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞ সাবেক আমলার মতে, "রাজ্য সরকার বা নির্বাচন কমিশন, যে পক্ষই এটি করুক না কেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং দুর্ভাগ্যজনক। মূলত একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক যুদ্ধের কারণেই এই প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার বলি হচ্ছেন সাধারণ সরকারি আধিকারিকরা।"

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ

ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ