স্মার্টফোন অথবা কম্পিউটারে ভিডিও গেম খেলতে অনেকেই ভালোবাসেন৷ অনেকের গেমের নেশাও হয়ে যায়৷ তবে সেই চাপ পেশাদারী গেমারদের তুলনায় নগণ্য৷ বার্নআউট ও স্ট্রেসের কারণে অনেকেই হাল ছেড়ে দেন৷
একটু আরাম করতে, মানুষজনের সঙ্গে মেলামেশা করতে এবং দৈনন্দিন জীবনের চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত হতে গেমের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে৷ বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সময় নিজেকে যেন চেনাই যায় না৷ তবে বেশিরভাগ মানুষ পেশাদার গেমারদের মতো খেলতে পারেন না৷
তবে ভিডিও গেমের বিষয়টি অন্যরকম৷ এর মাধ্যমে নাম, যশ, অর্থ এবং অসংখ্য অনুরাগী গেমারদের হাতের মুঠোয় চলে আসে৷
এই ই-স্পোর্টস কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে উঠেছে৷ গোটা বিশ্বের তরুণ গেমাররা সাফল্যের স্বপ্ন দেখছেন৷ পেশাদার গেমারদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গড়ে ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সেই অবসর নিতে হয়৷
ই-স্পোর্টসপার্সনদের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক ‘বার্নআউট'-এর সমস্যা বেড়েই চলেছে৷ অথচ সেই সমস্যা নিয়ে যথেষ্ট খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে না৷ ধীরে ধীরে পেশাদার গেমাররা এবার বিষয়টি তুলে ধরে পরিবর্তনের দাবি তুলছেন৷
পেশাদার গেমারদের কথা
07:06
This browser does not support the video element.
যেমন ওলোফ কাইবিয়ার গুস্তাফ্সশোন, যিনি ওলোফমাইস্টার নামেই বেশি পরিচিত৷ গেমিং ফ্যানরা তাকে ভালোভাবে চেনে৷ সুইডিশ বংশোদ্ভূত এই গেমার ২০ বছর বয়স থেকে পেশাদার গেমিং-র ক্ষেত্রে সক্রিয়৷ তিনি এর মধ্যে এক কিংবদন্তি হয়ে উঠেছেন এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘কাউন্টার স্ট্রাইক: গ্লোবাল অফেন্সিভ' গেমার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন৷
২০১৫ সালে তিনি নিজের প্রাক্তন টিমকে বিশ্বসেরার খেতাব পেতে সাহায্য করেছিলেন৷ সবচেয়ে দামী গেমারের খেতাবও পেয়েছিলেন তিনি৷ নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ওলোফ বলেন, ‘‘আমি সারা জীবন গেমিং করেছি৷ একই সঙ্গে প্যাশন বা আবেগ এবং জীবন থেকে এক ধরনের ফাঁকির অনুভূতিও ছিল৷ একেবারে অন্য জগতে ডুব দেবার সুযোগ রয়েছে৷ খেলা ছাড়া অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ভাবতে হয় না৷ সেই অবস্থা সত্যি উপভোগ করেছি৷''
তবে ২০১৬ সালে হাতের কব্জিতে চোটের কারণে তিনি বাস্তব জগত ও গেমিং প্রতিযোগিতার চাপ হাড়ে হাড়ে টের পেলেন৷ ওলোফ বলেন, ‘‘এখন সবকিছু আরো বড় হয়ে উঠেছে৷ আরও বেশি প্রতিযোগিতার ফলে চাপও বেড়ে গেছে৷ করোনা সংকটের আগে বছরে দু'শরও বেশি দিন ভ্রমণ করতে হতো৷ সব সময়ে নিজের শক্তি নিংড়ে নিয়ে খেলে চললে প্রচণ্ড ক্লান্তি আসে৷ তোমার ভুল বিশ্লেষণ করার লোক রয়েছে, সে বিষয়ে সবার নিজস্ব মতামত রয়েছে৷''
১০টি যুগান্তকারী ভিডিও গেম
প্রতিবছর হাজার হাজার নতুন কম্পিউটার গেম বাজারে আসছে৷ কিন্তু ভিডিও গেমের হালহকীকৎ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তাদের সবার নেই৷ ছবিঘরে থাকছে ১০টি সেই ধরনের ‘যুগান্তকারী’ ভিডিও গেম৷
দ্য সিমস: কল্পজগৎ
সিম-রা হলো এক কাল্পনিক জগতের বাসিন্দা৷ তারা ‘সিমলিশ’ ভাষায় কথা বলে ও ‘সিমোলিয়ান’ টাকা দিয়ে জিনিসপত্র কেনে৷ বিভিন্ন চরিত্র সৃষ্টি করে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে সাহায্য করাটাকে চিত্তবিনোদনের সেরা পন্থা বলে মনে করার কোনো কারণ নেই – অথচ এই গেমটাই কিন্তু চিরকালের বেস্টসেলিং কম্পিউটার গেম এবং ফ্যাঞ্চাইজ৷ এ ধরনের গেমকে বলা হয় ‘স্যান্ডবক্স’, যেখানে প্লেয়াররা কচিকাঁচাদের মতো যা প্রাণ চায়, তাই করতে পারেন৷
ছবি: picture-alliance/AP Photo
কাইন্টার-স্ট্রাইক: শুট-’এম-আপ
১৯৯৯ সালে সৃষ্ট গেমটিকে যাবতীয় ‘ফার্স্ট পার্সন শুটার’ (নিজে গুলি চালিয়ে লক্ষ্যভেদ করার) গেমের আদিপুরুষ বলে ধরে নেওয়া হয়ে থাকে৷ ‘পালটা আক্রমণ’ গেমটিতে সন্ত্রাসী আর সন্ত্রাস প্রতিরোধীরা নিজেদের মধ্যে কাজিয়া চালাচ্ছে৷ গেমটি বিপুলভাবে জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও, এই পরিমাণ গুলিগোলা বিশেষ করে স্কুলের ছাত্রদের পক্ষে স্বাস্থ্যকর কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে৷
ছবি: DW/N. Peters
জিটিএ: গ্যাংস্টার গেম হলেও বিবেকহীন নয়
মার্কিন মুলুকের রাস্তায় গাড়ি চুরি, সশস্ত্র ডাকাতি, পলায়ন – এই আগ্রাসী গেমটির একাধিক সংস্করণ শুধুমাত্র ‘প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য’৷ জিটিএ কথাটি হলো ‘গ্র্যান্ড থেফ্ট অটো’ বা ‘গাড়ি চুরি’ কথাগুলির আদ্যক্ষর৷ ফ্যানরা বলেন, জিটিএ শুধু সহিংসতা নিয়ে নয়: ‘অ্যামেরিকান ড্রিম’ ব্যর্থ হবার পর মানুষজন কীভাবে ছিঁচকে চুরি থেকে গ্যাংস্টারবৃত্তির দিকে যায়, সেটাই হলো এই গেমের অন্তর্নিহিত বাণী৷
ছবি: Getty Images/C. Gillon
প্যাক-ম্যান: আর্কেড মানেই প্যাক-ম্যান
গোল মাথা আর বিরাট হাঁ সম্পন্ন এই লোভী দানবটির জন্ম জাপানে, ১৯৮০ সালে৷ গেমটির লক্ষ্য হলো রঙিন ভূতগুলোর হাত থেকে বেঁচে যতগুলো সম্ভব পয়েন্ট গলার্ধ করা৷ প্যাক-ম্যানের নেশা হয়ে যেতে বেশি সময় লাগে না – বলেন ভুক্তভোগীরা৷ সেক্ষেত্রে আর্কেডে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পন্থা আছে কি?
ছবি: Imago/M. Eichhammer
সুপার মারিও: নিন্টেন্ডোর ম্যাস্কট
নীল ডুঙ্গারি, লাল টুপি আর পুরু মোচধারী এই খুদে ইট্যালিয়ানটি সম্ভবত ভিডিও গেমের ইতিহাসে সর্বাধিক পরিচিত চরিত্র৷ পেশায় পানির মিস্ত্রি মারিও ও তার বন্ধু লুইজি হল ‘প্ল্যাটফর্ম’ ভিডিও গেমের পথিকৃৎ – যেখানে চরিত্রগুলি একটা ধাপ থেকে আরেকটা ধাপে লাফঝাঁপ দিয়ে গিয়ে পয়েন্ট সংগ্রহ করে ও বিপদের হাত থেকে বাঁচে৷
ছবি: picture-alliance/AP Photo/Nintendo
পোকেমন গো: ‘বর্ধিত বাস্তব’
‘পোকেমন গো’ (২০১৬) গেমেই প্রথম অকুস্থল ভিত্তিক ‘বর্ধিত বাস্তব’ (‘অগমেন্টেড রিয়্যালিটি’) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় – অর্থাৎ গেমের ডিজিটাল উপাদানগুলি যেন গেমারের বাস্তব পরিস্থিতির অঙ্গ হয়ে পড়ে৷ নিখর্চার অ্যাপটি প্রথম বছরেই ডাউনলোড করা হয় ৫০ কোটি বার৷ সমালোচকরা বলেন: পথেঘাটে পোকেমন সন্ধানীরা একটা নুইস্যান্স; গুণমুগ্ধরা বলেন: গেমটি কচিকাঁচাদের সোফায় না বসে থেকে, বাইরে যাওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছে৷
ছবি: picture-alliance/dpa/P. Steffen
মাইনক্র্যাফ্ট: অনন্ত সম্ভাবনা
এটি সম্ভবত সেরা ‘ওপেন ওয়ার্ল্ড’ গেম, যেখানে খেলোয়াড়রা একটি ভার্চুয়াল দুনিয়ায় যথেচ্ছ বিচরণ করতে পারেন, লিনিয়ার গেমগুলিতে যা করার উপায় নেই৷ ইউজাররা খনি থেকে নানা ধরনের ব্লক তুলে তাই দিয়ে একটি অনন্ত ত্রৈমাত্রিক দৃশ্যপটে যত খুশি বাড়ি বানাতে পারেন৷ এতোটা স্বাধীনতা যাদের ভালো লাগে না, তাদের জন্য নির্দিষ্ট কাজেরও ব্যবস্থা আছে৷
ছবি: Mojang/Sebastian Radtke
টেট্রিস: একটি সোভিয়েত ক্ল্যাসিক
আশির দশকে এই গেমটির জন্ম: নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্লকগুলিকে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে সাজাতে হয়৷ ১৯৮৪ সালে এক তরুণ সোভিয়েত ইঞ্জিনিয়ার গেমটি সৃষ্টি করেন – যা আর্কেড থেকে শুরু করে হোম কম্পিউটারে ছড়াতে বেশি সময় লাগেনি৷ তবে গেমটি ‘অস্কার’ জেতে, যখন নিন্টেন্ডো তাদের হাতে-ধরা গেম বয় কনসোলের প্রথম গেমগুলির মধ্যে টেট্রিসকেও রাখে৷
ছবি: picture-alliance/AP Photo/R. Drew
ফিফা: সব খেলার রাজা ফুটবল
১৯৯৩ সাল থেকে প্রতিবছর ‘ফিফা’ গেমটির একটি নতুন সংস্করণ বাজারে আসছে, প্রতিবারেই আরো কিছুটা বাস্তবধর্মী, যার ফলে তথাকথিত ‘স্পোর্ট সিমিউলেশম গেমিং’-এ ‘ফিফা’-কে হারানোর ক্ষমতা কারো নেই৷ আর থাকবেই বা কী করে: ‘ফিফা’-র তারকারাও যে ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো আর লিওনেল মেসির মতো পাঁচতারা!
ছবি: dapd
অ্যাংরি বার্ডস: ‘রাগী পাখি’ ধরার খেলা
এই ‘ফ্রিমিয়াম’ (অর্থাৎ প্রিমিয়াম দিয়ে কেনা গেমগুলোর ঠিক উল্টো) গেমটি যতবার ডাউনলোড করা হয়েছে, গেমিং-এর ইতিহাসে অন্য কোনো গেম তার ধারেকাছে পৌঁছাতে পারেনি৷ মোবাইল অ্যাপটির সাফল্য থেকেই একটি টিভি সিরিজ ও একটি ফিচার ফিল্ম জন্ম নেয়৷ ওদিকে এনএসএ-র হুইসলব্লোয়ার এডোয়ার্ড স্নোডেন ফাঁস করে দেন যে, সরকারি নিরাপত্তা সেবা গেমটির ইউজারদের ডাটা সংগ্রহ করতে পারে – ফলে ইউজাররা নিজেরাই এবার অ্যাংরি বার্ডস!
ছবি: picture-alliance/dpa
10 ছবি1 | 10
২০১৭ সালে ব্যক্তিগত কারণে তিনি কিছু সময়ের জন্য বিরতি নিয়েছিলেন৷ সেই সময়কার সমস্যা সম্পর্কে ওলোফ বলেন, ‘‘আমার আর ঠিকমতো ঘুম হতো না৷ সারাদিন শুধু গেমের কখা ভাবতাম৷ প্রতিদিন অবিরাম স্ট্রেস অনুভব করতাম৷''
তারপর সেই ধাক্কা কাটিয়ে তিনি আবার আসরে ফিরে এলেন৷ কিন্তু ২০২০ সালের মে মাসে ওলোফ তাঁর ফ্যানদের হতবাক করে দিলেন৷ এক টুইট বার্তায় তিনি জানালেন, ক্লান্তি, মানসিক চাপ ও প্রেরণার অভাবের কারণে তিনি পেশাদার গেমিং থেকে দীর্ঘ বিরতি নিচ্ছেন৷ ওলোফ বলেন, ‘‘কোনো টিম দিনে আট ঘণ্টা ধরে গেমিং করছে এবং তোমার থেকে ভালো খেলছে, এমনটা মেনে নেওয়া কঠিন৷ তখন তাদের হারাতে দিনে নয় ঘণ্টা ধরে খেলার গোঁ চাপে৷ প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা অনুশীলন ও পাঁচ ঘণ্টা নিজস্ব ট্রেনিংয়ের পরিণতি মোটেই ভালো হতে পারে না৷''
করোনা সংকটের কারণে সারাদিন অনুশীলনের চাপ আরো বেড়ে গেছে৷ বার্নআউট ও স্ট্রেসের কারণে একাধিক সেরা গেমার চলতি বছর পেশাদার জীবন থেকে বিরতির ঘোষণা করেছেন৷