1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

সিফাতকে সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন

৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে সিফাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার আইনগত দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি৷ প্রতীকী ছবি৷
[প্রতীকী ছবি] ফেসবুক ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করায় সিফাত আব্দুল্লাহ নামে এক তরুণকে আটকের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ৷ছবি: Wavebreak Media LTD/IMAGO

প্রশ্ন উঠেছে সন্ত্রাস দমন আইন এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের ব্যবহার নিয়েও৷

ফেসবুক ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করায় সিফাত আব্দুল্লাহ নামে এক তরুণকে আটকের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ ৷ গত জুন মাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি ঝটিকা মিছিলের পর ওই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল৷

মামলার বাদী হলেন দেলোয়ার হোসেন নামে পুলিশের একজন সাব-ইন্সপেক্টর৷ মামলাটি দায়ের করা হয় গত ২৭ জুন৷ মামলা নম্বর-৫৩৷ আর বৃহস্পতিবার রাতে আটক সিফাতকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানান গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গাছা থানার ডিউটি অফিসার৷ ওই মামলাটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৮, ৯(৩) ১০, ১১ ও ১২ ধারায় করা হয়েছিল৷

আটকের সময় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে, তিনি তার বাসায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার দাবি তুলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ সরকারের বিরুদ্ধে কটূক্তি করে ভিডিও প্রকাশ করেন৷ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুরের গাছা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ সিফাত রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্র বলে জানা গেছে৷

পুলিশ জানায়, সিফাত আব্দুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য ও লেখালেখি করতো বলে অভিযোগ রয়েছে৷ সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তিনি এক মিনিট ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেন৷ ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী ও সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়াও তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে কটূক্তি করেন৷ ভিডিওতে সিফাত দাবি করেন, চলতি মাসে তার বাসায় চার হাজার টাকা এবং আগের মাসে পাঁচ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে৷ তিনি বিলের পরিমাণকে অতিরিক্ত দাবি করেন৷ এসময় তার হাতে বিদ্যুৎ বিলের দু'টি কাগজও দেখা যায়৷

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা বিষয়টি গাছা থানা পুলিশকে জানায়৷ এরপর বৃহস্পতিবার রাতেই পুলিশ সিফাতকে আটক করে৷

‘ফ্যাসিস্টদের একাধিক ঝটিকা মিছিলে সে অংশ নিয়েছে'

গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী ডয়চে ভেলেকে জানান, সিফাতের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা হয়নি৷ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পুরনো একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে৷ ওই মামলায় তিনি আসামি না হলেও তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে৷

তার দাবি, ‘‘আটকের পর প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে সে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করে আসছে৷ এই এলাকায় ফ্যাসিস্টদের একাধিক ঝটিকা মিছিলেও সে অংশ নিয়েছে৷ সেই কারণেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে৷''

প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে মামলা হয়েছে কী না জানতে চাইলে রব্বানী বলেন, ‘‘সেটাও দেখছি, তবে সেটা দ্বিতীয় পর্যায়ে৷ তদন্ত করে পরে এনিয়ে মামলা হতে পারে৷ তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ যে ফ্যাসিস্টদের হয়ে কাজ করছেন৷''

‘‘আমরা তাকে বৃহস্পতিবার রাতে আটকের পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি,'' বলেন গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী৷

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেয়া উচিত?

06:07

This browser does not support the video element.

তিনি এপর্যন্ত ‘ফ্যাসিস্টদের' কতগুলো ঝটিকা মিছিলে অংশ নিয়েছেন, কোনো ছবি পাওয়া গেছে কী না- এমন প্রশ্নের জবাবে রব্বানী বলেন, ‘‘আমরা প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছি৷ এখন তদন্ত করে প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে৷''

তার মুক্তির দাবীতে স্থানীয় এনসিপি নেতা-কর্মীদের বৃহস্পতিবার রাতে থানায় অবস্থানের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘‘তারা দাবি করেছিল সিফাত জুলাই যোদ্ধা৷ পরে আমাদের সঙ্গে কথা বলে তারা চলে যায়৷''

ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাছা থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘জুন মাসের ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ১০-১২ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হলেও সিফাত এজাহারভুক্ত আসামি নয়৷ তবে মামলায় ৫০-৬০ জন অজ্ঞাত আসামি আছে৷ সিফাতকে সন্দেহজনকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে৷ কারণ সে ফেসবুকে উৎকানিমূলক লেখালেখি করত৷ তদন্তে এখন দেখা যাবে যে ওই ঘটনায় জড়িত কী না৷''

২৭ জুনের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘ওইদিন রাতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের লোকজন গাছা এলাকায় চোরাগুপ্ত হামলা চালায়, মশাল মিছিল বের করে৷''

তবে সিফাতের মামা মো. জিলানি বলেন, ‘‘সিফাত আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত নয়৷ সে জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়৷ তার বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্টদের মিছিলে থাকার যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সত্য নয়৷''

‘‘আমরা আদালতে তার জামিন আবেদনেরও সুযোগ পাইনি৷ মামলার ব্যাপারেও আমাদের ঠিকমতো তথ্য দেয়া হয়নি,'' বলেন তিনি৷

জিলানি জানান, ‘‘সিফাতরা দুই ভাই বোন৷ তার বাবা দেশের বাইরে থাকেন৷ সেখানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ৷ তার ওয়ার্ক পারমিটও শেষ হয়ে গেছে৷ ফলে সিফাত মানসিক চাপে আছে৷ এরমধ্যে বিদ্যুতের বাড়তি বিল তাকে চাপের মুখে ফেলেছে৷ আমরা মনে করি সে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করে অন্যায় করেছে৷ এজন্য আমরা তাকে পারিবারিকভাবে শাসনও করেছি৷ আমরা ন্যায়বিচার চাই৷''

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, ২০০৯ সালের সন্ত্রাস দমন আইনটি ২০১৩ সালে সংশোধন করা হয়৷ আইনটি মূলত নিষিদ্ধ সংগঠনের ব্যাপারে করা হয়েছিল৷ আর এই আইনে সাক্ষ্য হিসাবে ডিজিটাল এভিডেন্স গ্রহণযোগ্য৷

তিনি বলেন, ‘‘সিফাতকে সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেপ্তার দেখানো কোনোভাবেই ঠিক হয়নি৷ আর এই মামলাটি আগের৷ ফলে এখানে প্রশ্ন থেকেই যায়৷ তার যে অপরাধ তাতে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হতে পারে৷ কিন্তু দন্ডবিধিতে মানহানির মামলা, যার মানহানি হয়েছে তাকেই করতে হয়৷''

‘‘উচিত ছিলো সে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে যে অভিযোগ করেছে তার তদন্ত করা৷ কিন্তু পুলিশ করলো উল্টোটা,'' বলেন ইশরাত হাসান৷

আওয়ামী লীগ কি ক্ষমা চাইবে?

14:34

This browser does not support the video element.

সাইবার সুরক্ষা আইনের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তি করায় গত ৫ আগস্ট এনসিপি নেতা গাজী সালাহউদ্দিন তানভীরকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ ২৯ জুলাই ফেসবুকে আপত্তিকর ও উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে ২ আগস্ট বগুড়া সদর থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়৷ মামলাটি করেন বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেল৷ তাকে গ্রেপ্তার করার আগেই ৩১ জুলাই ফেসবুকের পোস্টের কারণে এনসিপি থেকে তাকে বহিস্কার করা হয়৷

সালাহউদ্দিন তানভীরের চাচা এ কে এম আহসানুল তৈয়ব জাকির বলেন, ‘‘যতদূর জানি সে এখনো কারাগারে আছে৷ এর বেশি কিছু আমি জানি না৷ তারা জামিনের চেষ্টা হচ্ছে কী না তাও জানি না৷'' আহসানুল তৈয়ব বিএনপি নেতা এবং বগুড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক৷

বগুড়া সদর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মাহফুজ আলম জানান, ‘‘মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে৷ আমরা ডিজিটাল ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছি৷ প্রতিবেদন পেলেই চার্জশিট দিয়ে দেব৷''

ফেসবুকে আপত্তিকর বক্তব্য দেয়ার অপরাধ সাইবার সুরক্ষা আইনের অধীনে আছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এ বিষয়ে আপনাকে আমি কিছু বলব না৷''

আইনজীবী ইশরাত হাসান জানান, ‘‘নতুন সাইবার সুরক্ষা আইনে ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটূক্তি বা মানহানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই৷ সেটা আগের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে ছিল৷ এখন নেই৷''

সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৪, ২৫ ও ২৫ ধারায় এসংক্রান্ত বিধানে নারীদের ব্ল্যাকমেইল, যৌন হয়রানি, ছবি ব্যবহার ও বিকৃত করে হয়রানিসহ নারীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের অপরাধের কথা বলা আছে৷ আর ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষের কথাও বলা আছে৷

ইশরাত হাসান বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানহানিকর পোস্টের কারণে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলার সুযোগ নেই৷ দন্ডবিধিতে মানহানির মামলা হতে পারে৷ আর সাইবার সুরক্ষা আইন তো বিএনপি সরকারই সংসদে পাস করেছে৷''

২০২৫ সালের নভেম্বরে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মানহানিকর বক্তব্যের কারণে সাইবার সুরক্ষা আইনে কনটেন্ট ক্রিয়েটর শাহীন মাহমুদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়৷ ঢাকার সাইবার আদালতে মামলাটি করেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতা ইলতুতমিশ৷ তারেক রহমান তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন৷

এছাড়াও গত জুন মাসে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে জড়িয়ে মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগে চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হয়৷ মামলাটি করেন বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি তানভীর আলম৷ ওই মামলায় স্থানীয় দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ পরে অবশ্য তিনি জামিনে ছাড়া পান৷

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘‘আসলে সন্ত্রাস দমন আইনটি অতীতের মতো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে৷ গাজীপুরের সিফাতকে এই আইনের পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কোনো ভালো কাজ করা হয়নি৷ হতে পারে অতি উৎসাহী পুলিশ এটা করলেও এতে তো সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়৷''

আর ইশরাত হাসান বলেন, ‘‘সাইবার সুরক্ষা আইনসহ সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত আইনগুলো, সন্ত্রাসবিরেধী আইন, রাষ্ট্রদ্রোহ আইন যারা ক্ষমতায় থাকে তারা তাদের স্বার্থে অতীতেও ব্যবহার করেছে৷ এখনো করা হচ্ছে৷''

গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: পরিবর্তন কতদূর?

11:46

This browser does not support the video element.

স্কিপ নেক্সট সেকশন এই বিষয়ে আরো তথ্য

এই বিষয়ে আরো তথ্য

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ

ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ