সিফাতকে সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রশ্ন উঠেছে সন্ত্রাস দমন আইন এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের ব্যবহার নিয়েও৷
ফেসবুক ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করায় সিফাত আব্দুল্লাহ নামে এক তরুণকে আটকের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ ৷ গত জুন মাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি ঝটিকা মিছিলের পর ওই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল৷
মামলার বাদী হলেন দেলোয়ার হোসেন নামে পুলিশের একজন সাব-ইন্সপেক্টর৷ মামলাটি দায়ের করা হয় গত ২৭ জুন৷ মামলা নম্বর-৫৩৷ আর বৃহস্পতিবার রাতে আটক সিফাতকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানান গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গাছা থানার ডিউটি অফিসার৷ ওই মামলাটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৮, ৯(৩) ১০, ১১ ও ১২ ধারায় করা হয়েছিল৷
আটকের সময় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে, তিনি তার বাসায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার দাবি তুলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ সরকারের বিরুদ্ধে কটূক্তি করে ভিডিও প্রকাশ করেন৷ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুরের গাছা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ সিফাত রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্র বলে জানা গেছে৷
পুলিশ জানায়, সিফাত আব্দুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য ও লেখালেখি করতো বলে অভিযোগ রয়েছে৷ সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তিনি এক মিনিট ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেন৷ ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী ও সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়াও তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে কটূক্তি করেন৷ ভিডিওতে সিফাত দাবি করেন, চলতি মাসে তার বাসায় চার হাজার টাকা এবং আগের মাসে পাঁচ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে৷ তিনি বিলের পরিমাণকে অতিরিক্ত দাবি করেন৷ এসময় তার হাতে বিদ্যুৎ বিলের দু'টি কাগজও দেখা যায়৷
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা বিষয়টি গাছা থানা পুলিশকে জানায়৷ এরপর বৃহস্পতিবার রাতেই পুলিশ সিফাতকে আটক করে৷
‘ফ্যাসিস্টদের একাধিক ঝটিকা মিছিলে সে অংশ নিয়েছে'
গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী ডয়চে ভেলেকে জানান, সিফাতের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা হয়নি৷ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পুরনো একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে৷ ওই মামলায় তিনি আসামি না হলেও তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে৷
তার দাবি, ‘‘আটকের পর প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে সে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করে আসছে৷ এই এলাকায় ফ্যাসিস্টদের একাধিক ঝটিকা মিছিলেও সে অংশ নিয়েছে৷ সেই কারণেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে৷''
প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে মামলা হয়েছে কী না জানতে চাইলে রব্বানী বলেন, ‘‘সেটাও দেখছি, তবে সেটা দ্বিতীয় পর্যায়ে৷ তদন্ত করে পরে এনিয়ে মামলা হতে পারে৷ তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ যে ফ্যাসিস্টদের হয়ে কাজ করছেন৷''
‘‘আমরা তাকে বৃহস্পতিবার রাতে আটকের পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি,'' বলেন গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী৷
তিনি এপর্যন্ত ‘ফ্যাসিস্টদের' কতগুলো ঝটিকা মিছিলে অংশ নিয়েছেন, কোনো ছবি পাওয়া গেছে কী না- এমন প্রশ্নের জবাবে রব্বানী বলেন, ‘‘আমরা প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছি৷ এখন তদন্ত করে প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে৷''
তার মুক্তির দাবীতে স্থানীয় এনসিপি নেতা-কর্মীদের বৃহস্পতিবার রাতে থানায় অবস্থানের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘‘তারা দাবি করেছিল সিফাত জুলাই যোদ্ধা৷ পরে আমাদের সঙ্গে কথা বলে তারা চলে যায়৷''
ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাছা থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘জুন মাসের ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ১০-১২ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হলেও সিফাত এজাহারভুক্ত আসামি নয়৷ তবে মামলায় ৫০-৬০ জন অজ্ঞাত আসামি আছে৷ সিফাতকে সন্দেহজনকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে৷ কারণ সে ফেসবুকে উৎকানিমূলক লেখালেখি করত৷ তদন্তে এখন দেখা যাবে যে ওই ঘটনায় জড়িত কী না৷''
২৭ জুনের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘ওইদিন রাতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের লোকজন গাছা এলাকায় চোরাগুপ্ত হামলা চালায়, মশাল মিছিল বের করে৷''
তবে সিফাতের মামা মো. জিলানি বলেন, ‘‘সিফাত আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত নয়৷ সে জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়৷ তার বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্টদের মিছিলে থাকার যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সত্য নয়৷''
‘‘আমরা আদালতে তার জামিন আবেদনেরও সুযোগ পাইনি৷ মামলার ব্যাপারেও আমাদের ঠিকমতো তথ্য দেয়া হয়নি,'' বলেন তিনি৷
জিলানি জানান, ‘‘সিফাতরা দুই ভাই বোন৷ তার বাবা দেশের বাইরে থাকেন৷ সেখানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ৷ তার ওয়ার্ক পারমিটও শেষ হয়ে গেছে৷ ফলে সিফাত মানসিক চাপে আছে৷ এরমধ্যে বিদ্যুতের বাড়তি বিল তাকে চাপের মুখে ফেলেছে৷ আমরা মনে করি সে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করে অন্যায় করেছে৷ এজন্য আমরা তাকে পারিবারিকভাবে শাসনও করেছি৷ আমরা ন্যায়বিচার চাই৷''
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, ২০০৯ সালের সন্ত্রাস দমন আইনটি ২০১৩ সালে সংশোধন করা হয়৷ আইনটি মূলত নিষিদ্ধ সংগঠনের ব্যাপারে করা হয়েছিল৷ আর এই আইনে সাক্ষ্য হিসাবে ডিজিটাল এভিডেন্স গ্রহণযোগ্য৷
তিনি বলেন, ‘‘সিফাতকে সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেপ্তার দেখানো কোনোভাবেই ঠিক হয়নি৷ আর এই মামলাটি আগের৷ ফলে এখানে প্রশ্ন থেকেই যায়৷ তার যে অপরাধ তাতে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হতে পারে৷ কিন্তু দন্ডবিধিতে মানহানির মামলা, যার মানহানি হয়েছে তাকেই করতে হয়৷''
‘‘উচিত ছিলো সে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে যে অভিযোগ করেছে তার তদন্ত করা৷ কিন্তু পুলিশ করলো উল্টোটা,'' বলেন ইশরাত হাসান৷
সাইবার সুরক্ষা আইনের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তি করায় গত ৫ আগস্ট এনসিপি নেতা গাজী সালাহউদ্দিন তানভীরকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ ২৯ জুলাই ফেসবুকে আপত্তিকর ও উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে ২ আগস্ট বগুড়া সদর থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়৷ মামলাটি করেন বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেল৷ তাকে গ্রেপ্তার করার আগেই ৩১ জুলাই ফেসবুকের পোস্টের কারণে এনসিপি থেকে তাকে বহিস্কার করা হয়৷
সালাহউদ্দিন তানভীরের চাচা এ কে এম আহসানুল তৈয়ব জাকির বলেন, ‘‘যতদূর জানি সে এখনো কারাগারে আছে৷ এর বেশি কিছু আমি জানি না৷ তারা জামিনের চেষ্টা হচ্ছে কী না তাও জানি না৷'' আহসানুল তৈয়ব বিএনপি নেতা এবং বগুড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক৷
বগুড়া সদর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মাহফুজ আলম জানান, ‘‘মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে৷ আমরা ডিজিটাল ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছি৷ প্রতিবেদন পেলেই চার্জশিট দিয়ে দেব৷''
ফেসবুকে আপত্তিকর বক্তব্য দেয়ার অপরাধ সাইবার সুরক্ষা আইনের অধীনে আছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এ বিষয়ে আপনাকে আমি কিছু বলব না৷''
আইনজীবী ইশরাত হাসান জানান, ‘‘নতুন সাইবার সুরক্ষা আইনে ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটূক্তি বা মানহানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই৷ সেটা আগের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে ছিল৷ এখন নেই৷''
সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৪, ২৫ ও ২৫ ধারায় এসংক্রান্ত বিধানে নারীদের ব্ল্যাকমেইল, যৌন হয়রানি, ছবি ব্যবহার ও বিকৃত করে হয়রানিসহ নারীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের অপরাধের কথা বলা আছে৷ আর ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষের কথাও বলা আছে৷
ইশরাত হাসান বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানহানিকর পোস্টের কারণে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলার সুযোগ নেই৷ দন্ডবিধিতে মানহানির মামলা হতে পারে৷ আর সাইবার সুরক্ষা আইন তো বিএনপি সরকারই সংসদে পাস করেছে৷''
২০২৫ সালের নভেম্বরে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মানহানিকর বক্তব্যের কারণে সাইবার সুরক্ষা আইনে কনটেন্ট ক্রিয়েটর শাহীন মাহমুদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়৷ ঢাকার সাইবার আদালতে মামলাটি করেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতা ইলতুতমিশ৷ তারেক রহমান তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন৷
এছাড়াও গত জুন মাসে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে জড়িয়ে মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগে চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হয়৷ মামলাটি করেন বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি তানভীর আলম৷ ওই মামলায় স্থানীয় দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ পরে অবশ্য তিনি জামিনে ছাড়া পান৷
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘‘আসলে সন্ত্রাস দমন আইনটি অতীতের মতো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে৷ গাজীপুরের সিফাতকে এই আইনের পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কোনো ভালো কাজ করা হয়নি৷ হতে পারে অতি উৎসাহী পুলিশ এটা করলেও এতে তো সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়৷''
আর ইশরাত হাসান বলেন, ‘‘সাইবার সুরক্ষা আইনসহ সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত আইনগুলো, সন্ত্রাসবিরেধী আইন, রাষ্ট্রদ্রোহ আইন যারা ক্ষমতায় থাকে তারা তাদের স্বার্থে অতীতেও ব্যবহার করেছে৷ এখনো করা হচ্ছে৷''