নরেন্দ্র মোদীর প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর ব্যস্ত কর্মসূচিতে ঠাসা৷ ২৭শে সেপ্টেম্বর তিনি বক্তব্য রাখবেন জাতিসংঘে৷ ৩০ তারিখ মিলিত হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে, যাতে থাকবে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যু৷
বিজ্ঞাপন
নতুন দিল্লির রাজনৈতিক মহলের ধারণা, ২০০২ সালের গুজরাট সাম্প্রদয়িক দাঙ্গায় নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে যে মোদীকে একসময় ভিসা দিতে অস্বীকার করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেই ওবামা প্রশাসন আজ প্রধানমন্ত্রী মোদীকে লাল কার্পেট বিছিয়ে স্বাগত জানাতে তৈরি৷
২৭শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী মোদী ‘নতুন ভারতের' বক্তব্য তুলে ধরবেন জাতিসংঘে সাধারণ সভায়৷ পার্শ্ব বৈঠকে মিলিত হবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ্রা রাজাপাকসের সঙ্গে৷ প্রসঙ্গত, মোদী-হাসিনা বৈঠকের আলোচ্যসূচি তৈরি করতে সম্প্রতি নতুন দিল্লিতে এসেছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলি৷ প্রধানমন্ত্রী মোদী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি জানিয়ে গেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের সঙ্গে মৌলবাদী জামাতের যোগাযোগ রয়েছে৷ আর তার ফলে বহু মৌলবাদী জঙ্গি সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে গা ঢাকা দিয়ে আছে৷ এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের একটি বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার টাকাও নাকি চোরাপথে যাচ্ছে জামাতের হাতে, যা দু'দেশেরই উদ্বেগের বিষয়৷ মোদীর কর্মসূচিতে অবশ্য আপাতত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকের কোনো সম্ভাবনা নেই৷
৩০শে সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে প্রধানমন্ত্রী মোদী বৈঠকে বসবেন প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে৷ যে সব দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, তাতে মোদী তাঁর রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিচক্ষণতার কতটা প্রমাণ দিতে পারবেন, সেদিকে তাকিয়ে আছে গোটা দেশ৷ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হলেও তার কেন্দ্রবিন্দু থাকছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ৷ তারপর আছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যার মধ্যে আছে ভারতে জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্রসহ উচ্চ-প্রযুক্তি সম্পন্ন প্রতিরক্ষা সমরাস্ত্র৷ এছাড়া আছে সন্ত্রাস-বিরোধী ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, এনার্জি, মেধাস্বত্ত্ব, সাইবার রক্ষাকবচ, স্বাস্থ্য ও অভিবাসন৷
এর আগে ২৮শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে এক মিলন মেলায় যোগ দেবেন মোদী৷ অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় মিলিত হবেন যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-মার্কিন প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে৷ এঁদের অনেকেই শিল্প, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে নাম কিনেছেন৷ ঐ মিলন মেলায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভিড় হবে বলে মনে করছেন উদ্যক্তারা৷ ইতিমধ্যেই ১৮ হাজার টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে, যার মোট অর্থমূল্য ১৬ লাখ ডলার৷
একজন নরেন্দ্র মোদী
উগ্র সাম্প্রদায়িক আদর্শ এবং বিভাজনের রাজনীতির কারণে ভারতের বহু মানুষের কাছে তিনি খলনায়ক৷ ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নিজেকে নতুন মোড়কে সামনে এনে সেই নরেন্দ্র মোদীই শোনাচ্ছেন ভারতকে বদলে দেয়ার মন্ত্র৷
ছবি: dapd
চা ওয়ালা
১৯৫০ সালে গুজরাটের নিম্নবিত্ত এক ঘাঞ্চি পরিবারে জন্ম নেয়া নরেন্দ্র মোদী কৈশরে বাবাকে সাহায্য করতে রেল ক্যান্টিনে চা বিক্রি করেছেন৷ ঘাঞ্চি সম্প্রদায়ের রীতি অনুযায়ী ১৭ বছর বয়সে যশোদাবেন নামের এক বালিকার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়, যদিও বেশিদিন সংসার করা হয়নি৷ ছাত্র হিসেবে সাদামাটা হলেও মোদী বিতর্কে ছিলেন ওস্তাদ৷ ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস-এর প্রচারক হিসাবে রাজনীতির দরজায় পা রাখেন মোদী৷
ছবি: UNI
গুজরাটের গদিধারী
১৯৮৫ সালে আরএসএস থেকে বিজেপিতে যোগ দেয়ার ১০ বছরের মাথায় দলের ন্যাশনাল সেক্রেটারির দায়িত্ব পান ১৯৯৫ সালে গুজরাটের নির্বাচনে চমক দেখানো মোদী৷ ১৯৯৮ সালে নেন দলের জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব৷ ২০০১ সালে কেশুভাই প্যাটেলের স্বাস্থ্যের অবনতি হলে দলের মনোনয়নে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে আবির্ভূত হন নরেন্দ্র মোদী, যে দায়িত্ব তিনি এখনো পালন করে চলেছেন৷
ছবি: Reuters
দাঙ্গার কালিমা
মোদীকে নিয়ে আলোচনায় ২০০২ সালের দাঙ্গার প্রসঙ্গ আসে অবধারিতভাবে৷ স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে ভয়াবহ সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গুজরাটে প্রায় ১২০০ মানুষ নিহত হন৷ মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েও তিনি দাঙ্গায় উসকানি দেন৷ তিনি এ অভিযোগ স্বীকার করেননি, আদালতও তাঁকে রেহাই দিয়েছে৷ তবে দাঙ্গার পক্ষে কার্যত সাফাই গেয়ে, হিন্দুত্ববাদের গান শুনিয়েই তিন দফা নির্বাচনে জয় পান মোদী৷
ছবি: AP
রূপান্তর
দাঙ্গার পর নিজের ভাবমূর্তি ফেরানোর উদ্যোগ নেন নরেন্দ্র মোদী৷ একজন বিতর্কিত নেতার বদলে উন্নয়নের কাণ্ডারি হিসাবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিতে শুরু হয় ‘গুজরাট মডেল’-এর প্রচার৷ ২০০৭ সালের পর নিজেকে একজন সর্বভারতীয় নেতা হিসাবে তুলে ধরতে নতুন প্রচার শুরু করেন এই বিজেপি নেতা, প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্র্যান্ড মোদী’৷গুজরাটের উন্নয়নের চিত্র দেখিয়ে কলঙ্কিত ভাবমূর্তিকে তিনি পরিণত করেন ভারতের ত্রাতার চেহারায়৷
ছবি: UNI
ভারতের পথে পথে
ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌঁড়ে নরেন্দ্র মোদী পাড়ি দিয়েছেন তিন লাখ কিলোমিটার পথ৷ সারা ভারতে পাঁচ হাজার ৮২৭টি জনসভায় তিনি অংশ নিয়েছেন, নয় মাসে মুখোমুখি হয়েছেন পাঁচ কোটি মানুষের৷ কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা হিসাবে শুরু করলেও এবার তিনি হিন্দুত্ব নিয়ে প্রচার এড়িয়ে গেছেন সচেতনভাবে, যদিও বাংলাদেশের মানুষ, ভূখণ্ড এবং ধর্ম নিয়ে নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপি নেতাদের বক্তব্য নতুন সমালোচনার জন্ম দিয়েছে৷
ছবি: AP
নতুন ইতিহাস
ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটই যে এবার ভারতে সরকারগঠন করতে যাচ্ছে, বুথফেরত জরিপ থেকে তা আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল৷ ৬৩ বছর বয়সি মোদীর নেতৃত্বে এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি৷ ৭ই এপ্রিল থেকে ১২ই মে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৮১ কোটি ৪০ লাখ৷ তাঁদের মধ্যে রেকর্ড ৬৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোট দিয়েছেন৷
ছবি: picture-alliance/dpa
শেষ হাসি
নির্বাচনে বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল – মোদী প্রধানমন্ত্রী হলে দেশের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে, গুজরাটের আদলে তিনি ভারতকে বদলে দেবেন৷ অবশ্য সমালোচকরা বলছেন, ‘কলঙ্কিত ভাবমূর্তি’ ঢাকতে এসব মোদীর ফাঁপা বুলি৷ তাঁর স্বৈরাচারী মেজাজ, শিক্ষা ও অর্থনীতির জ্ঞান নিয়েও ঠাট্টা-বিদ্রুপ হয়েছে৷ বলা হচ্ছে, ভোটাররা টানা তৃতীয়বার কংগ্রেসকে চায়নি বলেই বিজেপি জয় পেয়েছে৷ যদিও শেষ হাসি দেখা যাচ্ছে নরেন্দ্র মোদীর মুখেই৷
ছবি: dapd
7 ছবি1 | 7
সামান্য চা-ওয়ালা থেকে স্বনির্ভর হয়ে কিভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতায় ১২৫ কোটির দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন, সেই মোদীকে সামনে থেকে দেখার আগ্রহ সবার৷ তাই এদিন মোদী তাঁর চিরাচরিত হাফ হাতা কুর্তা, যা ‘মোদী কুর্তা' নামে পরিচিত, সেটা ছেড়ে বিশেষ ফ্যাশান দুরস্ত পোষাক পরবেন বলে ডেকে পাঠিয়েছেন মুম্বই-এর নাম করা ফ্যাশান ডিজাইনারদের৷ ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের পরা সেই একই ধরণের কুঁচকানো সুতির জামা-কাপড়, ভারতের অনাড়ম্বর জীবনযাপনের পরিচিত ছবিটা কি মোদী এবার তাহলে পাল্টাতে চান?
পাশাপাশি এ সময় হিন্দু দেবী দূর্গার আগমন উপলক্ষ্যে উদযাপিত ‘নবরাত্রি'-তে বহু ভক্তের মতো উপবাস পালন করেন হিন্দু জাতীয়তাবাদী এই নেতা৷ শোনা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে শত ব্যস্ত কর্মসূচি থাকলেও নিরামিষ খাবারও মুখে তুলবেন না মোদী৷ তাই তাঁর জন্য থাকছে ভিটামিনযুক্ত তরল লেমোনেড ও চা৷ আর রাষ্ট্রীয় ভোজ সভায় ‘চর্ব চোষ্য লেহ্য পেয়' না খেয়ে খাবেন শুধু ফলের রস৷