1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

প্রয়াণকথা স্মরণকথা : কবি দাউদ হায়দার

সরাফ আহমেদ
২৯ এপ্রিল ২০২৫

১৯৯৫ সাল, ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা। কদিন আগেই জার্মানির বিখ্যাত লেখক গুন্টার গ্রাসের উপন্যাস ‘আইন ভাইটেস ফেল্ড' বা ‘এক বিস্তীর্ণ প্রান্তর' প্রকাশিত হয়েছে।

২০১৬ সালে বাংলাদেশে লেখক অভিজিৎ হত্যার প্রতিবাদে জার্মানির বার্লিনে একটি বিক্ষোভে নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দার
১৯৭৪ সালে কবিতা লিখে 'ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার' অভিযোগে কবি দাউদ হায়দারকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়, এরপর আর কখনও তিনি দেশে ফিরতে পারেননিছবি: Sharaf Ahmed

১৯৯৫ সাল, ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা। কদিন আগেই জার্মানির বিখ্যাত লেখক গুন্টার গ্রাসের উপন্যাস ‘আইন ভাইটেস ফেল্ড' বা ‘এক বিস্তীর্ণ প্রান্তর' প্রকাশিত হয়েছে।

বইমেলায় গুন্টার গ্রাস তার সদ্য লেখা উপন্যাস থেকে পড়বেন। তার সেই বই বার্লিনে প্রাচীর নির্মাণ এবং পুনর্মিলনের মধ্যবর্তী সময়ে রচিত এবং ১৯ শতক থেকে বর্তমান পর্যন্ত জার্মান ইতিহাসের একটি দৃশ্যপট চিত্রিত করে লিখেছিলেন।

আমরা কজন অনুষ্ঠান শুরুর বেশ আগে মাঝারি ধরনের হলরুমটিতে হাজির হই। নীচু করে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি হয়েছে। মঞ্চে বসার জন্য দুটি সোফা আর সামনে ছোট টেবিল। মঞ্চের সামনে খানিকটা যায়গা জুড়ে বসবার জায়গা। আমরা তাড়াতাড়ি মঞ্চের সামনেই বসে পড়ি। আমি, ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান আবদুল্লাহ আল ফারূক, গ্যোয়েটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আফ্রো-এশীয় সেমিনার কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সুজিত চৌধুরী, ড. সত্য ভৌমিক, লেখিকা নাজমুন নেসা ও কবি দাউদ হায়দার। কিছুক্ষণ পরেই হলটি শ্রোতায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

বেশ কিছুটা সময় পরে একজন মহিলা হোস্টেস এসে টেবিলটিতে দুটি ওয়াইনের গ্লাস রেখে যায়। এরমধ্যেই এসে পড়ে, গুন্টার গ্রাস আর তার লেখা সব বইয়ের প্রকাশনা সংস্থা স্টাইডেল প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী গেরহার্ড স্টাইডেল। তারা আসন নেবার পর মহিলা হোস্টেস এসে রেড ওয়াইন পরিবেশন করে যায়। গুন্টার গ্রাস তার পাইপ বের করে তামাক সেবন করতে করতে রেড ওয়াইনে চুমুক দেন। অতিথিদের দিকে তাকিয়ে সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবার পর দাউদ ভায়ের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘‘আমার ভালো লাগছে আমার সম্মুক্ষেই বসে আছে পুরানো বন্ধু দাউদ হায়দার।'' দাউদ ভাই হাত নাড়িয়ে ধন্যবাদ দেন। কৌতুহলী শ্রোতারা সবাই দাউদ ভাইয়ের দিকে তাকান। অনুষ্ঠানের পর তারা কিছু সময় কথা বলেন।

দাউদ হায়দারের জন্ম হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাবনার দোহারপাড়া গ্রামে। স্কুল ও কলেজ জীবন কেটেছিল পাবনা গোপালচন্দ্র ইনস্টিটিউটে (জিসিআই) আর ঢাকায় সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুল ও ঢাকা কলেজে। সত্তর দশকের শুরুর দিকে দাউদ হায়দার দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য পাতার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য পাতায় "কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়” নামের একটি কবিতা লেখার অপরাধে ১৯৭৪ সালের ১১ মার্চ গ্রেফতার হন। তার বিরূদ্ধে আদালতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য মামলা করা হয়। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন।

১৯৭৪ সালের ২১ মে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রথমে তিনি ১৩ বছর কলকাতায় ছিলেন। কলকাতায় তিনি সমাদৃত হন। অন্নদাশঙ্কর রায় তাকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। পরে জার্মানির প্রখ্যাত নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসের সহযোগিতায় ১৯৮৬ সালের ২২ জুলাই জার্মানি এসে পৌঁছান। তখন থেকেই তিনি জার্মানির বার্লিন শহরে বসবাস করছেন। তিনি কিছুদিন জার্মানির গ্যোয়েটিংগেন শহরে অবস্থিত বই প্রকাশনা সংস্থা স্টাইডেল প্রকাশনীতে কাজ করেন। ডয়েচে ভেলে রেডিওতে তিনি বছর পাঁচেক জড়িত ছিলেন। প্রথম দিকে প্রবাস থেকে বাংলা সাহিত্য আর কবিতা নিয়ে লিখতেন ঢাকা ও কলকাতার পত্র-পত্রিকাতে । কিন্তু তাতে করে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার মুখ দেখেননি। ততটা চেষ্টাও করতেন না। কোথাও যেন একটা অভিমান। নির্বাসনে থাকার অভিমান। মুখ খুলে কিছু বলতেন না।

বর্লিনে তিনি এক সময় থাকতেন মন্টেফেল্ডস্ট্রাসেতে, তারপরে ছিলেন শ্যোনফেল্ডার এলাকার আইসনাখারস্ট্রাসেতে। দীর্ঘ সময় তিনি এই বাড়িটিতে ছিলেন। হঠাৎ করে বাড়িওয়ালা নিজের প্রয়োজনের কথা বলে, দাউদ হায়দারকে বাড়িটি ছেড়ে দিতে বলেন। ঐ বাড়িটিতে দাউদ হায়দার দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। তার পরবর্তী ঠিকানা হয়, শহর থেকে বেশ দূরে রাইনিকারফেল্ডের ১২ তলা একটি ভবনের ছোট অ্যাপার্টমেন্টে। সেখানে যাবার পর থেকে তিনি সব সময় মনমরা হয়ে থাকতেন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছেও যেতেন না। তবে তার পরিচিত স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা সব সময় তার খোঁজ-খবর রাখতেন।

গত বছর ১২ ডিসেম্বর কবি দাউদ হায়দার নিজ বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারান। তিনি বার্লিনের রাইনিকেডর্ফ এলাকায় এখটি সুউচ্চ ভবনে বারো তলায় একটি ফ্লাটে একাকী বসবাস করতেন। দুর্ঘটনার দিন প্রথমে স্থানীয় রাইনিকেডর্ফ হাসপাতালে, পরে নয়েকোলন হাসপাতালে তার চিকিৎসা হয়। সেই সময় কবির নিকট সুহৃদ মাইন চৌধুরীকে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, তিনি সম্ভবত পড়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁর মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। অবস্থা সংকটজনক হওয়ায় তাঁকে কৃত্রিম কোমায় রাখা হয়। সেই সময় কবি দাউদ হায়দারকে দুই সপ্তাহ হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল এবং কৃত্রিম উপায়ে নলের সাহায্যে খাবার খাওয়ানো এবং শ্বাস নেওয়াবার চেষ্টা করা হয়।

দেশ থেকে আজীবন নির্বাসনে থাকলেও সারা জীবনই বাংলাদেশকে মনে ধারণ করেছেন কবি দাউদ হায়দারছবি: DW/A. Islam

চিকিৎসাধীন অবস্হায় কবি দাউদ হায়দারের শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালো হলে এবং জ্ঞান ফিরলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না। পরে তাকে ‘কৃত্রিম কোমা' থেকে সাধারণ কোমায় রাখা হয় এবং তাঁর শ্বাসনালীতে অস্ত্রোপচার করা হয়।

এই বছর জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে কবি দাউদ হায়দারকে বার্লিন থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে গ্রাইফভাল্ডার শহরে নিউরোলজি বা স্নায়বিক পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। চিকিৎসকরা তখন জানিয়েছিল, সেখানে তাঁকে অনেকটা সময় থাকতে হবে।

কিছুটা সুস্থ হয় উঠলে কবি দাউদ হায়দারকে গত মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে বার্লিনের শ্যোনেবের্গ ক্লিনিকে স্থানান্তরিত করা হয়। গত ২১ মার্চ কবির নিকট সুহৃদ মাইন চৌধুরী সহযোগে দাউদ ভাইকে দেখতে গেলাম। পরিপাটি বারান্দাওয়ালা তৃতীয় তলার দক্ষিণমূখী ঘরটিতে তিনি শুয়ে আছেন। বিছানার পাশে নানা চিকিৎসা সরঞ্জাম আর যন্ত্রপাতি। বিছানার সামনে বড় দুটি বাঁধানো ছবি। একটি দাউদ ভাইয়ের মায়ের, অন্যটি ভাইয়ের ছেলে-মেয়েদের সাথে স্মৃতিময় ছবি। বন্ধুবর মাইন চৌধুরী বা পিটু ভাই হঠাৎ ক্যাসেট-রেকর্ডে দেবব্রত বিশ্বাসের রবীন্দ্র সংগীত চালিয়ে দেন। সহসা মাথাটি ক্যাসেট-রেকর্ডের দিকে ঘুরিয়ে কানখাড়া করে গান শুনতে থাকেন, ‘‘আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী"। বোঝা যাচ্ছিল তিনি শুনছেন, অনুভব করছেন, কিন্তু প্রকাশ করতে পারছেন না। ছবিগুলি ও ক্যাসেট-রেকর্ডার এই সব কিছুই পিটু ভাই দাউদ ভাইয়ের বাড়ি থেকে এনে ক্লিনিকের ঘরে সাজিয়েছেন। বেশ খানিকটা সময় কাটে কবির ঘরে। আসবার সময় বলি, ‘‘দাউদ ভাই, হাসেন, ছবি তুলবো।'' সত্যিই দাউদ হায়দার হেসে উঠেন। আমি ছবি তুলি। সেই শেষ দেখা। গত শনিবার ২৬ এপ্রিল রাত নয়টার দিকে এই ক্লিনিকেই তিনি মারা যান

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনিই প্রথম লেখক, যাকে লেখালেখির কারণে নির্বাসনে যেতে হয়। বিগত ৫০ বছর ধরে কবি দাউদ হায়দার নির্বাসনে ছিলেন। এই সময়ে তিনি আর কখনোই দেশে যেতে পারেননি। একটি কবিতা লেখার জন্য এই নির্বাসন। কী নির্মম নিয়তি। এই ঘটনা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাকে ও তার কবিসত্তাকে অক্ষয় করে রাখবে।

দেশান্তরের সে কী হৃদয়ভেদী বর্ণনা করেছেন কবি, ‘‘সকালে উঠেই হেমার চিৎকার, ‘খোকন ছেলে, খোকন ছেলে।'' কাঁধ থেকে নামে না। মা'র কাছে বসি। মাথায় হাত রাখেন। ঠান্ডা হাত। মানিব্যাগে কেবল ভারতীয় ষাট পয়সা। প্লেন উড়লো। জানালা দিয়ে দেখি ক্রমেই মিলিয়ে যায় আমার আবাল্য প্রিয় ঢাকা, অসম্ভব ভালোবাসার দেশ।''

শেষ পর্যন্ত কবির তার ভালোবাসার দেশে আর ফেরা হলো না।

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ