ভারতের বড় শহরগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণ
৩০ নভেম্বর ২০২৫
২০১৫ থেকে নভেম্বর ২০২৫— ১০ বছরে ভারতের বড় বড় শহরগুলোর বাতাস একদিনের জন্যও নিরাপদ ছিল না৷ দেশটির পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা সংস্থা 'ক্লাইমেট ট্রেন্ডস'-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র৷ প্রতিবেদনে ভারতের ১১টি বড় শহরের বায়ুর মানের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়৷ শহরগুলো হলো রাজধানী দিল্লি, আহমেদাবাদ, বেঙ্গালুরু, চণ্ডীগড়, চেন্নাই, কলকাতা, লখনউ, মুম্বাই, পুনে, বারাণসী এবং বিশাখাপত্তনম৷
এর মধ্যে দিল্লির পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ৷ ভারতের রাজধানী দিল্লি জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম জনবহুল শহর৷ তিন কোটিরও বেশি মানুষ শহরটিতে বাস করেন৷
দূষণের ভয়াবহ ছবি
প্রতিবেদনটি বলছে, ভারতের বিভিন্ন শহরে বাতাসের মান সন্তোষজনক নয়৷ গত এক দশক জুড়ে দিল্লিই দেশের সবচেয়ে দূষিত শহর৷ ২০১৬ সালে রাজধানীর বাতাসের মান বা গড় একিউআই (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) ছিল ২৫০-এর উপরে, যা বাসিন্দেদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই খারাপ৷ চলতি বছরও একিউআই প্রায় ১৮০-এর আশেপাশে উঠানামা করছে৷ মাঝেমধ্যে সামান্য উন্নতি দেখা গেলেও দিল্লির বায়ু কখনওই নিরাপদ হয়ে ওঠেনি৷
বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র কণার উপরে নির্ভর করে বাতাসের মান নির্ধারিত হয়৷ পিএম২.৫ বা পিএম১০ কণা চোখে দেখা যায় না৷ এগুলি ফুসফুসে ঢুকে শ্বাসকষ্ট, কাশি, হাঁপানি ও নানা রোগ বাড়িয়ে তোলে৷ যে কণার পরিমাণ বেশি, সেটার উপরে ভিত্তি করেই একিউআই নির্ধারিত হয়৷ বাতাসের মান খারাপ হওয়ার পিছনে মূল কারণ তিনটি৷ গাড়ির ধোঁয়া, কারখানার ধোঁয়া ও শীতকালে ফসলের অবশিষ্ট অংশ পোড়ানো৷
অন্যান্য শহরের অবস্থাও ভালো নয়৷ লখনউ, বারাণসী ও আহমেদাবাদ শহরে উল্লেখিত দশকের শুরুতে নিয়মিত দূষণের মাত্রা বেশি ছিল৷ অনেক ক্ষেত্রে একিউআই ২০০-এর উপরে ছিল৷ মুম্বই, চেন্নাই, পুনে ও বেঙ্গালুরু তুলনামূলকভাবে কম দূষিত৷ কিন্তু এসব শহরের বাতাসের মান ভালো, এ কথা বলা যাবে না৷ বেঙ্গালুরু ভারতের সবচেয়ে কম দূষিত বড় শহর হলেও এর একিউআইও ৬৫–৯০ যা স্বাস্থকর মাত্রার চেয়ে বেশি৷
শীতে এমনিতেই দূষণ বৃদ্ধি পায়, ফলে এখন সমস্যা বাড়ছে৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি প্রাকৃতিক কারণে দূষণ বাড়ে৷ শীতকালে ঠান্ডা বাতাস মাটির কাছে আটকে থাকে৷ ফলে দূষিত কণাগুলো উপরে উঠতে পারে না, বাতাসের নিচের স্তরেই জমে যায়৷ অর্থাৎ এই বাতাস দূষণকে ধরে রাখে৷ তার উপর চলতি বছরে বৃষ্টি কম হয়েছে৷ বৃষ্টি হলে বাতাসের ধুলোর মতো দূষণও কমে যায়৷ তাছাড়া উঁচু ভবন ও ঘনবসতিতে বাতাসের গতি কম থাকে৷ এর ফলে বড় বড় ভবনের ফাঁকে বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে না৷ স্থির বাতাসের কারনে দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়৷
তবে গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফলের পরিস্থিতি আরো বেশি খারাপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা৷
পরিবেশ প্রযুক্তিবিদ সোমেন্দ্রমোহন ঘোষ ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘১১ নয়, বাতাসের মান খারাপ, এমন শহরের সংখ্যা হবে ২১৷ আমাদের এখানে যেভাবে মূল্যায়ন হয়, সেটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী করা হয় না৷ তারা বলছে, যে কোনো শহরে যদি বাতাসে ধূলিকণার ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম হয়, তাহলে সেই শহর বাসিন্দাদের জন্য উপযুক্ত নয়৷ সেখানে আমাদের কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের মাত্রা হচ্ছে প্রতি ঘনমিটারে ৬০ মাইক্রোগ্রাম৷ ২১টার মধ্যে শুধু বড় নয়, জেলা শহরগুলিও আছে৷ সারা বিশ্বের একই স্ট্যান্ডার্ড হওয়া উচিত৷ ভারতবর্ষ যেহেতু উন্নয়নশীল দেশ, সেখানে কিন্তু এত ফারাক থাকা কাম্য নয়৷ দূষণকে এত লঘু করে দেখা উচিত নয়৷’’
পরিবেশবিদ অধ্যাপক অনিরুদ্ধ মুখোপাধ্যায় ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘শহরের সবচেয়ে বড় দূষণের কারণ হলো রাস্তার ধুলো৷ গাড়ি চলাচলের সময় এই ধুলো উড়ে বাতাসে মিশে যায় এবং ধোঁয়ার তুলনায় ধুলোই বড় সমস্যা সৃষ্টি করে৷ এই ধুলোর কণাগুলোর আকার বিভিন্ন, মাইক্রনের হিসাবে এগুলোকে পিএম১০ বা পিএম২.৫ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷ কণা যত ছোট হয়, তত বেশি বিপজ্জনক৷ বিশেষ করে পিএম২.৫ সহজেই ফুসফুসে ঢুকে যেতে পারে এবং রেসপিরেবল সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেট ম্যাটার (আরএসপিএম) হিসেবে শারীরিক ক্ষতি করতে পারে৷ শীতকালে দূষণ বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ হলো বাতাসের গতি কমে যাওয়া৷ এই সময় বাতাসের ডিসপারশন কম থাকায় ধুলো-ময়লা উপরে ওঠে না এবং বাতাসে স্থির হয়ে থাকে৷ তাই শীতকালে দূষণ বেশি বোঝা যায়৷''
কলকাতার পরিস্থিতি
দূষণের নিরিখে কলকাতাও স্বস্তিতে নেই৷ মহানগরের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা সোমেন্দ্রমোহন বলেন, ‘‘প্রতি ঘনমিটারে ধূলিকণার ঘনত্ব ১৫ মাইক্রোগ্রামের জায়গায় আমাদের কলকাতায় এখন ১৫০ থেকে ২০০ মাইক্রোগ্রামের মধ্যে আছে৷ আরো শীত পড়লে ওটা ৩০০ ছাড়িয়ে যাবে৷ এদিকে দিল্লিতে ইতোমধ্যে ৩০০ থেকে ৪৫০ মাইক্রোগ্রাম হয়ে গিয়েছে, কোনো কোনো সময় ৫০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে৷ গড় হিসেব যদি দেখা যায়, তাহলে সারা বছরে প্রথমে দিল্লি, তার পরে কলকাতা, এর পরে মুম্বই৷''
অনিরুদ্ধ বলেন, ‘‘কলকাতা নিয়ে একটি সংস্থা যে স্টাডি করেছে, তাতে দেখা গিয়েছে যে, শহরের বায়ুদূষণের প্রধান কারণ তিনটি—নির্মাণকাজ থেকে ওঠা ধুলো, যানবাহনের ধোঁয়া ও ধুলো ও রাস্তায় থাকা রান্নার দোকানের ধোঁয়া৷ এর বাইরে শহরের বাইরের অঞ্চল থেকেও ধুলো ও দূষিত বাতাস এসে কলকাতার উপরে প্রভাব ফেলতে পারে৷ কৃষি বর্জ্য নিজে থেকে বড় ধরনের দূষণ তৈরি না করলেও, ক্ষেতের নাড়া বা খড় জ্বালানো থেকে ব্যাপক দূষণ তৈরি হয়৷ হরিয়ানা, পাঞ্জাব বা সেই অঞ্চলে এটা হয় বলে দিল্লিতে শীতকালে দূষণ ভয়াবহ মাত্রায় বেড়ে যায়৷ কলকাতায় তুলনামূলকভাবে এই উৎস থেকে দূষণ কম হলেও একেবারে নেই, এমন বলা যায় না৷’’
ডিজেলের গাড়ি, স্ট্রিট ফুডের দোকান আর পুকুর ভরাটে শঙ্কায় কলকাতা
সোমেন্দ্রমোহন বলেন, ‘‘কলকাতায় ১০ হাজার এমন দোকান রয়েছে, যেখানে রাস্তায় কয়লার উনুন জ্বালানো হয়৷ এটা অন্যতম কারণ৷ এগুলি মূলত স্ট্রিট ফুডের দোকান৷ এই শহরে ডিজেল গাড়ির ঘনত্ব অনেক বেশি৷ কলকাতার আশেপাশে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি কয়লায় চলে, যেটাকে সোলার পাওয়ারে কনভার্ট করা উচিত৷ কলকাতার ইলেকট্রিক ভেহিকেল এখনো ভেহিকেল পপুলেশনের পাঁচ শতাংশের কম৷ এটা যদি বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়ে যায়, তাহলে শহরের বায়ুর মান কিছুটা ভালো হতে পারে৷ আর কলকাতার গাড়ির গতিবেগ এত কম, যত বেশি গিয়ার, ক্লাচ, ব্রেক চেঞ্জ করবে, তত বেশি আনবার্ন ফুয়েল স্মোক বেড়ে যাবে৷ এতে বেশি দূষণ হবে৷’’
তিনি বলেন, ‘‘পুকুর ভরাট করে ফেলা হচ্ছে৷ পুকুরগুলো বুজিয়ে বহুতল হচ্ছে৷ কলকাতা মেট্রোপলিটান এরিয়া, দমদম, বরানগর, রাজারহাটে, ৩০ হাজার পুকুর ভরাট করা হয়েছে৷ গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে৷ ১০ বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ সবুজ কমে গিয়েছে৷ জাতীয় পরিবেশ আদালত এবং কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, কতো পুকুর ছিল আর এখন কতো আছে, তার একটা প্রতিবেদন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে রিপোর্ট জমা দিতে হবে ৷''
আশার আলো
কলকাতার পরিস্থিতি উন্নয়নে সীমিত আকারে হলেও দূষণের মাত্রা কমানো চেষ্টা চলছে৷ এ বিষয়ে অনিরুদ্ধ বলেন, ‘‘কলকাতায় গত দুই বছরে বায়ুর মান কিছুটা উন্নত হয়েছে, এই ধারণা পুরোপুরি ভুল নয়৷ শহরের বিভিন্ন জায়গায় দূষণ কমানোর জন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷ আরও বেশি করে গাছ লাগানো হচ্ছে, বিশেষ করে এমন সব গাছ যেগুলোর বড় ও মোটা পাতা রয়েছে এবং যেগুলো ধুলো শোষণ করতে পারে৷ পাশাপাশি ডিজেলচালিত পুরোনো গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে ইলেকট্রিক যান ও নতুন প্রজন্মের সিএনজি অটোরিকশা চালু করা হয়েছে৷ ১৫ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি বাতিল বা বদলানোর প্রক্রিয়াও চালু আছে৷ শহরের মধ্যে খোলা জায়গা ও জলাভূমি রক্ষা করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে বাতাসের স্বাভাবিক চলাচল বজায় থাকে৷''
তিনি বলেন, ‘‘দূষণ কমানোর জন্য স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি, দুই ধরনের উদ্যোগই প্রয়োজন৷ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সিএনজি বা ইভি যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো, শিল্পাঞ্চলে দূষণ নিয়ন্ত্রণের নিয়মগুলি সঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না তা কঠোরভাবে দেখা এবং শহরের যেসব রাস্তায় ধুলো বেশি উড়ছে, সেখানে নিয়মিত ধুলো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা৷ জাতীয় স্তরে ‘ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার মিশন' চলছে গত পাঁচ বছর ধরে৷ এর দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছে৷ এই পরিকল্পনার ফলে কয়েকটি জায়গায় বায়ুর মানে উন্নতি দেখা গিয়েছে, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই আরও কাজ বাকি৷’’