ভারতে কতটা কমেছে বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা?
২৮ নভেম্বর ২০২৫
ভারত সরকারের পর্যটন মন্ত্রকের পর্যটক সংক্রান্ত ২০২৫-এর রিপোর্ট বলছে, দেশে ঘুরতে আসা বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ-মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। কিন্তু এ রাজ্যে আসা বাংলাদেশিদের সংখ্যা তলানিতে ঠেকেছে।
কেন্দ্রীয় রিপোর্ট
বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার নিরিখে দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে পশ্চিমবঙ্গ। প্রথম স্থানে রয়েছে মহারাষ্ট্র। ভারতীয় পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য হিসেবে এ রাজ্য রয়েছে সপ্তম স্থানে। এই তালিকায় শীর্ষে উত্তরপ্রদেশ।
কলকাতা থেকে ইউরোপের মধ্যে সংযোগকারী কোনো সরাসরি উড়ান না থাকা সত্ত্বেও ২০২৪-এ ৩১ লক্ষ বিদেশি পর্যটক পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন। ২০২৩-এ এই সংখ্যা ছিল ২৭ লক্ষ। বৃদ্ধির হার প্রায় ১৫ শতাংশ। যদিও বাংলাদেশ থেকে আসা পর্যটকদের সংখ্যা অনেকটাই কমেছে।
২০২৩ সালে ভারতে আগত আন্তর্জাতিক পর্যটকদের মধ্যে বাংলাদেশিরা ছিলেন সবচেয়ে বেশি সংখ্যক। কিন্তু ২০২৪ সালে আমেরিকানদের পরে তারা দ্বিতীয় স্থানে নেমে এসেছেন। ২০২৩ সালে যেখানে ২১.২ লক্ষ বাংলাদেশি ভারতে এসেছিলেন, ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি কমে ১৭.৫ লক্ষে দাঁড়িয়েছে।
গত বছর জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পরে কলকাতা ও ঢাকার মধ্যে বিমান চলাচলের সংখ্যা কমে গিয়েছে। দুবাই, আবুধাবি এবং দোহা হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং ব্রিটেন থেকে পশ্চিমবঙ্গে পর্যটকরা যে সংখ্যায় আসছেন, তা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি।
যদিও স্থল সীমান্তকে হিসাবে ধরলে, বাংলায় আগত বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রয়েছেন। এই সংখ্যা অবশ্য আগের তুলনায় অনেক কম।
বিদেশি পর্যটক সংক্রান্ত এই তথ্য সামনে আসার পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন। তার মতে, রাজ্য সরকারের পর্যটন ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ফলে করোনা অতিমারির পরে পশ্চিমবঙ্গে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। রাজ্যের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে উৎসবকেন্দ্রিক পর্যটন, ধর্মস্থানকেন্দ্রিক পর্যটন ইত্যাদি।
চিকিৎসা পর্যটন
বাংলাদেশ থেকে একটা বড় সংখ্যক মানুষ ভারতে আসেন চিকিৎসার জন্য। সেই সঙ্গে তারা এদেশ ঘুরেও দেখেন। বিদেশ থেকে যত রোগী ভারতে আসেন, তার ৭০ শতাংশ বাংলাদেশের নাগরিক। বছরখানেকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে আসা রোগীর সংখ্যা কমেছে। আগের তুলনায় কোথাও কোথাও একটু বৃদ্ধি দেখা গেলেও তা আগের মতো নয়।
কলকাতার হাসপাতালে প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা রোগীর সংখ্যা এক বছর আগের তুলনায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। ভিসা এখনো ধীর গতিতে ইস্যু হওয়ায় পরিস্থিতি শীঘ্রই উন্নতির সম্ভাবনা নেই বলে মনে করা হচ্ছে।
পিয়ারলেস হাসপাতালের বহির্বিভাগে আগে দিনে গড়ে দেড়শো বাংলাদেশি আসতেন। এখন এর ১০ শতাংশের মতো আসেন। বিমানবন্দরের কাছে চার্নক হাসপাতালেও কমেছে বিদেশি রোগীর সংখ্যা। আরএন টেগোর হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা তিন চতুর্থাংশ কমেছে। অর্থাৎ আগে চারজন রোগী এলে এখন একজন আসছেন।
মণিপাল হাসপাতালের একাধিক শাখায় অবশ্য আংশিক বেড়েছে বিদেশি রোগীর সংখ্যা, যদিও তা আগের তুলনায় কম। একই ছবি ডিসান হাসপাতালে।
পূর্ব ভারতের হাসপাতাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সভাপতি রূপক বড়ুয়া ডিডাব্লিউকে বলেন, "২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশি রোগী বেশ অনেকটাই কমে গিয়েছে। ১০ শতাংশও এখন নেই। রোগীরা যা আসতেন, তার থেকে কমে প্রায় সাত থেকে ১০ শতাংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ থেকে একদম ইমারজেন্সি ছাড়া মেডিকেল ভিসা দেয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষের আসার ইচ্ছা থাকলেও তারা মেডিকেল ভিসাটাও পাচ্ছিলেন না।"
তিনি বলেন, "বাইপাসের ধারের হাসপাতাল-সহ বারাসত, বনগাঁ চত্বরে ছোট ছোট হাসপাতালগুলিতেও বাংলাদেশি রোগী প্রচুর আসতেন। সেই সংখ্যাটা চোখে পড়ার মতো কমে গিয়েছে। এটা প্রায় এক বছর হতে চলল। এখন হয়ত একটু বেড়েছে। তবে সেটাও খুব উল্লেখ করার মতো নয়। যাদের আগে চিকিৎসা হয়ে গিয়েছে, তাদের ফলোআপ করানোর জন্য মেডিকেল ভিসা দেওয়া হচ্ছে।"
কেন্দ্রেয় সরকার সম্প্রতি আয়ুষ পোর্টাল চালু করায় মেডিকেল ভিসা প্রক্রিয়া সরল হয়েছে। কিন্তু ভ্রমণের জন্য ভিসা পেতে বেশি সমস্যা হচ্ছে বলে মত পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষজনের।
একশো থেকে দুই-তিন
সাধারণ মানুষের মধ্যে পর্যটনের আগ্রহ যেমনই থাকুক, রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য শিল্পে প্রভাব পড়ছে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী, এজেন্টদের মত এটাই।
ট্যুর অপারেটর স্বরূপ ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, "রাজনৈতিক কারণে দুই দেশের মধ্যে একটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তার পাশাপাশি পর্যটনের যে ট্রেন্ড আগে ছিল সেটা কমেছে। আগে ভিসা পদ্ধতি অনেক সোজা ছিল, প্রচুর মানুষ আসতেন। এখন বাংলাদেশে পর্যটক নেই বললেই চলে। আগে যদি ১০০ জন পর্যটক আসতেন, এখন দুই-তিন জন আসেন। অর্থাৎ দুই থেকে তিন শতাংশ বাংলাদেশি আসছেন। এরা মূলত চিকিৎসার জন্যই আসছেন।"
তার মতে, "দার্জিলিং, গ্যাংটকের পাশাপাশি বোলপুর শান্তিনিকেতন, পশ্চিমবঙ্গের বাইরে আগ্রা বাংলাদেশের পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় পর্যটনস্থল। পৌষমেলার সময় বাংলাদেশি পর্যটকে বোলপুর ভর্তি থাকে। এবারে পৌষমেলায় সেই ছবি দেখা যাবে না।"
অন্যান্য দেশের পর্যটকরা এলেও বাংলাদেশি পর্যটকদের অভাব পূরণ হচ্ছে না কেন? তিনি বলেন, "আমাদের এখানে অ্যামেরিকা, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড ইউরোপের দেশ থেকে পর্যটকরা আসেন। তারা ভারতে প্রবেশ করেন দিল্লি দিয়ে। দিল্লি থেকে এরা আমাদের উত্তরবঙ্গে ঢোকেন। অন্য একটা দল ইতিহাসপ্রসিদ্ধ জায়গা মধ্যপ্রদেশ উত্তরপ্রদেশ, বুদ্ধগয়া, এসব জায়গায় চলে যান। এরা মূলত আসেন অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বরে ক্রিসমাসের আগেই। ইউরোপের দেশগুলোর পর্যটক আসায় ভাটা পড়েনি। বাংলাদেশিরা একটু কম বাজেটের জন্য আমাদের রাজ্যে ঘুরতেন, তাই তারা যে সংখ্যায় আসতেন, সেই ফাঁক পূরণ হচ্ছে না।"
পর্যটন শিল্পে ক্ষতি
বাংলাদেশের পর্যটক কমে যাওয়ায় এই বঙ্গের পর্যটন শিল্প কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের পুরোনো সংগঠন ইস্টার্ন হিমালয় ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসেসিয়েশনের সভাপতি দেবাশিস মৈত্র বলেন, "রাজনৈতিক পালাবদলের জন্য বাংলাদেশি পর্যটকরা আসতে পারছেন না। টুরিস্ট ভিসার কড়াকড়ির জন্য তো বটেই। বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য
যে প্রবল গতি এসেছিল আমাদের পর্যটনে, সেই গতি আর নেই। তারা দার্জিলিং, গ্যাংটক খুব পছন্দ করেন। একই সঙ্গে ভুটান যেতে পছন্দ করেন। ছাঙ্গু লেকে আগে পারমিট দিত না বাংলাদেশিদের, তারপর পারমিট দেওয়া শুরু করেছিল। তাই অনেক পর্যটক আসতে শুরু করেছিল। আমাদের ব্যবসা তাতে খুব ভালো হচ্ছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের টুরিস্ট নেই বললেই চলে। আগে যদি ১০০ জন বাংলাদেশ থেকে আসতেন, এখন সেই সংখ্যাটা ২০-তে এসে দাঁড়িয়েছে।"
তিনি ব্যাখ্যা করেন, "বাংলাদেশি পর্যটক না আসায় ব্যবসার প্রচুর ক্ষতি হচ্ছে। শুধু আমাদের ট্যুর অপারেটরদের নয়, ট্রান্সপোর্ট থেকে শুরু করে ট্রাভেল এজেন্ট, হোটেল সবারই ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় বাংলাদেশিরা অনেক বেশি আসতেন অন্য দেশের পর্যটকদের তুলনায়। মার্কিনিরা যদি ১০ জন আসতেন, তাহলে বাংলাদেশিরা ৫০ জন। ভারত সরকার যদি আবার টুরিস্ট ভিসা দেওয়া শুরু করে, তাহলে আমাদের উপকার হবে। তবে দেশের বিদেশনীতির ব্যাপারে আমরা কিছু বলতে পারব না।"
কিছুটা ভিন্নমত জানিয়ে হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক সম্রাট সান্যাল ডিডাব্লিউকে বলেন, "অন্যান্য দেশ যেমন ব্রিটেন, অ্যামেরিকা, জাপান, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া থেকেও প্রচুর পর্যটক আসছেন ভারতে। সেই জন্য বাংলাদেশের পর্যটকের অভাবে আমাদের খুব ক্ষতি হচ্ছে না। তবে যত বেশি টুরিস্ট আসবেন, তত পর্যটন শিল্প লাভবান হয়। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য শিল্পের ক্ষতি হচ্ছে বলতে পারেন।"
পর্যটকদের গন্তব্য বদল
ভারত সফর কঠিন হয়ে পড়ায় গন্তব্য বদলে ফেলছেন বাংলাদেশের ভ্রমণপিপাসু মানুষরা।
সম্রাট বলেন, "ভিসা না পাওয়াই সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিসা নিয়ে এত কড়াকড়ি হয়েছে যে বাংলাদেশিরা পর্যটনের জন্য ভারতে আসছেন না। মেডিকেল ভিসা বাদ দিয়ে টুরিস্ট ভিসা খুবই কম। তাই তার বদলে তারা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলি যেমন, থাইল্যান্ড, ব্যাংকক, শ্রীলংকা, নেপাল এইসব জায়গায় যাচ্ছেন।"
তিনি বলেন, "বাংলাদেশের পর্যটকদের পছন্দের জায়গা বরাবরই ছিল উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং। এরপর ২০১৮-তে সিকিম খুলে যায়। দার্জিলিং, ডুয়ার্সের পাশাপাশি সিকিমের চাহিদাও বাড়ে। ২০২৩ সালে আমরা এই টুর সার্কিট প্রমোশনের জন্য বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। তখন আমরা ভেবেছিলাম ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশের মানুষ আরো উত্তরমুখী হয়ে উঠবেন। কিন্তু ঘটনাচক্রে গত বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জন্য পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আগে বছরে ছয় লাখের বেশি বাংলাদেশি আসতেন পর্যটনের টানে। এখন সেই সংখ্যাটা কমে গিয়ে এক-দেড় লাখে ঠেকেছে। বলতে গেলে সেটাও হয় না।"