ভোটের আগে 'জনগণমন'-র আগে 'বন্দে মাতরম' গাওয়ার নির্দেশ কেন?
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় সরকারের এক সিদ্ধান্তকে ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর রচনা ‘বন্দে মাতরম’, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সৃষ্ট ‘জনগণমন’। এই দুই ঐতিহাসিক গানের গুরুত্ব নিয়ে রাজনৈতিক তর্ক শুরু হয়েছে।
কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে বিতর্ক
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জাতীয় গান ও জাতীয় সঙ্গীত সংক্রান্ত বিধিতে পরিবর্তন এনে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘বন্দে মাতরম’-এর শুধু প্রথম দুই স্তবক নয়, এখন থেকে সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবকই গাইতে হবে।
সরকারি অনুষ্ঠানের সূচনায়, জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময় এবং রাষ্ট্রপতির আগমন বা প্রস্থানের মুহূর্তে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই অনুষ্ঠানে যদি জাতীয় গান ও জাতীয় সঙ্গীত উভয়ই পরিবেশিত হয়, তবে আগে গাওয়া হবে ‘বন্দে মাতরম’, তারপর ‘জনগণমন’।
এতদিন পর্যন্ত জাতীয় গান গাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সরকারি প্রোটোকল ছিল না। গত বছর কেন্দ্র সরকার ‘বন্দে মাতরম’-এর সার্ধশতবর্ষ উদযাপনের উদ্যোগ নেয়। সেই সময় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। এবার সরকারি অনুষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হল।
জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’ নিয়ে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে নতুন কোনো নির্দেশিকা জারি হয়নি। গানটি সম্পূর্ণ গাওয়ার বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়নি। আগের মতোই ৫২ সেকেন্ডের নির্ধারিত অংশটি গাইতে হবে।
‘জনগণমন’, যা ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’ নামেও পরিচিত, তাতে আদতে পাঁচটি স্তবক রয়েছে। যদিও জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে কেবল প্রথম স্তবকই গাওয়া হয়।
দুই গানের ইতিহাস
‘বন্দে মাতরম’ রচনা করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পরে এটি তার উপন্যাস 'আনন্দমঠ'-এ অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৯৬ সালে কংগ্রেসের অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম দুই স্তবকে সুরারোপ করেন। ১৯০৫ সালে সরলা দেবী চৌধুরানী, সম্পূর্ণ গানে সুর দেন।
১৯৩৭ সালে মুসলিম লিগ স্কুল-কলেজে ‘বন্দে মাতরম’-এর পূর্ণাঙ্গ রূপ গাওয়ার বিরোধিতা করে। গানটির কিছু অংশে হিন্দু দেবদেবীর বন্দনার উল্লেখ ছিল। ধর্মীয় বিতর্ক এড়াতে সেই অংশগুলি বাদ দিয়ে গানটির প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার পরম্পরা চলে আসছে।
সাম্প্রতিক নির্দেশিকায় ওই ঐতিহাসিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার ওপরে জোর দেওয়া হয়েছে। ২৮ জানুয়ারি জারি হওয়া ১০ পৃষ্ঠার নির্দেশিকা ঘিরে তাই মাথাচাড়া দিয়েছে পুরোনো বিতর্ক।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ সংসদে ঘোষণা করেছিলেন, জাতীয় গান ও জাতীয় সঙ্গীত সমমর্যাদাসম্পন্ন। এখন প্রশ্ন উঠছে, সেই পরম্পরা কি ভেঙে পড়তে চলেছে?
জাতীয় সঙ্গীতের আগে অন্য কোনো গান যুক্ত করার বিষয়ে শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার তার তীব্র আপত্তি ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, "জাতীয় সঙ্গীতের একটি নির্দিষ্ট এবং অনন্য সম্মান রয়েছে। এর আগে অন্য কোনো গান যুক্ত করলে জাতীয় সঙ্গীতের সেই মৌলিক গাম্ভীর্য ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এবং এটি প্রকারান্তরে অবমাননার শামিল।"
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জওহরলাল নেহরু-সহ তৎকালীন নেতৃবৃন্দ দূরদর্শিতার সঙ্গেই 'বন্দে মাতরম' গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করেননি। এর কারণ ছিল গানটিতে ব্যবহৃত হিন্দু দেবীর রূপক, যা অন্য ধর্মের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। সেই ঐতিহাসিক ও যুক্তিসঙ্গত কারণগুলো আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।"
তার বক্তব্য, "জাতীয় সঙ্গীতের আগে এই গানটি গাওয়ার বাধ্যবাধকতা এক ধরনের 'জুলুম' বা জবরদস্তির মতো। এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ভাবধারা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা জাতীয় সঙ্গীতের সর্বজনীন চরিত্রের পরিপন্থী।"
তিনি বলেন, "বন্দে মাতরম গানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এর অবদানের কথা স্বীকার করেও তিনি বলেন, জাতীয় সঙ্গীতের ওপরে একে স্থান দেওয়া বা আগে স্থাপন করাটা 'বাড়াবাড়ি' এবং একপ্রকার 'গাজোয়ারি' মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।"
কেন্দ্রের ফরমানে প্রশ্ন
শিক্ষাবিদ মিরাতুন নাহার ডিডাব্লিউকে বলেন, "জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জনগণমন' দীর্ঘকাল ধরে স্বীকৃত ও সমাদৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে এর আগে 'বন্দে মাতরম' গাওয়ার ফতোয়া বা ফরমান জারি করছে, আমি তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি। 'বন্দে মাতরম' এবং 'জনগণমন' রচয়িতাদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা রয়েছে এবং বাঙালি হিসেবে আমরা তাদের অবদানে গর্বিত। কিন্তু জাতীয় সঙ্গীত সাধারণত একটিই হওয়া বাঞ্ছনীয়। শাসকদল কেন দুটি সঙ্গীতকে একসঙ্গে জুড়ে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে, তার কোনো সদুত্তর নেই।"
কোনো আলোচনা ছাড়া কেন এ সিদ্ধান্ত নেয়া হল, প্রশ্ন তোলেন ইতিহাসবিদ।
মিরাতুন বলেন, "গণতান্ত্রিক কাঠামোতে যে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের মানুষের এবং বিরোধীদের অভিমত নেওয়া প্রয়োজন। কোনো ফরমান চাপিয়ে দেওয়া স্বৈরাচারী মানসিকতার পরিচয় হতে পারে, যা গণতন্ত্রে কাম্য নয়। এছাড়া, বরেণ্য সাহিত্যিকদের যেভাবে 'দাদা' সম্বোধন করে লঘু করার চেষ্টা হচ্ছে, তা একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে আমার কাছে শোভনীয় মনে হয় না।"
তার মতে, "দেশবাসী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বেকারত্ব এবং আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্যের মতো তীব্র সমস্যার সম্মুখীন। সাধারণ মানুষের জীবন যেখানে বিপর্যস্ত, সেখানে সঙ্গীত সংক্রান্ত বিতর্কিত বিষয় সামনে আনা কি সত্যিই মূল সমস্যা? শাসকদলের উচিত মানুষের বঞ্চনা দূর করে দেশের প্রকৃত সংস্কারে মনোনিবেশ করা। অবান্তর বিতর্ক সৃষ্টি না করে মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান করাই এখন সময়ের দাবি।"
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান, অধ্যাপিকা সৈয়দ তানভীর নাসরিন ডিডাব্লিউকে বলেন, "জাতীয় সঙ্গীত 'জনগণমন' কোনো নির্দিষ্ট প্রদেশের নয়, বরং এটি ভারতের আসমুদ্র হিমাচল সমস্ত মানুষের শ্রদ্ধা ও আবেগের প্রতীক। এর মধ্যে কোনো প্রাদেশিকতা খোঁজা বা একে অবমাননা করা চরম মূর্খামির লক্ষণ। ১৯৫০ সালেই এটি স্বীকৃত হয়েছে যে, জাতীয় গান 'বন্দে মাতরম'-এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য জাতীয় সঙ্গীতের সমান। এদের মধ্যে কোনো একটিকে আগে বা পরে গাওয়া নিয়ে জোরজুলুম করা বা বিতর্ক তৈরি করা বালখিল্য''।
নেপথ্যে কোন রাজনীতি
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন একেবারে দোরগোড়ায়। তার আগে কি কেন্দ্রের শাসক দল বাঙালি আবেগকে উসকে দেয়ার চেষ্টা করছে, এই প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মইদুল ইসলাম ডিডাব্লিউকে বলেন, "বিজেপির 'বন্দে মাতরম' গানটি পূর্ণাঙ্গভাবে গাওয়ার আহ্বানের পেছনে মূলত বাঙালি আইকন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাবধারার একটি মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা কাজ করছে। বন্দে মাতরমের পরবর্তী স্তবকগুলোতে দেবী দুর্গার আরাধনার অনুষঙ্গ থাকায় একে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।"
রবীন্দ্রনাথ বনাম বঙ্কিমচন্দ্র বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "বন্দে মাতরম পুরো গাওয়ার দাবি উঠলে পাল্টা প্রশ্ন উঠতে পারে যে, রবীন্দ্রনাথের 'জনগণমন' কেন পুরো গাওয়া হবে না? 'জনগণমন'-এর পূর্ণাঙ্গ রূপে ভারতের বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার যে ছবি ফুটে ওঠে, তা বঙ্কিমচন্দ্রের ভাবধারার চেয়ে আলাদা।"
তানভীরের বক্তব্য, "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে কোনো বৈরিতা বা প্রতিযোগিতা নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাদের মধ্যে তুলনা টেনে এনে বাঙালিকে বা দেশকে বিভক্ত করার চেষ্টা করে কোনো লাভ হবে না।"
কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, "রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। তিনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয়। তিনি এমন এক নক্ষত্র যিনি কারো দ্বারা ম্লান হতে পারেন না। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রকে শ্রদ্ধা করলে কি অন্য কাউকে অপমান করা হয়?"
ভুল লিরিক্সে গোল
কেন্দ্রের যে বিজ্ঞপ্তিতে 'বন্দে মাতরম'-কে পুরো গাওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে সেখানে গানের বাণী ভুল লেখা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল। তাদের দাবি, 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে 'বন্দে মাতরম'-এর যে তৃতীয় স্তবক লেখা রয়েছে, তার সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকায় মুদ্রিত তৃতীয় স্তবকের মিল নেই।
এ প্রসঙ্গে মইদুল বলেন, "বিজেপি বঙ্কিমচন্দ্রকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী আইকন হিসেবে তুলে ধরলেও, দলের অনেকেই বাঙালির কৃষ্টি-সংস্কৃতি বা ভাষা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নন। বিজ্ঞাপনে ভুল লিরিক্স বা নেতাদের উচ্চারণে ত্রুটি সেই উদাসীনতারই প্রমাণ দেয়।"
তিনি ব্যাখ্যা করেন, "শুধুমাত্র প্রতীকী বা আবেগের ইস্যু দিয়ে বাংলায় জেতা সম্ভব নয়। বিজেপি মূলত তৃণমূলের 'ডোল পলিটিক্স' বা অনুদানভিত্তিক রাজনীতিকে মতাদর্শগত পুশ দিয়ে কাউন্টার করতে চাইছে। তারা আর্থিক সুবিধার বিপরীতে বাঙালি ইমোশন ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের একটি ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করছে।"