দীর্ঘ আয়ু, বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা, রোগব্যাধি থেকে দূরে থাকার মতো ‘সুপার পাওয়ার' বাদুড়দের অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে আলাদা করে রেখেছে৷ সেই ক্ষমতার রহস্য উন্মোচন করলে মানুষের নানা উপকার হবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন৷
ছবি: Bruce Coleman/Photoshot/picture alliance
বিজ্ঞাপন
বাদুড়ের আয়ু সত্যি বিস্ময়কর৷ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করলেই সেটা টের পাওয়া যায়৷ সাধারণত কোনো প্রজাতির শরীরের ওজনের সঙ্গে সঙ্গে আয়ুও বাড়ে৷
যেমন ডোরমাউস জাতের ইঁদুরের ওজন ৩৫ গ্রাম৷ এই প্রাণীর আয়ু বড়জোর ছয় বছর৷ অন্যদিকে আফ্রিকার হাতির ওজন ছয় টন পর্যন্ত হতে পারে৷ এই প্রাণী ৭০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে৷ উইসকার্ড ব্যাট প্রজাতির বাদুড়ের ওজন মাত্র দশ গ্রাম হওয়া সত্ত্বেও এই প্রাণী ৪১ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে৷
ওজনের তুলনায় এমন দীর্ঘ আয়ু সত্যি বিস্ময়কর৷ একমাত্র স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে বাদুড়ের ওড়ার ক্ষমতার সঙ্গে দীর্ঘ আয়ুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন৷ মাক্স-প্লাংক ইনস্টিটিউটের গবেষক মিশায়েল হিলার বলেন, ‘‘ওড়ার ক্ষমতার কারণে বাদুড় অনেক শত্রুর খোরাক হওয়া থেকে বেঁচে যায়৷ ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি কমে যায়৷ অন্যদিকে ওড়ার কারণে বাদুড়ের শরীরের ওজন সীমিত থাকে৷ বিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এই দুটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে দীর্ঘ আয়ু ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ অনেক বেড়ে যায়৷ অবশ্য সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে অনেক বয়স পর্যন্ত বাদুড়ের শক্তি ও স্বাস্থ্য ভালো থাকতে হবে৷''
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাদুড় বছরে একটি শাবকের জন্ম দেয়৷ কিন্তু দীর্ঘ আয়ুর কারণে সন্তানের সংখ্যা কম হয় না৷ এটি বাদুড়ের নিজস্ব ‘মেথুসেলা স্ট্র্যাটিজি'৷
করোনা সংকটের কারণে বর্তমানে বাদুড়ের ভাবমূর্তি মোটেই ভালো নয়৷ কিন্তু ভুতুড়ে হলেও রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার বিস্ময়কর এক প্রাণী৷ এই প্রাণী সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৭ই এপ্রিল আন্তর্জাতিক বাদুড় কদর দিবস পালিত হয়েছে৷
ছবি: picture-alliance/Mary Evans Picture Library
শুধু অদ্ভুত গুহাবাসী নয়
অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু করে মেক্সিকো পর্যন্ত বাদুড়ের দেখা মেলে৷ কখনো গাছে ঝুলন্ত অবস্থায়, কখনো উঁচু পাহাড়ের উপর, গুহার মধ্যে গোপন আস্তানায়, পাহাড়ের খাঁজে অথবা ছাদের উপর বাদুড় চোখে পড়ে৷ অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া সব মহাদেশেই এই প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে৷ অন্য কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণী এমন কৃতিত্ব দাবি করতে পারে না৷ স্তন্যপায়ী প্রজাতির প্রায় ২০ শতাংশই বাদুড়৷
ছবি: Imago/Bluegreen Pictures
ডুমুরখেকো বাদুড়
সাদা রংয়ের এই বাদুড় হেলিকোনিয়া গোত্রের এক উদ্ভিদের মধ্যে বেশ আরাম করছে৷ প্রায় ১,১০০ প্রজাতির বাদুড়ের মধ্যে মাত্র ৫টির রং সাদা৷ চার থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার দীর্ঘ এই প্রজাতিকে কখনো ‘মার্শমেলো পাফ’ নামে ডাকা হয়৷ মূলত ডুমুর খেয়েই বেঁচে থাকে এই বাদুড়৷
ছবি: picture-alliance/Mary Evans Picture Library
রকমারি প্রজাতির বাদুড়
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভুতুড়ে প্রাণী হিসেবে বদনাম সত্ত্বেও মাত্র তিনটি প্রজাতির বাদুড় সত্যি রক্ত চোষে৷ এমনকি ধারালো দাঁত দিয়ে প্রথমে শিকারের লোম কামিয়ে ফেলে তারপর রক্ত চোষার কাজ শুরু করে৷ ঘুমন্ত গরু ও ঘোড়া এমন বাদুড়ের প্রিয় শিকার৷ এমনকি মানুষের উপর হামলা চালানো ও রোগ ছড়িয়ে দেবার ক্ষেত্রেও এই প্রজাতি পারদর্শী৷
ছবি: picture-alliance/Mary Evans Picture Library
রাতের মতো অন্ধ?
শব্দ তরঙ্গের প্রতিফলন ধরতে বাদুড়ের বিশাল কানের প্রয়োজন হয়৷ বেশিরভাগ প্রজাতির বাদুড় চোখে কম দেখে বলে রাতে শিকারের জন্য শরীরের নিজস্ব ‘সোনার’ যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল৷ এই প্রাণী কণ্ঠের মাধ্যমে অতি উচ্চ তরঙ্গের শব্দ সৃষ্টি করে সামনের দিকে নিক্ষেপ করে৷ সামনের বস্তুতে আঘাত খেয়ে প্রতিধ্বনি ফিরে এলে বড় কানে তা ধরা পড়ে৷ এভাবে মনের মধ্যে আশেপাশের পরিবেশের প্রায় নিখুঁত মানচিত্র এঁকে নিতে পারে বাদুড়৷
ছবি: picture-alliance/Mary Evans Picture Library/J. Daniel
বাদুড় ছাড়া আভোকাডো, আম অথবা কলা হতো না
অনেক উদ্ভিদের পরাগায়নের ক্ষেত্রে বাদুড় মূল ভূমিকা পালন করে৷ কলা, আম ও আভোকাডোর মতো পাঁচশ’রও বেশি উদ্ভিদ এ কারণে বাদুড়ের উপর নির্ভরশীল৷ মেক্সিকোর ‘কলা বাদুড়’ বা ‘নাক উঁচু বাদুড়’ (ছবিতে দেখা যাচ্ছে) এই কাজ করে বলে অস্বাভাবিক লম্বা জিহ্বার অধিকারী৷
ছবি: picture-alliance/All Canada Photos
প্রায় অমর
বছরে একটিমাত্র সন্তানের জন্ম দিতে পারলেও অন্য অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় বাদুড় জগতে শিশুমৃত্যুর হার অনেক কম৷ কয়েকটি প্রজাতির আয়ু এমনকি ৩০ বছর হতে পারে৷ বার্ধক্যের লক্ষণ এড়িয়ে চলার ক্ষমতাও রয়েছে এই প্রাণীর৷ বিজ্ঞানীদের মতে, অন্য কোনো প্রাণী এভাবে বয়স বাড়ার ফলে কোষের ক্ষয় এড়াতে এবং কোষ মেরামত করে ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারে না৷
ছবি: picture-alliance/blickwinkel/AGAMI/T. Douma
রোগ বহনকারী
অসংখ্য ভাইরাস বাদুড়ের শরীরে বাসা বাঁধে৷ মারবুর্গ, নিপা, এবোলা ও সার্স, মার্স এবং হালের কোভিড-১৯-এর মতো করোনা ভাইরাস এগুলির মধ্যে পড়ে৷ অভিনব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কল্যাণে বাদুড় নিজে আক্রান্ত না হলেও অনেক প্রজাতির শরীরে মারাত্মক সব ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে৷ শরীরের উচ্চ তাপমাত্রা ও অ্যান্টি-ভাইরাল ‘ইন্টারফেরন’ পদার্থের কারণেই বাদুড় সহজে অসুস্থ হয় না৷
ছবি: picture-lliance/Zuma
বাদুড় সংরক্ষণের প্রয়োজন
মারাত্মক রোগ বহনের কারণে বদনাম সত্ত্বেও বাদুড় সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি৷ কারণ, বিভিন্ন ইকোসিস্টেমে বাদুড় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে৷ বাদুড় ছাড়া আফ্রিকা মহাদেশে মশার সংখ্যা মারাত্মক হারে বেড়ে যেতো এবং ম্যালেরিয়ার প্রকোপ অকল্পনীয় মাত্রা ধারণ করতো৷
ছবি: Getty Images/AFP/Ye Aung Thu
8 ছবি1 | 8
জার্মানির ক্লেবাখ শহরে প্রকৃতি সংরক্ষণ সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এক অভিযানের অংশগ্রহণকারীরা অবশেষে বাদুড়ের দেখা পেলেন৷ ট্র্যাকিং ডিভাইস থেকে সেই সংকেত পাওয়া গেল৷ বিস্ময়ের সঙ্গে ভয়ের মিশ্রণের অদ্ভুত অনুভূতি৷ জার্মানিতে একমাত্র স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে বাদুড়ই জলাতঙ্কের সংক্রমণ ঘটাতে পারে৷ কিন্তু সেই ঝুঁকি আসলে কতটা? বাদুড় বিশেষজ্ঞ হিসেবে পেট্রা গাৎস বলেন, ‘‘কোনো বাদুড় কখনো নিজে থেকে শুধু খামখেয়ালিপনার বশে মানুষকে আক্রমণ করে না৷ সেটিকে স্পর্শ করলে কামড়ে দিতে পারে৷ এমন অচেনা অভিজ্ঞতা হলে তবেই বাদুড় কামড়াতে যায়৷ মোটা কাপড় হাতে নিয়ে অথবা গ্লাভস পরে ধরলে কোনো সমস্যা হয় না৷''
সে কারণে জার্মানিতে সংক্রমণের আশঙ্কা অত্যন্ত কম৷ বাদুড় মোটেই ভাইরাস ছড়ানো কোনো দানব নয়, বরং এই প্রাণীর কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি৷ মিশায়েল হিলার ও তাঁর সহকর্মীরা এবার বাদুড়ের আরও জিনোম বিশ্লেষণ করতে চান৷ মিশায়েল হিলে বলেন, ‘‘মানুষের নাগালে সেই জ্ঞান এলে ক্যানসারের মতো রোগের উপশম এবং বার্ধ্যক্যের প্রক্রিয়ার গতি কমানো সহজ হবে বলে আমরা আশা করছি৷''
তবে সেই জ্ঞান অর্জনের পথ অত্যন্ত দীর্ঘ৷ বাদুড় তার ‘সুপার পাওয়ার'-এর রহস্য বোধহয় অত সহজে উন্মোচন করতে দেবে না৷