মায়ের চক্ষুদানের অঙ্গীকার পূরণ করতে গিয়ে ছেলে গ্রেপ্তার
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নদিয়ার তেহট্টের শিক্ষক তথা সমাজকর্মী আমির চাঁদ শেখ মায়ের চক্ষুদান করতে গিয়ে মার খেয়েছেন। জেল খেটেছেন। এ নিয়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছে।
নিশানায় শিক্ষক-সমাজকর্মী
আমিরের মা রাবেয়া বিবি মরণোত্তর চক্ষুদানের অঙ্গীকার করেছিলেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুর পরে আমির শোক ভুলে মায়ের সেই ইচ্ছা পূরণ করতে উদ্যোগী হন। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে আইনি পথেই কর্নিয়া সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই মানবিক কাজ ঘিরেই এলাকায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে 'অঙ্গ পাচারের' গুজব।
অভিযোগ, কোনো সত্যতা যাচাই না করেই উত্তেজিত জনতা আমিরের বাড়িতে চড়াও হয়। পরিবারের সদস্যদের মারধর, ঘরবাড়ি ভাঙচুর এবং এমনকী মহিলাদের শ্লীলতাহানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তুমুল উত্তেজনার মধ্যে পুলিশ আমির চাঁদ-সহ পরিবারের পাঁচ সদস্যকে তড়িঘড়ি গ্রেপ্তার করে। মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের আইব্যাঙ্ক থেকে দেওয়া বৈধ শংসাপত্র থাকা সত্ত্বেও কেন পুলিশ শিক্ষককে গ্রেপ্তার করল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি কৃষ্ণনগর জেলা আদালত ধৃতদের জামিন মঞ্জুর করে। সরকারি আইনজীবীও এই জামিনের বিরোধিতা করেননি, যা প্রমাণ করে যে গ্রেপ্তারি ছিল ভিত্তিহীন। দুই হাজার টাকার বন্ডে মুক্তি পান আমির। এই তিনদিন আমিরের নয় বছরের শিশু পুত্র-সহ পরিবারের অন্য সদস্যরা আতঙ্কে ছিলেন। তিনি ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিএলও হিসেবে কাজ করছেন কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভায়। মুক্তির পরেই সেই কাজে যোগ দেন আমির।
ভুল বোঝাবুঝি?
আদালত সূত্রে খবর, অভিযোগকারী রশিদ শেখ এজলাসে জানান, ভুল বোঝাবুঝির কারণেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমির চাঁদের বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল। তিনি জানিয়েছেন, তাৎক্ষণিক বিবেচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি। পরে পুরো বিষয়টি বুঝতে পেরে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। আমির ও তার ভাই-বোনেরা জামিন পেলে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন রশিদ। আমিরের পরিবারের আইনজীবী জানিয়েছেন, ২৬ মে মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। সেদিন আদালতে হাজির থাকতে বলা হয়েছে অভিযুক্তদের। এর বাইরে আর কোনো শর্ত দেওয়া হয়নি।
কোতোয়ালি থানার আইসি অমলেন্দু বিশ্বাস সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, ‘৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধে নাগাদ খবর আসে, এক বয়স্ক মুসলিম মহিলার মৃত্যুর পরে তার চোখ চুরি হয়েছে। মৃতের ছেলেমেয়েরাই চোখ বিক্রি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ আসে। সে দিন গ্রামে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। মৃতের অন্য অঙ্গও চুরি গিয়েছে বলে সন্দেহ করে অভিযোগ আসায় আমরা দেহ ময়নাতদন্তে পাঠাই। মঙ্গলবার কল্যাণীর জেএনএম হাসপাতালে ময়নাতদন্ত হয়েছে। রিপোর্টে জানতে পেরেছি, মৃতের শরীরের (চোখ ছাড়া) অন্য কোনও অঙ্গ খোওয়া যায়নি।’ গ্রামবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে আমির ও তার ভাই-বোনদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গ্রেপ্তারি নিয়ে প্রশ্ন
প্রশ্ন উঠছে, সঠিক তথ্য যাচাই ছাড়াই একজন সম্মানিত শিক্ষক ও তার পরিবারকে কেন গ্রেপ্তার করা হল? এ প্রসঙ্গে আমির চাঁদ শেখ ডিডাব্লিউকে বলেন, "আমি দীর্ঘ প্রায় ১৪-১৫ বছর ধরে সামাজিক কাজ করছি। এবং ২০২৩-এ আমার কর্নিয়া কালেকশনের ওপর ট্রেনিং নেওয়া রয়েছে। সার্টিফিকেট আছে। তাই বিনা নথিতে আমি কোনো কাজ করতে পারি না। আমাকে থানায় আটকে রেখেও একবারের জন্য আমাকে বলল না, আপনাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এই ধারাতে, এটা আপনার অপরাধ।"
চক্ষুদানের মত একটা মহৎ কাজ করতে গিয়ে হেনস্থা হতে হল বলে তিনি বিস্মিত। বলেন, ''কোতোয়ালি থানার আইসি সাহেব, তিনি বলছেন, হাসপাতাল ছাড়া কর্নিয়া সংগ্রহ করা যায় না ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়। অথচ ভারতীয় স্বাস্থ্য বিভাগের যে আইন রয়েছে, তাতে বলছে বাড়ি বা হাসপাতাল যে কোনো জায়গা থেকে আপনি কালেকশন করতে পারেন। একটা নির্দিষ্ট সময় রয়েছে, ওই সময়ের মধ্যে কর্নিয়া তুলে আই ব্যাঙ্কে যোগাযোগ করতে হয়।"
চক্ষুদানকে কেন্দ্র করে এই ঘটনাকে 'ভয়াবহ' বলে আখ্যা দিয়েছেন মনো-সমাজকর্মী মোহিত রণদীপ। তিনি বলেন, "অভিযোগকারীরা অজ্ঞতা থেকে অভিযোগ করতেই পারেন, কিন্তু প্রশাসনের সংবেদনশীল হওয়া উচিত ছিল। পুলিশের সাধারণ জ্ঞানটুকুও নেই যে কোনটা অপরাধ আর কোনটা মহৎ কাজ। যেখানে নিঃশর্ত মুক্তি পাওয়ার কথা, সেখানে জামিন দিয়ে মামলা জারি রাখা হয়েছে, এটাও দুর্ভাগ্যের।"
ঘটনার দ্রুত গ্রেপ্তারি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, "পুলিশ সাধারণত নিষ্ক্রিয় থাকলেও এই ক্ষেত্রে অদ্ভুত প্রো-অ্যাক্টিভনেস দেখিয়েছে। মনে হচ্ছে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা 'দাদা-দিদি'দের ইশারাতেই পুলিশ নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।"
অঙ্গদান ও পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী ডিডাব্লিউকে বলেন, "১৯৯৪ সালের রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী মৃতদেহ বা অঙ্গদানকে উৎসাহিত করার কথা বলা হলেও, পুলিশ মৌলবাদীদের কথায় প্ররোচিত হয়ে আমির চাঁদ শেখকে গ্রেপ্তার করে সেই আইন লঙ্ঘন করেছে। আমির যখন প্রিয়জনের চোখ দান করে দৃষ্টিহীনদের আলো দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন পুলিশি পদক্ষেপ পরোক্ষভাবে অঙ্গ পাচারচক্রকে উৎসাহিত করছে এবং সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।"
সরকারের দায়িত্ব
মরণোত্তরে চক্ষুদান বা অঙ্গদান কর্মসূচিগুলি সফল করার ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ আরো বেশি জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মোহিত রণদীপ বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে চক্ষুদান আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোর অ্যানাটমি বিভাগ দেহ নিতে টালবাহানা করে। দেহ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নেই। স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য ন্যূনতম প্রচার বা হোর্ডিং পর্যন্ত দেখা যায় না।"
তার মতে, "মরণোত্তর দেহদান চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্রদের পড়াশোনা এবং ক্যাডাভার ট্রান্সপ্লান্টের (অঙ্গ প্রতিস্থাপন) জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সরকার উদাসীন। বেসরকারি স্তরে কিছু কাজ হলেও মফস্সল বা গ্রামাঞ্চলে সেই সচেতনতার আলো পৌঁছচ্ছে না।"
সুবর্ণ গোস্বামী বলেন, "আরজিকর বা বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ থেকে যখন শাসকদলের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে মৃতদেহ ও অঙ্গ পাচারের অভিযোগ ওঠে, তখন পুলিশ নীরব থাকে। অথচ আইনসম্মতভাবে অঙ্গদান করতে গেলে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করা হয়।"
আমাদের সমাজে কি পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই? আমির চাঁদ শেখ বলেন, " প্রশাসন আমাদের ওপর যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছে এতে সচেতনতার আরও ক্ষতি হবে। প্রশাসনের এই সমস্ত দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের বিশেষ করে সচেতন হতে হবে বা আইনগুলো জানতে হবে। তারাই যদি উল্টো দিকে চলে যান, তাহলে আর কী করে সমাজ এগোবে?"
অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টরস-এর রাজ্য সাধারণ সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রেস বিবৃতিতে বলেছেন, "চক্ষুদানের মতো একটি সম্পূর্ণ আইনসম্মত, মানবিক ও বৈজ্ঞানিক চেতনাসম্পন্ন উদ্যোগকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার অর্থ মানব অঙ্গ ও কলা প্রতিস্থাপন আইনকে (১৯৯৪) সরাসরি লঙ্ঘন করা। অবিলম্বে আমিরের বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত মামলা প্রত্যাহার, তার নিঃশর্ত মুক্তি এবং রাজ্যে আইনসম্মত অঙ্গদানে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।"
'জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ সমন্বয় মঞ্চ'-এর পক্ষ থেকে অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারের শাস্তি এবং আমির চাঁদ শেখকে সরকারিভাবে পুরস্কৃত করার দাবি জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি অঙ্গদানের সমর্থনে এবং পাচার চক্রের বিরুদ্ধে কলকাতায় বড় কনভেনশনের আয়োজন ও আমিরকে গণ সংবর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
চক্ষুদানের খুঁটিনাটি
এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা জানিয়েছেন, চক্ষুদানের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। মৃত্যুর পরে মাত্র চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে কর্নিয়া সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট মিডিয়ামে রাখতে হয় এবং দ্রুত মেডিক্যাল কলেজে পাঠাতে হয়। নদিয়া জেলায় প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন মরণোত্তর চক্ষুদান করছেন। এমনকী মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও কর্নিয়া দানের প্রবণতা বাড়ছে।
যদিও এখনো দেহ বা চক্ষুদানের নিয়মকানুন সম্পর্কে অনেকেই সচেতন নন। তাদের উদ্দেশে আমির বলেন, "যদি কোনো ব্যক্তি মারা যান, তবে তার পরিবার-পরিজন বা নিকটাত্মীয়রা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিষয়টি কাছের কোনো আই ব্যাঙ্ক বা যে কোনো হাসপাতালকে জানাতে পারেন। অনেকের কাছে নির্দিষ্ট আই ব্যাঙ্কের নম্বর থাকে না। সেক্ষেত্রে নিকটস্থ যে কোনো হাসপাতালে যোগাযোগ করলে, তারা নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে বা প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে বাধ্য। এটি সরকারি নিয়মের মধ্যেই পড়ে।"
আগে থেকে অঙ্গীকার করা না থাকলেও দেহ বা চক্ষুদান করা যায়। তিনি বলেন, "অনেকেই মনে করেন যে আগে থেকে অঙ্গীকারপত্র পূরণ করা না থাকলে অঙ্গদান করা যায় না। কিন্তু এটি ভুল ধারণা। অঙ্গীকারপত্র মূলত একটি প্রচারের অংশ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির উপায়। প্রকৃত নিয়ম অনুযায়ী, মৃত্যুর পরে পরিবারের সম্মতিই প্রধান।"
আন্দোলন ধাক্কা খাবে?
নদিয়ার ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে অজ্ঞতা। এই ধরনের ঘটনা সামাজিক আন্দোলনের অপূরণীয় ক্ষতি করছে বলে মোহিত রণদীপ মনে করেন। তার ভাষায়, "সংবিধানে বিজ্ঞানমনস্কতা বাড়ানোর কথা বলা থাকলেও প্রশাসন অবৈজ্ঞানিক ধারণাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই ধরনের হয়রানি দেখলে সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে চক্ষু বা দেহদানে ভয় পাবেন। মহৎ এই আন্দোলনটি বড়সড় বাধার মুখে পড়বে।"
আমির বলেন, "অভিযুক্ত আইসি-সহ নয় জনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও শাস্তির জন্য আমি সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি। স্বাস্থ্য দপ্তর ও প্রশাসনের উচিত এই বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। তা না হলে অঙ্গদান নিয়ে জনমনে ভীতি ও ভুল ধারণা তৈরি হবে, যার ফলে ভবিষ্যতে কেউ অঙ্গদানে উৎসাহিত হবে না এবং আমরাও সামাজিক হেনস্থার শিকার হব।"
এত বড় ঝক্কির মুখে পড়লেও পিছু হঠছেন না সমাজকর্মী আমির। ডিডাব্লিউকে বলেন, "আমাদের নদীয়া জেলায় মানুষের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন মরণোত্তর চক্ষুদান করছেন। এমনকি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও কর্নিয়া দানের প্রবণতা বাড়ছে।
সম্প্রতি পুলিশি নিগ্রহ এবং যে অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে, তাতে এই সামাজিক আন্দোলনে বড়সড় ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। অভিযুক্ত আইসি এবং বাকিদের বিরুদ্ধে যদি সরকার অবিলম্বে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা না নেয়, তবে সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে এই মহৎ কাজে এগিয়ে আসতে সাহস পাবে না। আমাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হলেও, ন্যায়ের দাবিতে এবং এই সচেতনতা টিকিয়ে রাখতে আন্দোলন চলবে।"