মুর্শিদাবাদে গণপিটুনি: ১৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে বাবা ও ছেলেকে পিটিয়ে খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত ১৩ জনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিল জঙ্গিপুর মহকুমা আদালত। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)-র ১০৩(২) ধারায় এ রাজ্যে এটাই প্রথম সাজা ঘোষণার নজির।
কী ঘটেছিল?
ঘটনার সূত্রপাত গত এপ্রিল মাসে। ওয়াকফ সংশোধনী বিল বিরোধী আন্দোলনের সময় রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে। অভিযোগ, সেই উত্তেজনার আবহে বাড়ির দরজা ভেঙে ৭২ বছরের হরগোবিন্দ দাস এবং তার ৪০ বছরের ছেলে চন্দন দাসকে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তায় বের করে আনে উন্মত্ত জনতা। প্রকাশ্য রাস্তায় তাদের ওপর চলে অকথ্য অত্যাচার। গণপিটুনির জেরে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় বাবা ও ছেলের।
কড়া পদক্ষেপ
এই ঘটনার পরে ২৫ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল সিট গঠন করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডে তল্লাশি চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে পুলিশ। ৯৮৩ পাতার চার্জশিটে খুনের পাশাপাশি দাঙ্গা বাধানো, ডাকাতি ও অনধিকার প্রবেশের মতো একাধিক জামিন অযোগ্য ধারা যুক্ত করা হয়।
ঐতিহাসিক রায়
মঙ্গলবার জঙ্গিপুর আদালতের বিচারক অমিতাভ মুখোপাধ্যায় অভিযুক্ত ১৩ জনকেই দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। সেই সঙ্গে প্রত্যেককে আর্থিক জরিমানার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, এ ধরনের মব লিঞ্চিংয়ের ঘটনায় অপরাধীদের কোনোভাবেই রেয়াত করা হবে না। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে ১৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
সরকারি কৌঁসুলি বিভাস চট্টোপাধ্যায় ডিডাব্লিউকে বলেন, "এই রায় গুরুত্বপূর্ণ। গণপিটুনি বা মব লিঞ্চিং আগে ইন্ডিয়ান পিনাল কোডে ছিল না, এখন বিএনএস-এর মধ্যে এসেছে। এখন আমাদের দেশে দল বেঁধে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষকে মারা বা ভয় দেখানোর মতো ঘটনা ঘটে চলেছে একের পর এক। পুনাওয়ালা রায়ে সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছে যে, এই ধরনের মামলার ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজ্য, কেন্দ্র সরকার, বিচার বিভাগ, তদন্তকারী সংস্থা-সহ সবাইকে খুব কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কোর্টকে ডে-টু-ডে ট্রায়াল করতে হবে।"
কেন রায় ঐতিহাসিক
উত্তরপ্রদেশে গণপিটুনির বিরুদ্ধে প্রথম রায় মিলেছে এই ডিসেম্বর মাসেই। গত বছরে সে রাজ্যের বাহরাইচে রামগোপাল মিশ্রকে উন্মত্ত জনতা পিটিয়ে মারে। এই ঘটনায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুসারে ১০ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। একজনকে মৃত্যুদণ্ড ও বাকিদের যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা দিয়ে দেয় স্থানীয় আদালত।
ন্যায় সংহিতা অনুসারে একই অপরাধে পশ্চিমবঙ্গে গণপিটুনির বিরুদ্ধে দেশের মধ্যে দ্বিতীয় রায় দেয়া হয়েছে।
দুটি মামলার অভিযোগ ব্যাখ্যা করে বিভাস চট্টোপাধ্যায় বলেন, "গণপ্রহারের সঙ্গে দাঙ্গাও প্রমাণিত হয়েছে। দল বেঁধে ভয় দেখানো—ধর্মের নামেই হোক, জাতির নামেই হোক, যেকোনো ভাবেই নিরীহ মানুষকে সন্ত্রস্ত করা, ভয় দেখানো এবং তাদের বাড়ি থেকে বের করে করে এনে মারা— এই সমস্ত ঘটনা মামলাতে ছিল।"
তিনি ব্যাখ্যা করেন, "আমি একটা জিনিস ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, অপরাধের কোনো ধর্ম হয় না। এই পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের রায় অবশ্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গণপ্রহারের শিকার হয় নিরীহ মানুষ। যারা এ ধরনের কাজ করে, তারা এই রায়টা মনে রাখুক এবং একটু ভয় পাক। আইনকে ভয় পেলেই হবে, আর কিছু চাই না।"
সাবেক পুলিশ কর্তা নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, "অধিকাংশ ক্ষেত্রে তো গণপিটুনির সাক্ষী পাওয়া যায় না, প্রমাণ হয় না, ছাড়া পেয়ে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের সাজা হয়েছে। একটা সাজা হলে তো মানুষ ভয় পাবে, ছাড়া পেয়ে গেলে ভয় পায় না। অতএব এটা ভালো হয়েছে।"
বিতর্ক কেন
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা এবং তৃণমূল নেতাদের ভাষণের সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, তৃণমূলের নেতা মন্ত্রীদের বক্তব্যের ফলে অপরাধীরা সাহস পেয়েছে।
রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা বলেন, "অপরাধীদের শাস্তি হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, এই সরকার অপরাধের সঙ্গে কোনো আপস করে না।"
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
মানবাধিকার কর্মী রঞ্জিত শূর সামশেরগঞ্জের জাফরাবাদে হত্যা মামলার তদন্তে প্রযুক্তিগত প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তার মতে, "এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয়েছে। সাধারণত একটি ছোট মামলা শেষ হতে পাঁচ-ছয় বছর সময় লাগে, সেখানে এই মামলার রায় মাত্র আট মাসের মধ্যে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মামলাটি প্রাথমিকভাবে সম্পত্তি বা জমি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে শুরু হয়েছিল বলে জানানো হলেও, শেষ পর্যন্ত বিচার হয়েছে গণপিটুনির ধারায়। এই বৈপরীত্য বিভ্রান্তিকর।"
অন্যদিকে নজরুল ইসলাম বলেন, "বিচারক যদি মনে করেন যে কোনো সন্দেহের ঊর্ধ্বে এটা প্রমাণিত হয়েছে, এরা অপরাধ করেছে, তখনই সাজা হয়। সামান্যতম সংশয় থাকলে অভিযুক্ত বেনিফিট অফ ডাউট পায়। অতএব কোর্ট যখন সাজা দিয়েছে, তখন নিশ্চিতভাবে বিচারক মনে করেছেন যে, এরাই খুন করেছে।"
সাবেক পুলিশ কর্তার মতে, "সব বিচারই এর থেকেও তাড়াতাড়ি হওয়া উচিত, তবেই তা কার্যকরী হয়। এক্ষেত্রে রাজ্য প্রশাসনের এতটাই মুখ পুড়েছে যে, তারা অন্তত দেখাতে চাইছে যে ঠিকঠাক তদন্ত হয়েছে। এটা এতটাই জঘন্য অপরাধ ছিল যে কিছু না করলে আরও তাদের ক্ষতি হতো, সেই জন্য করেছে।"
বিচারে প্রযুক্তির সহায়তা
পুরো মামলার রায় মূলত সিসিটিভি ফুটেজ, গুগল ম্যাপস এবং 'গেট প্যাটার্ন অ্যানালিসিস' (হাঁটার ধরন বিশ্লেষণ) এর মতো প্রযুক্তিগত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে।
রঞ্জিত শূর বলেন, "এই প্রযুক্তিগুলো অত্যন্ত দুর্বল। ভিডিও ফুটেজে মানুষের চেহারা বা কথা পরিষ্কার বোঝা যায় না, সেখানে হাঁটার ধরন দেখে কাউকে চিহ্নিত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এই মামলায় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না এবং এফআইআর-এ অভিযুক্তদের নামও ছিল না।"
এই রায় কি জনতার গণপিটুনির প্রবণতা কমাতে পারবে?
প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, "ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি কঠোর থেকে কঠোরতম সাজা কিছু কিছু মানুষ পেয়েছেন। সেই সাজার ফলেই যে অপরাধ প্রবণতা কমে গিয়ে, তা নয়। অপরাধ প্রবণতার জন্ম হয় বিভিন্ন কারণ থেকে। গণপ্রহার বিভিন্ন রাজ্যে, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের মদতে হচ্ছে। উত্তরপ্রদেশে মহম্মদ আখলাককে খুন করা হয়েছিল এই অভিযোগে যে তার বাড়িতে নাকি গোমাংস আছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য রাজ্য সরকার তৎপর হয়েছে। কিন্তু আদালত শেষ পর্যন্ত রাজ্যে দাবিকে মান্যতা দেয়নি। সেটা একটা ইতিবাচক দিক। এভাবে অপরাধে প্রশ্রয় কারা দিলেন? প্রশ্রয় দিল একটি রাজনৈতিক শক্তি যারা অভিযুক্তদের মুক্তির চেষ্টা করে ন্যায়বিচারকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছেন।"