উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশ অগ্রগতির অনেক পরিচয় দিলেও টয়লেটের অভাব আজও একটা বড় সমস্যা৷ এর পরিণতি পরিবেশ দূষণ সহ স্বাস্থ্যের নানা সমস্যা৷ জার্মানিতে এমন এক কমোড উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা এই সমস্যার সমাধান করতে পারে৷
ছবি: DW
বিজ্ঞাপন
স্বয়ংসম্পূর্ণ টয়লেট দিয়ে মুশকিল আসান | অন্বেষণ
03:44
This browser does not support the video element.
পয়ঃ-প্রণালীর অভাব
বিশ্বের বহু দেশেই এ ধরনের দৃশ্য দেখতে পাওয়া যাবে৷ রোগ-জীবাণু ভর্তি ময়লা পানি বা জল৷ হাজার মানুষের মলমূত্র সেখানে গিয়ে পড়ার ফলে তা থেকে প্রতিদিন পাঁচ হাজার শিশু প্রাণ হারায়৷ কোটি কোটি মানুষ এই দূষণের ফলে অসুখে পড়েন৷ আবিষ্কারক রাল্ফ অটারপোল বলেন, ‘‘কার্যকরী পয়ঃ-প্রণালী না থাকার ফলে জনস্বাস্থ্যে নানা রকম সমস্যার সৃষ্টি হয়, যেমন কলেরা ও অন্যান্য পেটের রোগ৷ শিশুদের বিশ-পঁচিশবার পেট নামলে অনেক সময়ে তারা তা থেকেই মারা যায়, যা অতি দুঃখজনক৷''
নতুন দিশা
রাল্ফ অটারপোল একটি নতুন ধরনের কমোড উদ্ভাবন করেছেন, যা সারা বিশ্বে লাখ-লাখ শিশুর জীবন বাঁচাতে সক্ষম৷ এই কমোডের দাম একশো ইউরোর বেশি হবে না, অথচ মলমূত্র বাইরের জলে গিয়ে পড়বে না৷ অটারপোল বলেন, ‘‘এই কমোডের বৈশিষ্ট্য হলো, এর যা আয়তন, তাতে একটি পরিবারের এক সপ্তাহের মলমূত্র, শুচিকর্মের পানি ইত্যাদি কমোডেই জমা থাকতে পারবে৷ এক সপ্তাহ পরে সেগুলো পাম্প করে বার করে দিতে হবে৷ কাজেই এই কমোড ব্যবহার করার সময় যতো কম জল খরচ করা যায়, ততোই ভালো৷ সে জন্য এই শাওয়ার-হেডটি রাখা হয়েছে৷ এই কমোড বসে কিংবা উবু হয়ে ব্যবহার করা চলে, যে দেশে যেরকম প্রথা৷''
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহারের হার ক্রমশ বাড়ছে৷ তবে এখনো অনেক মানুষের কাছে এই সুবিধা পৌঁছায়নি৷ ঠিক কত শতাংশ মানুষ টয়লেট ব্যবহার করছে তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক৷
ছবি: DW
বেড়েছে টয়লেটের ব্যবহার
একটা সময় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অধিকাংশ বাড়ির কোনায় খোলা শৌচাগার দেখা যেত৷ খালের পাশে, পুকুরের কোনায় থাকতো মলত্যাগের স্থান৷ এখন পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে৷ সরকারি হিসাব বলছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবার স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহার করছে৷
ছবি: DW/K. James
শতাংশের হিসাব
বাংলাদেশে ঠিক কত শতাংশ মানুষ টয়লেট ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছেন তার একটা হিসেব পাওয়া যায় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে৷ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে দেওয়া বাজেট বক্তৃতায় জানান, ‘‘আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় ৯০ শতাংশ পরিবারকে স্যানিটেশনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে৷’’
ছবি: DW/A. Chatterjee
তবুও সমালোচনা
তবে অর্থমন্ত্রীর দাবির সঙ্গে একমত প্রকাশ করেননি এসংক্রান্ত একজন বিশেষজ্ঞ৷ ওয়াটারএইড বাংলাদেশের ডা. মো. খায়রুল ইসলাম ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মতামত পাতায় লিখেছেন, ‘‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০১৩ সালের মধ্যে সবার জন্য স্যানিটেশন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল৷’’ কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক অনেক বলেই মনে করেন খায়রুল৷
ছবি: Lalage Snow/AFP/Getty Images
প্রতিশ্রুতি কি পূরণ হয়েছে?
জুন মাসে প্রকাশিত লেখায় খায়রুল অর্থমন্ত্রীর বিভিন্ন সময়ের বাজেট বক্তৃতা পর্যালোচনা করেছেন৷ এতে দেখা যাচ্ছে, গত এক বছরে বাংলাদেশে স্যানিটেশনের কভারেজ এক শতাংশ কমেছে৷ খায়রুল ইসলাম তাঁর নিবন্ধে আরেকটি হিসেব দিয়েছেন যার সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের কোন মিল নেই৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের সদ্যপ্রকাশিত যৌথ প্রতিবেদন ২০১৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশে উন্নত ল্যাট্রিনের হার ৫৫ শতাংশ৷’’
ছবি: PRAKASH SINGH/AFP/Getty Images
তবে কাজ চলছে
স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিতে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কাজ এগিয়ে চলেছে৷ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ২৪৮টি উপজেলার গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণের নিকট টেকসই ও সমন্বিত ওয়াটার, স্যানিটেশন ও হাইজিনসেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে অস্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন, দূষিত পানি এবং অনিরাপদ স্বাস্থ্য অভ্যাসের কারণে সৃষ্ট দূষণচক্রের অবসানকল্পে কাজ করছে সংস্থাটি৷
ছবি: picture-alliance/dpa
যে কারণে প্রয়োজন স্যানিটেশন
স্যানিটেশনের অভাবের কারণে পৃথিবীতে প্রতিদিন পাঁচ হাজার শিশু প্রাণ হারায়৷ যেখানে-সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করলে তা আশেপাশের পরিবেশে এবং পানিতে রোগ, জীবাণু ছড়ায়৷ আর সেই পানি ব্যবহার করলে মানুষের শরীরে দেখা দেয় কলেরা, ডায়রিয়াসহ নানা রোগ৷ এতে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে৷
ছবি: picture-alliance/dpa
বিকল্প ব্যবস্থা
স্বল্প খরচে নিরাপদ টয়লেট নিশ্চিতে চলছে নানাবিধ গবেষণা৷ সম্প্রতি জার্মানির বিজ্ঞানীরা এক নতুন ধরনের কমোড আবিষ্কার করেছেন যা ব্যবহার অত্যন্ত সহজ৷ আর তৈরিতে খরচও কম৷ এই কমোড থেকে রোগ, জীবাণু সহজে বাইরে যাবে না৷ বরং এতে থাকা মলমূত্র দিয়ে সার তৈরি সম্ভব হবে৷
ছবি: DW
7 ছবি1 | 7
কমোডের ভেতরে আবর্জনা পচে উঠে যাতে গন্ধ না হয়, সেজন্য ল্যাক্টিক অ্যাসিড ব্যাকটিরিয়া আর শর্করার একটি সংমিশ্রণ যোগ করা হয়৷ অটারপোল বলেন, ‘‘এটা যেমন ল্যাক্টিক অ্যাসিড গেঁজিয়ে করা একটি সলিউশন৷ এভাবে আমরা রোগজীবাণু মেরে ফেলতে চাই, যুগপৎ দুর্গন্ধ আটকাতে চাই৷''
বাস্তব প্রয়োগ
বিজ্ঞানীরা হামবুর্গের কেন্দ্রীয় রেল স্টেশনের টয়লেট থেকে নেওয়া মলমূত্র পরীক্ষা করে দেখছেন, কী পরিমাণ শর্করা দিলে টয়লেটে ল্যাক্টিক অ্যাসিড ব্যাকটিরিয়াগুলি ঠিকমতো বাড়তে পারে৷ টয়লেটের আবর্জনা একটি মিশ্র সার তৈরির কারখানায় নিয়ে গিয়ে সেখানে কাঠকয়লার সঙ্গে মিশিয়ে শুকিয়ে নেওয়া হয়৷ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা থেকে টেরা প্রেটা নামের যে কালো মাটির মতো দেখতে মিশ্র সার তৈরি হয়, তা খুবই কার্যকরী৷
কাঠকয়লা মেশানোটাই এই ‘কালোমাটির' বৈশিষ্ট্য৷ এই কাঠকয়লাতেই পুষ্টিকর পদার্থ বহন করে, এখানে অণুজীবরা বাসা বাঁধে৷ কাঠকয়লা বিপুল পরিমাণ জল ধরে রাখতে পারে৷ এশিয়া-আফ্রিকার গ্রামে-গ্রামে, শহরে-শহরে যে কাঠ পুড়িয়ে রান্না হয়ে থাকে, তা থেকেই যথেষ্ট কাঠকয়লা পাওয়া যেতে পারে৷ রাল্ফ অটারপোল-এর ‘মিশ্র সার কমোডের' জন্য তা বিশেষভাবে উপযোগী৷
কমোডের ময়লার সঙ্গে কাঠকয়লা যোগ করে সৃষ্ট মিশ্র সার প্রধানত পুনর্বনায়ন প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে, যা জলবায়ুর পক্ষেও মঙ্গলজনক৷ অটারপোল বলেন, ‘‘টেরা প্রেটা মিশ্র সার দিয়ে আমরা জমি এমনভাবে তৈরি করতে পারি, যাতে মাটিতে আরো বেশি পানি ধরা থাকবে৷ সেই জল ধীরে ধীরে বাতাসে ছড়ানোর ফলে স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় থাকবে৷ এভাবে এই কমোডের ব্যবহার সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের উপর তার একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বৈকি৷''
টয়লেটে ফ্লাশের চেন টানা হল মান্ধাতার আমলের ব্যাপার৷ ভবিষ্যতের কমোড থেকে পানিতে ময়লা গিয়ে পড়বে না, বরং জমিতে সার দেওয়া যাবে, জলবায়ুর উন্নতি ঘটবে৷
বিশেষ ঘোষণা: এই সপ্তাহের অন্বেষণ কুইজে অংশ নিতে ক্লিক করুন এখানে