বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন৷ তাঁরা বলেছেন, স্বাধীনতা বিরোধী এবং মানবতা বিরোধী অপরাধে জড়িত এই দলটির বাংলাদেশে রাজনীতি করার কোন অধিকার নেই৷
ছবি: REUTERS
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার ঢাকায় ‘রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ' ব্যানারে নাগরিক সমাজের জাতীয় নাগরিক সম্মেলনে এই দাবি জানান হয়৷ এই নাগরিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে৷ শিক্ষাবিদ অধাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন৷ তাঁরা বলেন, জামায়াতে ইসলামী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দলগতভাবে বিরোধিতা করেছে৷ আর তখন তারা মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছে৷ তারা কখনোই তাদের এই অবস্থান থেকে সরে আসেনি৷ আর সাম্প্রতিক সময় সারা দেশে ব্যাপক সহিংসতার মাধ্যমে জামায়াত নিজেকে একটি সন্ত্রাসী দল হিসেবে প্রামাণ করেছে৷ তাই অবিলম্বে সরকারকে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে৷
সাঈদীকে ফাঁসির রায়, জামায়াতের তাণ্ডব
একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের একাধিক অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় বৃহস্পতিবার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল৷ এই রায় ঘোষণার পর গোটা বাংলাদেশে তাণ্ডব চালিয়েছে জামায়াত-শিবির৷ এতে হতাহত অনেক৷
ছবি: AFP/Getty Images
ট্রাইব্যুনালের রায়
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজসহ মানবতা বিরোধী অপরাধের কথা বলা হয়েছে৷ কয়েকটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল-১ এর প্রধান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন৷ অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানান, তার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী ২০টি অভিযোগের ৮টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে৷
ছবি: AP
রায়ের পরই তাণ্ডব
সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরপরই রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় হয়ে ওঠে জামায়াত-শিবির৷ শুধু বৃহস্পতিবার বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে কমপক্ষে ৩৫ ব্যক্তি৷ বার্তাসংস্থা এএফপি এবং আমাদের কন্টেন্ট পার্টনার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিশ্চিত করেছে এই তথ্য৷ তবে শুক্রবার মৃতের সংখ্যা আরো বেড়েছে৷
ছবি: Reuters
আক্রান্ত পুলিশ
বৃহস্পতিবার জামায়াতের তাণ্ডবে প্রাণ হারান চার পুলিশ সদস্য৷ এদের মধ্যে তিনজন নিহত হন গাইবান্ধা জেলায়৷ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকম জানিয়েছে, ‘পুলিশ ফাঁড়িতে পিটিয়ে মারা হয় তাদের’৷ অপর একজন প্রাণ হারান চট্টগ্রামের লোহাগড়ায় সংঘর্ষের সময়৷ বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আহত এক পুলিশ সদস্য শুক্রবার প্রাণ হারান৷ সবমিলিয়ে সাঈদীর রায় ঘোষণার পর শুক্রবার দুপুর অবধি পুলিশ সদস্য নিহতের সংখ্যা ৫৷
ছবি: STR/AFP/Getty Images
‘অধিকাংশই জামায়াত-শিবির কর্মী’
জামায়াত দাবি করেছে, ‘‘পুলিশের গুলিতে তাদের ৫০ জন ‘নিরপরাধ’ সমর্থক নিহত হয়েছে৷ পুলিশ তাদেরকে ‘পাখির মতো গুলি করে’ হত্যা করেছে৷’’ তবে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রধান সুলতানা কামাল পুলিশের উপর সন্ত্রাসী হামলার জন্য জামায়াতকে দায়ী করেছেন৷
ছবি: AFP/Getty Images
প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ মানুষও
জামায়াতের তাণ্ডবে পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন, নিহত হয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থকও৷ তবে সাধারণ মানুষও মরছে এই তাণ্ডবে৷ ঢাকায় বৃহস্পতিবার প্রাণ হারান এক পথচারী, নোয়াখালি এবং বাঁশখালীতে নিহত হন হিন্দু সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তি৷ শুক্রবারও গাইবান্ধায় এক রিকশা চালক নিহত হয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের এবং জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যকার সংঘর্ষের মাঝে পড়ে৷ নিরীহ প্রাণহানির এরকম খবর আরো শোনা যাচ্ছে৷
ছবি: AFP/Getty Images
‘ফেসবুক বন্ধ’
সাঈদীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার সময় বাংলাদেশ থেকে কম্পিউটার ব্যবহার করে স্বাভাবিক উপায়ে ফেসবুকে প্রবেশ করা যাচ্ছিল না৷ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি’র ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াসউদ্দিন আহমেদ জানান, ‘কারিগরি সমস্যার জন্য এমনটা হয়েছে’৷ তবে তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জাকারিয়া স্বপন বলেন, ‘বৃহস্পতিবার তারা (বিটিআরসি) কিছুক্ষণের জন্য ফেসবুক বন্ধ করে দিয়েছিল এবং পুনরায় আবারো চালু করেছে৷’
সতর্ক নিরাপত্তা বাহিনী
জামায়াত-শিবির তাণ্ডব আর নাশকতা রুখতে গোটা দেশে সতর্ক রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা৷ বৃহস্পতিবার রাতেই বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি৷
ছবি: Reuters
ভিন্ন চিত্র
তবে সাঈদীর ফাঁসির রায়ে সামগ্রিকভাবে সন্তুষ্ট সাধারণ মানুষ৷ বৃহস্পতিবার এই রায় ঘোষণার পর উল্লাসে ফেটে পড়েন শাহবাগে অবস্থানরতরা৷ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় মিষ্টি বিতরণ করা হয়৷ ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানান অগুনতি মানুষ৷
ছবি: Reuters
‘শহীদের আত্মা শান্তি পাবে’
সাঈদীর বিরুদ্ধে একটি মামলার বাদি ও প্রথম সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার৷ রায় ঘোষণার পরে ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হওয়ায় দেশমাতৃকা কিছুটা পাপমুক্ত হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির জন্য ৪২ বছরের অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে৷’
ছবি: DW/Harun Ur Rashid
আরো রায় বাকি
এখন পর্যন্ত তিন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল৷ বাকি আছে আরো যুদ্ধাপরাধীর বিচার৷ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি অপেক্ষায় আছে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার দেখার৷ বর্তমান তরুণ প্রজন্মও তাই জেগে আছে প্রজন্ম চত্বরে৷
ছবি: AP
10 ছবি1 | 10
সাংবাদিক আবেদ খান ডয়চে ভেলেকে জানান, পৃথিবীর কোন দেশে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি রাজনীতি করতে পারেনা৷ তাদের কোন রাজনৈতিক দলকে অনুমোদন দেয়া হয়না৷ আর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী শক্তি হিসেবে সাংবিধানিকভাবেই জামায়াতের এদেশে রাজনীতি করার কোন অধিকার নেই৷
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘‘জামায়াতকে রাজনৈতিক দল বলাই ঠিক না৷ তারা হত্যা, নৈরাজ্য, ও ঘৃনার সৃষ্টি করেছে৷ এরকম দলকে দুনিয়ার কোন দেশে রাজনীতি করতে দেয়া হয়না৷ জামায়াতকে রাজনীতি করতে দেয়া একটি জাতিগত ভুল৷'' এই ভুল শুধরিয়ে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বলেন তিনি৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত তার যে সহিংস রূপ প্রকাশ করেছে তাতেই এই দলটি নিষিদ্ধ করা দরকার৷ তারা বাংলাদেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে৷ সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর এবং তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে প্রমাণ করেছে তারা একটি ফ্যাসিষ্ট দল৷ কোন ফ্যাসিষ্ট দল বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবেনা৷''
টিআইবি'র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেন, ‘‘জামায়াত- শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করতে হবে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধ করতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে যেতে হবে৷ বাংলাদেশকে তালেবানি রাষ্ট্র বানাবার পাঁয়তারা রুখতে হবে৷''
সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. জাফর ইকবাল, সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক, ড. সনজীদা খাতুন, কামাল লোহানী, খুশী কবির, ড. আব্দুল মান্নান, অধ্যাপক এম এম আকাশ, অজয় রায়, রামেন্দু মজুমদার, কাইয়ুম চৌধুরীসহ আরো অনেক বিশিষ্ট নাগরিক৷
‘সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত তার যে সহিংস রূপ প্রকাশ করেছে তাতেই এই দলটি নিষিদ্ধ করা দরকার’ছবি: Reuters
সম্মেলনের ঘোষণা পাঠ করেন ড. সারওয়ার আলী৷ সংগঠকদের একজন সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. এ আরাফাত ডয়চে ভেলেকে জানান, তাঁরা তাদের এই ঘোষণাপত্রকেই দাবি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাবেন৷ আর এরপর পর্যায়ক্রমে বিভাগ এবং জেলা পর্যায়ে সম্মেলন করবেন৷ দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা থামবেন না৷