1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

লিভ-ইন সম্পর্ক অস্বীকার যাবে না: মুম্বাই হাইকোর্ট

২৫ জানুয়ারি ২০২৬

লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দিয়েছে ভারতের মুম্বাইয়ের হাই কোর্ট৷ বিশ্লেষকেরা বলছেন, আদালতের এই রায়ের ফলে সম্পর্কের পরিণতিতে আসা সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে৷

Indien | Bombay High Court
ছবি: Sandip Mahankal/ANI

শুধু বিয়ে করলেই সম্পর্কের সামাজিক ও আইনি দায়বদ্ধতা আসে আর লিভ-ইন সমবপর্কের ক্ষেত্রে তা ঝেড়ে ফেলা যায়- সমাজের এমন গতানুগতিক ধারণায় পরিবর্তনের রায় দিযেছ মুম্বাইয়ের আদালত৷

লিভ ইন রিলেশন বলতে এমন ধরনের সম্পর্ককে বুঝায় যেখানে বিয়ের আগে দুজন একসঙ্গে থাকেন৷ বিশ্বের অনেক সমাজেই এমন দম্পতিদের মধ্যে এমন সম্পর্ক রয়েছে৷  

আদালত জানিয়েছে, কোনও পুরুষ ও নারী যদি দীর্ঘ সময় ধরে স্বামী-স্ত্রীর মতো একসঙ্গে বসবাস করেন এবং তাদের সন্তান থাকে, তবে সেই সম্পর্ককে আইনিভাবে ‘বিয়ের মতো সম্পর্ক' হিসেবেই গণ্য করা হবে৷ শুধুমাত্র সামাজিক বা ধর্মীয় রীতি মেনে বিয়ে হয়নি বলে ওই নারীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না৷

ঘটনার প্রেক্ষাপট

মামলাটি ছিল এক দম্পতির৷ দীর্ঘদিন লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন তারা৷ তাদের একটি সন্তানও হয়৷ কিন্তু পরবর্তীকালে ওই যুবক সম্পর্কের দায় অস্বীকার করেন এবং অন্য এক নারীকে বিয়ে করেন৷

এরপর ওই তরুণী নিজের ও সন্তানের খোরপোশের দাবিতে নিম্ন আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন৷ নিম্ন আদালত ভরণপোষণের নির্দেশ দিলেও যুবকটি উচ্চ আদালতে পাল্টা আবেদন করে দাবি করেন, তাদের মধ্যে কোনও আইনি বিয়ে হয়নি, তাই তিনি খোরপোশ দিতে বাধ্য নন৷

আদালতের পর্যবেক্ষণ

রায়ে আদালত যুবকের এই যুক্তি খারিজ করে দেন৷ মামরার বিচারপতির পর্যবেক্ষণে বেশ কযেকটি উঠে আসে৷

আদালত পর্যবেক্ষণে বলে, দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে কেবল ‘শারীরিক চাহিদা' বা ‘ক্যাজুয়াল' তকমা দিয়ে দায় এড়ানো সম্ভব নয়৷ বিশেষ করে যখন সেই সম্পর্কের পরিণতিতে একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে৷

আদালত স্পষ্ট করে দেয়, গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ আইন শুধুমাত্র বিবাহিতদের জন্য নয়৷ লিভ-ইন সঙ্গিনীও এই আইনের আওতায় সমান আইনি সুরক্ষা এবং আর্থিক খোরপোশ পাওয়ার অধিকারী৷

সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে আদালত জানায়, পিতা হিসেবে সন্তানের প্রতি যুবকের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা অন্য কাউকে বিয়ে করলেও ঘুচে যায় না৷ নিম্ন আদালতের দেওয়া মাসিক খোরপোশের নির্দেশই বহাল রাখে হাই কোর্ট৷

আইনজ্ঞদের ব্যাখ্যা

আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় আসলে লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীদের সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে৷ অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষরা ‘বিয়ে হয়নি' বলে সম্পর্কের আইনি বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যান৷ মুম্বাই হাইকোর্টের এই রায় সেই পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতায় সজোরে ধাক্কা দিয়েছে৷

সমাজকর্মীরা এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, আধুনিক সভ্যতায় সম্পর্কের রূপ বদলালেও দায়িত্ববোধ বদলায় না, এই বার্তাই সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেয়া জরুরি ছিল৷

নারী কমিশনের সাবেক চেয়ারপারসন সুনন্দা মুখোপাধ্যায় মুম্বাই হাই কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়ে ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘কেবল মন্ত্রোচ্চারণ বা আইনি নথিপত্রই সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না৷ দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বোঝাপড়া ও দায়িত্ববোধই একটি সম্পর্কের আসল পরিচয়৷''

তার মতে, ‘‘লিভ-ইন সম্পর্কে সন্তান পালন ও একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা বিবাহিত জীবনের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ, তাই এই সম্পর্কের আইনি স্বীকৃতি পাওয়া অত্যন্ত জরুরি৷''

তিনি মনে করেন, ‘‘প্রথাগত বিয়েতে অনেক সময় সামাজিক ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের চাপে নারীর নিজস্ব সত্তা ক্ষুণ্ণ হয়৷ সেই তুলনায় লিভ-ইন সম্পর্কে একজন স্বনির্ভর নারী অনেক বেশি স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন৷ গার্হস্থ্য হিংসার হাত থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার কেবল বিবাহিতদের নয়, বরং একটি পরিবারে বসবাসকারী প্রতিটি নারীর থাকা উচিত৷''

সাহিত্যিক সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকা' শব্দবন্ধটির একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন৷ কোনো যুগল মাত্র একমাস একসঙ্গে থাকার পরও যদি সন্তানের জন্ম দেয় এবং তারপর বিচ্ছেদ ঘটে, তবে সেই পরিস্থিতির আইনি জটিলতাগুলো কী রয়েছে, সেটা পরিষ্কার হওয়া জরুরি৷''

তিনি বিগত কয়েক দশকের উদারপন্থী মানসিকতাকে বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘‘এটি অনেক ক্ষেত্রে সমাজের প্রচলিত কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে৷ অনেকে এর সুযোগ নিচ্ছে৷ এই প্রবণতা দূর করতে লিভ-ইন সম্পর্কের নারী ও পুরুষ উভয়কেই বিবাহের সমতুল্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন৷ বিশেষ করে নারীরাই সন্তান ও সংসারের দায়িত্ব পালনে বেশি স্ট্রাগল করেন, তাই তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল৷''

কেবল মন্ত্রোচ্চারণ বা আইনি নথিপত্রই সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না: সুনন্দা মুখোপাধ্যায়

This browser does not support the audio element.

প্রচলিত বৈবাহিত প্রথা এবং লিভ-ইন রিলেশন   

আদালতের রায়ের পর অনেকেই প্রশ্ন করছেন, লিভ-এন সম্পর্কের এমন আইনি সুবিধা সমাজের প্রচলিত বিয়ের প্রথার উপর কোনো  প্রভাব পেলবে কিনা৷

এমন প্রশ্নের জবাবে সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বিয়ে এবং লিভ-ইন সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ডায়নামিক্স৷ বিয়ে কেবল দুটি মানুষের মিলন নয়, বরং একটি বৃহত্তর 'ইনস্টিটিউশন' বা প্রতিষ্ঠান৷ এতে পরিবার, সমাজ, উত্তরাধিকার, ধন-সম্পত্তি এবং সন্তানের সামাজিক পরিচয়ের মতো জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জড়িয়ে থাকে৷''

তার মতে, ‘‘সহবাস মূলত দুটি মানুষের একসঙ্গে থাকার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, যেখানে বিয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর প্রতি দায়বদ্ধতা সেই অর্থে থাকে না৷''

সমাজকর্মী ও অধ্যাপক শাশ্বতী ঘোষ এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘‘অনেক সময় মেয়েরা পরিস্থিতির চাপে বা বাপের বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো পুরুষের সঙ্গে থাকতে শুরু করে এবং পরে সন্তানের জন্ম হয়৷ এমন অবস্থায় সেই পুরুষটি দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করলে নারীটি চরম বঞ্চনার শিকার হন এবং সামাজিকভাবে কেবল রক্ষিতা হিসেবে বিবেচিত হন৷ তাই এই রায় অত্যন্ত প্রগতিশীল৷

তার মতে, ‘‘লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরুষরা প্রায়ই দায়বদ্ধতা এড়াতে 'বিয়ে হয়নি' এমন অজুহাত দেয় বা অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে৷ এই ধরনের সম্পর্কে নারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাই এই রায় মেয়েদের স্বার্থ ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করবে৷’’

​তিনি নারায়ণ দত্ত তিওয়ারি মামলার উদাহরণ টেনে মনে করিয়ে দেন, ‘‘দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ না হলেও সন্তানের অধিকার নষ্ট হয় না৷ সুপ্রিম কোর্ট অনেক আগে থেকেই সন্তানের অধিকারের পক্ষে রায় দিয়ে আসছে৷ একজন সন্তান যাতে তার বাবার থেকে যথাযথ স্বীকৃতি এবং খোরপোশ পায়, এই রায় সেই পথকে আরও প্রশস্ত করবে৷''

ভারতের প্রয়াত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তিওয়ারিকে বাবা বলে দাবি করেছিলেন রোহিত শেখর৷ এ নিয়ে দীর্ঘ দিন মামলা চলেছিল৷ শেষমেশ আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তিওয়ারি সত্যিই রোহিতের বাবা৷

​শাশ্বতীর মতে, ‘‘আদালতের রায় সমাজে অবহেলিত ও লিভ-ইন সম্পর্কে থাকা নারীদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে এবং তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে৷’’

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ