স্কুল বইয়ে যৌন নিগ্রহ রোখার পাঠ কি কাজে লাগবে?
২৫ জানুয়ারি ২০২৫
অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন হেনস্থা থেকে রক্ষাকবচ দিতে কার্যকর হয়েছিল ‘পকসো' আইন। এই আইন চালু হওয়ার পর এক যুগ কেটে গেলেও সে সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে উঠেছে, এমনটা বলা যায় না। সে কারণেই অনেক নিগ্রহের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্করা বুঝতেও পারে না যে, তারা নিগ্রহের শিকার। এ ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই স্কুল স্তরে বিষয়টি পড়ানো হচ্ছে। সেই পাঠদানকে আরো সম্প্রসারিত করছে শিক্ষা দপ্তর।
স্কুলের পাঠ্যে
২০২২ সালে রাজ্য শিশু সুরক্ষা অধিকার কমিশনের সুপারিশে সপ্তম শ্রেণিতে ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ' এবং ‘পকসো' আইনের বিষয় সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এবার অষ্টম শ্রেণির স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা বইয়ে তা আরও বিশদভাবে আনা হয়েছে।
২০১৪ সালে রাজ্যে সর্বপ্রথম পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যে ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ' অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু সেখানে পকসো আইনের কথা ছিল না। ফলে কমিশন ২০২২ সালে স্কুল শিক্ষা দপ্তরকে এই সংক্রান্ত সিলেবাস তৈরি করতে বলে। ২০২৩ সালে সপ্তম শ্রেণির পড়ুয়ারা এই বই পড়েছিল। এ বার আরো বিস্তারিত আলোচনা থাকছে।
আইনের কথা অল্পবয়সি পড়ুয়াদের কাছে তুলে ধরা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের। তাই ছড়ার মোড়কে সচেতনতার পাঠ দেওয়ার পাশাপাশি আইনের কথাও বলা হয়েছে। লিঙ্গ নির্বিশেষে যে কোনো নাবালক কীভাবে হেনস্থার বিষয়টি বুঝবে, সেটা সহজ করে তুলে ধরা হয়েছে। পাঠ্যবই ইতিমধ্যে প্রকাশ করে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে স্কুলে স্কুলে।
বইয়ের ছড়ায় বলা হয়েছে, "রাস্তাঘাটে যখন তখন, তোমায় যারা স্পর্শ করে। কিংবা যারা মজায় মাতে, তোমায় নিয়ে দিনে রাতে, তাদের তুমি ভয় পেও না, রুখে দাঁড়াও সাহস নিয়ে, নয়তো তাদের বদমায়েশি, দাও বড়দের সব জানিয়ে।”
ব্যাড টাচ-এর মতো প্রাপ্তমনস্ক বিষয় বোঝানো হয়েছে ছন্দে। বলা হয়েছে প্রতিবাদের আওয়াজ তুলতে। লেখা হয়েছে, ‘শনাক্ত করো, রিপোর্ট করো, চেঁচিয়ে পাড়া মাত করো।' পকসো আইনে কোন অপরাধে কী শাস্তি, সেটাও থাকছে বইয়ে।
নাবালিকা নিগ্রহ
আর জি কর আন্দোলনে নারী নিগ্রহের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে নাগরিক সমাজ। এ ক্ষেত্রে কর্তব্যরত চিকিৎসক পড়ুয়াকে ধর্ষণ ও খুন করা হয়। এ নিয়ে বিস্তর হইচই হলেও অনেক নিগ্রহের ঘটনাই থেকে যায় আড়ালে। এর মধ্যে একটা বড় সংখ্যা নাবালক নিগৃহীতের।
১৮ বছরের কম বয়স হলে তাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সাম্প্রতিক গতিতে একের পর এক নাবালিকা নিগ্রহের ঘটনা সামনে এসেছে। অনেক ঘটনার কথা পুলিশের নজরে আসে না। যারা সাহস করে অভিযোগ জানাতে পারে, তাদের ক্ষেত্রে সুবিচার পাওয়ার সুযোগ থাকে।
২০১২ সালে এই আইন আনা হয়। ছেলে বা মেয়ে যে কোনও নাবালকের নিগ্রহের ক্ষেত্রে কড়া আইনটি প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত সাজার সংস্থান রয়েছে।
আইনের প্রয়োগ
সাম্প্রতিক অতীতে একের পর এক ঘটনায় পকসো আইনে মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। কয়েকটি মামলায় সাজা ঘোষণা হয়েছে।
৫৪ দিনের মাথায় হুগলির গুড়াপের শিশু ধর্ষণ ও খুনে ফাঁসির সাজা ঘোষণা করেছে আদালত। চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়াকে ধর্ষণ ও খুনে ৬২ দিনের মাথায় অভিযুক্তকে সাব্যস্ত করেছে বারুইপুর পকসো আদালত।
নিজের নাবালিকা মেয়েকে ধর্ষণ করার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে কাঁথির বিশেষ পকসো আদালত।
নাবালিকা ভাইঝিকে যৌন নির্যাতনের মামলায় সাজা দিয়েছে জলপাইগুড়ির বিশেষ পকসো আদালত।
তা সত্ত্বেও অপরাধ কমছে না। অপরাধ কমাতে সচেতনতা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও আন্দোলনের কর্মীরা।
শিশু সুরক্ষা আন্দোলনের কর্মী বৈতালি গঙ্গোপাধ্যায় ডয়চে ভেলেকে বলেন, "ছেলেমেয়েরা সচেতন হলে অভিযোগের সংখ্যা বাড়বে। তারা বুঝতে পারবে, যেটা তাদের পাঠ্যপুস্তকে আছে, সেটা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা যায়। শরীর নিয়ে কথা মানেই গোপন নয়, সেটা বুঝতে পারবে। তারা সঙ্কোচ সরিয়ে সামনে এসে অভিযোগ জানাবে।”
পাঠ্যপুস্তকে শিশুদের পকসো আইন শেখানো নিয়ে আশাবাদী নন মনো- সমাজকর্মী মোহিত রণদীপ। তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, "সমাজ না বদলে ছোটদের অপরাধী চিহ্নিত করার দায়িত্ব দেওয়ায় আমি সহমত নই। বরং সরকার দায়িত্ব নিয়ে চারপাশটা বদল করতে চেষ্টা করুক। অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করা বন্ধ করুক।”
পরিকাঠামো ও সংবেদনশীলতার প্রশ্ন তোলেন তিনি। বলেন, "পকসো মামলায় যারা তদন্ত করবেন, তাদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। আক্রান্ত শিশুর সঙ্গে যেন সংবেদনশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়। আইন প্রয়োগের জায়গা যে কোর্ট, সেখানে দ্রুত এই বিষয়ে নিষ্পত্তি দরকার। তার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক আদালত প্রয়োজন।”
গুড টাচ ব্যাড টাচ প্রসঙ্গে মোহিত বলেন, "আমার ক্লিনিকাল অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, শরীরের নির্দিষ্ট কতগুলো অঙ্গে হাত দিলেই গুড টাচ বা ব্যাড টাচ হয় না। কেউ যদি হাত ধরেন খারাপ মানসিকতা নিয়ে, তা হলে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশু সেই মানসিকতা বুঝতে পারবে না। তাদের বোঝাতে হবে, তুমি অস্বস্তি বোধ করলে সেটা জানাও।”
নারী আন্দোলনের কর্মী, অধ্যাপক শাশ্বতী ঘোষ ডয়চে ভেলেকে বলেন, "শিশুরা যদি নিগ্রহকারীকে চিহ্নিত করতে পারে, সেটা খুবই ভালো ব্যাপার। কিন্তু এর মধ্যেই একটা আশঙ্কা দানা বাঁধে যে, আমরা কি একটা শিশুকে তার চারপাশের সব মানুষকেই অবিশ্বাস করতে শেখাচ্ছি না? সেটা যেন না হয়। আমরা চাইব, শিশুরা প্রকৃত নিগ্রহকারীকে চিহ্নিত করতে পারবে ও যাদের বিশ্বাস করা যায়, তাদের প্রতি আস্থা রাখবে।”