চীনের বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন চত্বরে ১৯৮৯ সালে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সমাবেশ আয়োজনের ডাক দেয়ায় হংকংয়ের তিন গণতন্ত্রকামী অ্যাক্টিভিস্টকে দোষী সাব্যস্ত করেছে হংকংয়ের একটি আদালত৷
তিয়েনআনমেন চত্বরে বিক্ষোভছবি: Kin Cheung/AP Photo/picture alliance
বিজ্ঞাপন
সোমবার তাদের শাস্তির বিষয়ে জানানো হবে৷
ঐ তিনজন হলেন গণমাধ্যম ব্যবসায়ী জিমি লাই, ব্যারিস্টার চাও হাং-টুং ও বিরোধী রাজনীতিবিদ গুইনেথ হো৷
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অনুমোদন না পাওয়ার পরও তারা গতবছর ৪ জুন সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন৷ সাধারণত হংকংয়ে প্রতিবছর ৪ জুন তিয়েনআনমেন চত্বরে বিক্ষোভের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়৷ তবে গতবছর করোনার কারণ দেখিয়ে অনুমতি দেয়া হয়নি৷ এ বছরও অনুমোদন মেলেনি৷
চীন ও হংকংয়ের নির্যাতিত শিল্পীরা
চীনের মূল ভূখণ্ডের শিল্পীদের মতোই হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থি শিল্পীরাও নিজেদের সৃজনশীলতায় লাগাম টানতে বাধ্য হচ্ছেন৷ নীচের ছবিঘরে থাকছে শিল্পের কারণে বেইজিংয়ের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া কিছু শিল্পীর কথা৷
ছবি: Richard Shotwell/Invision/AP/picture alliance
লুই জিয়াওবো
কারাভোগ করা অবস্থায় ‘চীনে মৌলিক মানবাধিকারের জন্য দীর্ঘ অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ’ ২০১০ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান লুই জিয়াওবো৷ চীনা এই লেখক, সমালোচক, দার্শনিক ও মানবাধিকারকর্মী একধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন৷ চীনা কমিউনিস্ট শাসকদের সবচেয়ে বড় সমালোচক ও সবচেয়ে বিখ্যাত রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাকে৷ ২০১৭ সালে ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন তিনি৷
ছবি: picture alliance / dpa
কেসি ওয়ং
সম্প্রতি হংকং ছেড়ে তাইওয়ানে পাড়ি জমিয়েছেন কেসি উওং৷ শৈল্পিক অনুভূতি প্রকাশে বাধাকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি৷ রাজনৈতিক পারফরম্যান্স আর্টের জন্য খ্যাত এই শিল্পী তিয়েন আনমেন হত্যাকাণ্ড এবং চীনা সেন্সরশিপের মতো বিষয় নিয়ে পারফর্ম করেছেন৷ ছবিটি ২০০৮ সালে ‘দ্য প্যাট্রিয়ট’ নামের একটি পারফরম্যান্সের৷ এই পারফর্ম্যান্স চলাকালে তিনি লাল রঙের খাঁচায় বন্দি অবস্থায় চীনের জাতীয় সঙ্গীত বাজান৷
ছবি: ANTHONY WALLACE/AFP
অ্যান্থনি উওং
অ্যান্থনি উওং (বামে) হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনের একজন সমর্থক৷ ২০১৮ সালে এক উপনির্বাচনে ‘আ ফরবিডেন ফ্রুট পার ডে’ (প্রতিদিন একটি করে নিষিদ্ধ ফল) শিরোনামের গান গেয়ে ব্যাপক আক্রোশের শিকার হন৷ হংকংয়ের দুরিনীতি বিরোধী সংস্থা ইনডিপেনডেন্ট কমিশন অ্যাগেনস্ট করাপশন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করেছে৷
ছবি: Alvin Chan/SOPA/Zuma/picture alliance
ডেনিসে হো
২০১৪ সালে হংকংয়ে আমব্রেলা মুভমেন্টে যোগ দেয়ার জন্য ক্যান্টোপপ গায়িকা, অভিনেত্রী এবং গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনকারী ডেনিসে হোকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে৷ ২০১৯ সালে একটি টেড টকে তিনি বলেন, স্বৈরাচার সৃষ্টিশীলতাকে টেক্কা দিতে পারে না৷
ছবি: Asanka Ratnayake/Getty Images
আই ওয়েইওয়েই
সমসাময়িক শিল্পী এবং রাজনৈতিক সমালোচক আই ওয়েইওয়েইকে ২০১১ সালে কর ফাঁকির মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়৷ ৮১ দিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে কারাভ্যন্তরের ভয়াবহতার বর্ণনা দেন তিনি৷ ওয়েইওয়েই বলেন, ‘‘আমার শিল্পের যদি কোনো অর্থ থেকে থাকে, সেটা হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য৷ যদি দেখি কর্তৃত্ববাদের কবলে কেউ হয়রানি হচ্ছে, আমি তার স্বাধীনতা রক্ষার সৈনিক হতে চাই৷
ছবি: Federico Gambarini/dpa/picture alliance
ঝো চিং
‘নিষিদ্ধ’ বিষয়ে লেখালেখি করে চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং লেখক ঝো চিংকে বেশ বিপদেই পড়তে হয়েছে৷ ২০১১ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘চীনে সত্য জানতে চাওয়ার মানুষদের জীবনে অশেষ দুর্দশা নেমে এসেছে৷ সত্য জানা একজন সাধারণ মানুষও যদি তা প্রকাশ্য়ে বলে, তাকে তার চাকরি বা পরিবারকে হারাতে হতে পারে৷ সত্য বলা লেখকের নিত্যসঙ্গী কারাদণ্ডের হুমকি৷ একজন সত্য বলা কর্মকর্তা তার জীবন হারাতে পারেন৷’’
ছবি: Ai Weiwei/Zhou Qing
বাদিউচাও
এটি অবশ্য চীনের বিখ্যাত রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট, শিল্পী ও অধিকারকর্মীর আসল নাম নয়৷ ২০০৯ সালে তিনি সাংহাই ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাস করতে শুরু করেন৷ কিন্তু তারপরও নিজের পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে বাদিউচাও নামকেই বেছে নিয়েছেন৷ স্যাটায়ার ও পপ সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রোপাগান্ডার সমালোচনা করেন তিনি৷ তার সমালোচনার অন্যতম লক্ষ্য প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং৷
ছবি: Libor Sojka/Ctk/dpa/picture alliance
ক্লোয়ে ঝাও
২০২১ সালে সেরা পরিচালক হিসেবে গোল্ডেন গ্লোব জেতার পর চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বেইজিংয়ে জন্ম নেয়া ক্লোয়ে ঝাওকে ‘চীনের গর্ব’ বলে উল্লেখ করেছিল৷ কিন্তু এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার নামের উল্লেখ করা হলে সেগুলোও মুছে ফেলা হতে থাকে৷ ধারণা করা হয় ২০১৩ সালে ফিল্মমেকার ম্যাগাজিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘চীনে সবখানেই মিথ্যের ছড়াছড়ি’৷
ছবি: Richard Shotwell/Invision/AP/picture alliance
8 ছবি1 | 8
বিচারক আমান্দা উডকক তার রায়ে লিখেছেন, লাই ও চাও যে অন্যদের সমাবেশে অংশ নিতে উসকে দিয়েছিলেন সেটা তদন্তকারীরা ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ' করতে পেরেছেন৷
ব্যারিস্টার চাও সমাবেশস্থল ভিক্টোরিয়া পার্কসহ পুরো হংকংয়ে ‘মোমবাতি জ্বালানোর' আহ্বান জানিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়৷
আর জিমি লাই ভিক্টোরিয়া পার্কে ১৫ মিনিট ছিলেন, যেটা ‘সমাবেশের পক্ষে ইচ্ছাকৃত সমর্থন' বলে জানান বিচারক উডকক৷
অধুনালুপ্ত ‘হংকং অ্যালায়েন্স ইন সাপোর্ট অফ প্যাট্রিয়টিক ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্টস ইন চায়নার' নেতা ব্যারিস্টার চাও বিচার চলার সময় বলেন, বার্ষিক ঐ সমাবেশ আয়োজন ‘তাদের অধিকার, তাদের স্বাধীনতা'৷
তিয়েনআনমেন চত্বরে বিক্ষোভের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে চীনে কোনো কিছু করা ট্যাবু৷ এবং সে কারণে জেল হতে পারে৷ বিরোধী রাজনীতিবিদ গুইনেথ হো আদালতকে বলেছিলেন, তিনি ৪ জুন সমাবেশে গিয়েছিলেন এটা দেখতে যে, চীন ও হংকংয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কিনা৷
একই অভিযোগে ইতিমধ্যে ১৬ জন অ্যাক্টিভিস্টকে চার থেকে ১০ মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে৷
২০১৯ সালে হংকংয়ে গণতন্ত্রপন্থি বিক্ষোভের পর চীন জাতীয় নিরাপত্তা আইন পাস করে৷ এতে নাশকতামূলক তৎপরতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন করা হয়েছে৷ এই আইনের আওতায় ব্যারিস্টার চাওসহ তার অধুনালুপ্ত দলের সাবেক কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে নাশকতামূলক তৎপরতা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে৷